ঢাকা ,  শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  ৭ আশ্বিন ১৪২৪

উপ সম্পাদকীয়

অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ প্রেক্ষিত পাঠ্যপুস্তকের হেফাজতিকরণ (২)


অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ
প্রেক্ষিত পাঠ্যপুস্তকের হেফাজতিকরণ

প্রথমেই পরিষ্কার করে নেয়া দরকার যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ যখন আমরা বলি তখন আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে নজর প্রসারিত করেই বলি। খোলাসা করে বললে- আমাদের এই বদ্বীপ অঞ্চলে আবহমানকাল ধরে নানা সাম্প্রদায়িক উস্কানির মাঝেও বিরাজিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, চলমান কালের সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে জর্জরিত সমাজে অসাম্প্রদায়িক চেতনার স্বরূপ এবং সর্বোপরি, এই চেতনাবোধ আগামী দিনের বাংলাদেশে পথচলার দিকনির্দেশনা দেবে কি না সে বিষয়ে আলোকপাত করি। আর পাঠ্যপুস্তকের হেফাজতিকরণ বলতে পাঠ্যপুস্তকের সাম্প্রদায়িকীকরণ বুঝবো। ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে প্রথমেই স্বীকার করে নেয়া জরুরি যে বাংলাদেশ সৃষ্টির মূলে কাজ করেছে অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধ এবং এর দার্শনিক ভিত্তিভূমি ছিল বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত, বিজ্ঞান-ভিত্তিক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ করার জন্য বাংলাদেশ সৃষ্টির পরপরই উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যার ব্লুপ্রিন্ট এঁকেছিল ডঃ কুদরত ই খুদা কমিশন। এই কমিশনের প্রস্তাবিত শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণের সময় ঘাতকেরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে, ফলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে পাকিস্তানপন্থী, মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনা বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি। এই শক্তি সামরিক শাসনের বাতাবরণে দেশ শাসন করে একাদিক্রমে ১৫ বছর। ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্টে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের মৌল নীতি পরিবর্তনের সূচনা হয়। ক্ষমতার কেন্দ্রে আসীন সাম্প্রদায়িক, মুক্তিযুদ্ধের মৌল দর্শন বিরোধী শক্তি খুব ভালো ভাবে জানতো- কি শেখালে নূতন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বিভ্রান্ত হবে। তাদের এই ভাবনা বাস্তবায়ন করতে তারা গুরুত্ব দিয়েছিল ‘কি শেখানো যাবে না’- তার দিকে। ফলে, আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসকে খন্ডিত করে, এর সাথে সংশ্লিষ্ট নানা জনের কথা সরিয়ে দিয়ে তারা ‘ফরমায়েশী’ ইতিহাস রচনা করল – এবং তরুণ মনকে বিভ্রান্ত করতে তৎপর রইলো।

কুদরত ই খুদা কমিশনের পরে দীর্ঘ বিরতিতে ২০১০ সালে নূতন জাতীয় শিক্ষানীতি ঘোষিত হয়, যা আধুনিক শিক্ষানীতি হিসেবে প্রশংসা লাভ করেছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে, এই শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন এখনো শুরুই হতে পারেনি বরং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল যখন ক্ষমতায় তখন পাঠ্যপুস্তকে অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধ তৈরীতে ভূমিকা রাখতে পারে এমন লেখা বেছে বেছে বাদ দেবার কাজটি হল। দেশে যখন একাত্তরে কৃত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে সাম্প্রদায়িক, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া চলছে, বিচারের রায় হচ্ছে এবং শাস্তিও কার্যকর হচ্ছে- তখন এদেশের ভাবী নাগরিকের মনে সুবুদ্ধির চাষাবাদ করতে, সুচর্চা করতে যে ধরণের পাঠ্যসূচী ও পাঠ্যপুস্তক তাদের হাতে তুলে দেয়া দরকার- তা দারুণভাবে ব্যাহত হয়েছে হেফাজতি চিন্তা-ভাবনার অনুপ্রবেশে। দ্রুত সময়ের মধ্যে এই পাঠ্যপুস্তকের যথাযথ রিপেয়ার না করা হলে এই কলুষিত বই-পত্তর শিশুদের মনন গঠনে ভয়ানক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

মনে রাখা জরুরি যে- গণিত, ব্যাকরণ, দর্শন কিংবা ধর্ম শাস্ত্রের জ্ঞান নিয়ে কোন শিশুই মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয় না। শিশু বড় হয়ে ওঠার প্রতিটি পর্যায়ে পরিবার ও পারিপার্শ্বিকতা থেকে নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিক্ষা লাভ করতে থাকে। এই শিক্ষা লাভের প্রক্রিয়া শিশুর মনোদৈহিক বিকাশের ওপর প্রভূত প্রভাব বিস্তার করে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আরো শিক্ষা লাভের জন্য শিশুদের বিদ্যালয়ে যাবার সুযোগ হয়। এটি খুবই সুসংবাদ যে, আমাদের দেশে সকল শিশু যেন তাদের প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করতে পারে সেজন্য সরকার যথেষ্ট সংখ্যক স্কুল তৈরী করেছে এবং প্রতি বছরের শুরুতে ছাপাখানা থেকে সদ্যপ্রকাশিত ঝকঝকে নূতন পাঠ্য বই তাদের হাতে তুলে দেয়ার ব্যবস্থাও করেছে। ফলে শিশুদের মধ্যে যারা বিদ্যালয়ে যাতায়াত শুরু করে তাদের জীবনে জ্ঞানার্জনের এক নূতন অধ্যায় সূচিত হয়। এ এক মহাযজ্ঞ! পিল পিল করে আমাদের গ্রাম-নগরের শিশুরা সময় ধরে হাজির হয় তাদের বিদ্যাঙ্গনে যেখানে তাদের জন্য রয়েছেন বিশাল শিক্ষককুল। পীঠ বাঁকা করা বই-পত্তরের বোঝা নিয়ে শিশুরা রোজ আসে ইশকুলে- আর শিক্ষক মহাশয়েরা ব্যস্ত হন ঐ বইয়ের বারতাগুলো ওদের গেলাবার কাজে। এতে শিশুর বদ-হজম হচ্ছে কি না তা দেখভাল করার কোন ভাল ব্যবস্থা নেই আমাদের শিক্ষালয়গুলোতে।

একজন শিক্ষকের প্রত্যাশিত কাজ হল নূতন কিছু জানাবার পাশাপাশি শিশুর প্রানোচ্ছ্বলতাকে, জানতে চাইবার ইচ্ছেগুলোকে আরো উস্কে দেয়া এবং আলোকিত মন তৈরি করা। শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে একজন শিক্ষক তাই নিঃসন্দেহে অনেক বড় ভূমিকা পালন করেন। শিশুর মানসিক জড়তা কাটিয়ে তাঁকে জ্ঞান চর্চার দিকে ধাবিত করাবার কাজে যুক্ত থাকেন তিনি। তাই এই কাজটি বাস্তবায়িত করার প্রক্রিয়ায় কি কি বই পড়ানো হবে আর কিভাবে পড়ানো হবে তা বিবেচনার মধ্যে নিতে হবে। আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থী কিভাবে চাকরি পাবার যোগ্যতা অর্জন করবে সে বিষয়ে বেশি মনোযোগ দেয়া হয়, কিন্তু শিশুকাল থেকে তাঁকে যোগ্য মনুষ্যত্বের অধিকারী করে গড়ে তোলায় যথেষ্ট গুরুত্ব যে দেয়া হচ্ছে না তার সাক্ষাত প্রমাণ মিললো এ বছরে প্রকাশিত পাঠ্য পুস্তকে। আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখলাম যে পাঠ্যপুস্তকের ‘হেফাজতিকরণ’ হয়েছে। এদেশের মুখচেনা সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ‘পলিটিক্যাল’ মতলব নিয়ে পাকিস্তান আমল থেকেই আমাদের এবং আমাদের শিশুদের মনোজগতে আধিপত্য বিস্তার করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। পাঠ্যপুস্তকের সাম্প্রতিক ‘হেফাজতিকরণ’ তাদের এই নিরন্তর অপচেষ্টাকে আরেক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে যা আশংকাজনক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়।

বর্তমান ও আগামীর স্বার্থে শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষার মান নিয়ে আমাদের যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে ভাবা দরকার। কারণ এর ওপরে নির্ভর করছে ভাবী বাংলাদেশের রূপ। বর্তমানে আমাদের দেশে বারোয়ারী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। বাংলায় মূলধারা সরকারী শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি ইংরেজী মিডিয়াম, আরবী মিডিয়াম (মাদ্রাসা/মক্তব), প্রাইভেট শিক্ষালয়ের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে সমাজব্যাপী। কোন ভাবে শিক্ষা কার্য চলবে তা যে কোনো সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি কাম্য যে, শিক্ষাব্যবস্থা এমন হওয়া উচিৎ যেখানে শিক্ষার্থীরা সমাজের মাটি থেকে রস নিয়ে সমাজকেই ফলদান করবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিদ্যালয়কে তুলনা করেছেন ‘ইঞ্জিন’-এর সাথে। মুখস্ত বিদ্যা আর পুঁথিগত বিদ্যার তিনি ছিলেন ঘোর বিরোধী। তাহলে কেমন হওয়া উচিৎ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা? আমাদের দেশের লোকের মনকে যে অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধ বহুদিন মুগ্ধ করে রেখেছে, যে জ্ঞানরস সঞ্চয় করলে হেফাজতি চিন্তার বীজ অপসৃত হয়, যে শিক্ষার পরিবেশ দেশের লোকের চিত্তকে বিজ্ঞান শিক্ষায় নিবিষ্ট করায় – সে ধরণের শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের গড়ে তুলতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, হেফাজতি শিক্ষা-দীক্ষায় আমাদের শিশুদের সজীব মনের অপমৃত্যু হবে, ভাবনার শেকড় শুকিয়ে যাবে।

খোলা আকাশ, খোলা বাতাস, গাছ-পালা – উন্মুক্ত প্রকৃতি শিশু মনের বিকাশের জন্য জরুরি। লেখাপড়া আত্মস্থ করার জন্য শিক্ষার্থীদের মানসিক অবকাশ দরকার যা বিশ্ব প্রকৃতির কাছ থেকে সিঞ্চন করা সম্ভব হয়। এ কারণেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুকুল পরিবেশ ও নিয়ম তৈরি করা জরুরি যাতে জীবনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে শিশুদের মনের চরিত্র গড়ে ওঠে। বিজ্ঞানমনস্ক শিশুর আধিক্য এদেশে যত বাড়বে – ততই অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশের রূপ উজ্জ্বল হবে আর অপসৃত হবে সমাজকে হেফাজতিকরণের সকল পাঁয়তারা।

তৌহীদ রেজা নূর : শিক্ষক, গবেষক, শহীদ সন্তান

Views All Time
Views All Time
105
Views Today
Views Today
1
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top