ঢাকা ,  শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  ৭ আশ্বিন ১৪২৪

উপ সম্পাদকীয়

অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ প্রেক্ষিত পাঠ্যপুস্তকের হেফাজতিকরণ (১)

 

 

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ

প্রেক্ষিত পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িকীকরণ

 

একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য মহান মুক্তিযুদ্ধে রক্ত দিয়েছিলেন ত্রিশ লক্ষাধিক শহীদ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সাড়ে সাত কোটি মানুষের ত্যাগ আর লড়াইয়ের ফসল আমাদের স্বাধীনতা। বাহাত্তরের সংবিধানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়ন ঘটেছিলো সার্থকভাবে, শুরু হয়েছিলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলেই নিষিদ্ধ হয়েছিলো ধর্মভিত্তিক রাজনীতি। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশে আবারও প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ক্ষমতায় এসে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের বদলে একে একে বাস্তবায়ন শুরু করে একাত্তরে পরাজিত পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক নীতি। ‘অসাম্প্রদায়িক’ সত্যটিকে তখন পাঠিয়ে দেয়া হয় হিমঘরে, রাষ্ট্র পরিচালিত হতে থাকে তীব্র সাম্প্রদায়িক দূষণে। যুদ্ধাপরাধীরা প্রতিষ্ঠিত হয় জিয়া ও এরশাদের শাসনামলে। বাহাত্তরের সংবিধানকে কেটে ছেঁটে অপবিত্র করে যার যার সুবিধা মতো। রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ‘ইসলাম’কে খাড়া করানো হয় স্বৈরাচার এরশাদের মসনদ রক্ষার জন্য। যে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধের পর, সেই অপরাজনৈতিক কৌশলগুলোই আবার একে একে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে।

 

স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলেও এই সাম্প্রদায়িক দুষ্টুচক্র থেকে বের হতে পারিনি আমরা। ৭৫- এর পর সাম্প্রদায়িক হায়নারা নিজেদের শিকড় এতো গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে যে আমাদের প্রতিনিয়ত এদের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে আদর্শিক প্রতিটি বিষয়ে। বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা বর্ষবরণকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এইসব সাম্প্রদায়িক শক্তি। তারা নানারকম অপপ্রচার ও মিথ্যাভাষণ করেছে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক উৎসবগুলো নষ্ট করার উদ্দেশ্যে। কেবল তাই নয়, রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালানো হয়েছে। কিন্তু বাঙালি তার সর্বস্ব দিয়ে এখনও আগলে রেখেছে এই প্রাণের উৎসবকে। এখনও বাঙালি গ্লানি মুছে দেবার প্রত্যয়ে জীর্ণ পুরাতনকে ছেড়ে নতুনের আবাহনে নতুন উদ্যমে বিকশিত হয় প্রতিটি পহেলা বৈশাখে। বৈশাখের রুদ্র তেজকে তারা মননে ধারণ করে গেয়ে উঠেÑ ‘বছরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক যাক.. ..’। এই অমিত শক্তির উৎস আমাদের মননবোধে জাগ্রত অসাম্প্রদায়িক চেতনা, যা দীর্ঘকাল ধরে লালিত পালিত হয়েছে, গড়ে উঠেছে। এই জোরেই রমনার বটমূলে বোমা হামলার পরের বছরের নববর্ষ উদযাপনে বাঙালি সবটুকু ঢেলে দিয়েছিলো। কারণ আমাদের মাঝে কাজ করেছে এই সত্য যে, মৌলবাদের কাছে পরাজিত হবার কোনো ইতিহাস আমাদের নেই। আমাদের ইতিহাসের শিক্ষা হলো, লড়াই করে স্বাধীনতার পক্ষে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের পক্ষে আমাদের দাঁড়াতে হবে, কাজ করতে হবে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো আমাদের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও সংগঠনের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। তারা আমাদের সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছে। কারণ তারা বুঝতে পেরেছে একটি জাতি যতক্ষণ সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের পথে আদর্শিকভাবে সৎ থাকবে, ততক্ষণ তার মৌলিক আদর্শ থেকে তাকে বিচ্যুত করা যাবে না। তাই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের লক্ষ্যে নানা প্রতিকূলতার মাঝেও বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষ, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের যে মূল ভিত্তি তাকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেবার কাজটি করেছে নিরন্তরভাবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশে একসময় পাঠ্যপুস্তক থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে মুছে দিয়েছিলো একাত্তরের পরাজিত শক্তি। তখনও মাঠে-ময়দানে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের কথা, বঙ্গবন্ধুর কথা তুলে ধরেছেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা। পাঠ্যপুস্তকে যে ইতিহাসের বিকৃতি করা হয়েছিলো বিভিন্ন সময়ে, তার প্রতিবাদে সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার কাজটি করেছিলো নতুন প্রজন্মের সামনে। আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, আজ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল ক্ষমতায় থাকলেও পাঠ্যপুস্তকের সাম্প্রদায়িকীকরণ বন্ধ হয়নি, বরং চূড়ান্তভাবে তাকে সাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যমূলক করে তোলা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এতে কাদের রাজনীতি লাভবান হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গবেষক হতে হয় না। আমরা স্পষ্টতই দেখতে পাচ্ছি স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি সরকারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘাপটি মেরে থেকে একাত্তরের পরাজিত শক্তির আদর্শগুলোই বাস্তবায়নের কাজ করছে। হেফাজতের প্রেসক্রিপশনে পাঠ্যপুস্তকে যে বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িক বিভেদ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, তা আসলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মগজ ধোলাই প্রকল্পেরই অংশ। যে প্রকল্প একাত্তরের পরাজিত শক্তি এতদিন পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি, তাই এখন তারা সম্পন্ন করতে চাইছে। সম্প্রতি লেখক, ব্লগার, প্রকাশক হত্যা যেমন একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-েরই ধারাবাহিকতা, তেমনি পাঠ্যপুস্তকের সাম্প্রদায়িকীকরণও সেই পাকিস্তানি ভাবাদর্শ বাস্তবায়ন পরিকল্পনারই অংশ। কেননা পাকিস্তানি আমলেও পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িক বিভেদ তৈরি করা হয়েছিলো। কাজী নজরুল ইসলামের ‘চল চল চল’ (যেটি আমাদের রণসঙ্গীত) কবিতায় ‘সজীব করিব মহাশ্মশান’কে ‘সজীব করিব গোরস্তান’ এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মহেশ’ গল্পটিকে পাঠ্যসূচিতে ‘গফুর’ নামকরণ করা হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি গভর্নর মোনায়েম খানের উদ্যোগে এই হীন অপকীর্তি সংঘটিত হয়েছিলো। এছাড়াও ইসলামীকরণের নানা উদ্যোগ ছিলো আমাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি জুড়ে। পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান পতনের এক বছর পূর্বে ‘পাকিস্তানের দেশ ও কৃষ্টি’ নামক পাঠ্যবই নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে সরকার ঐ বই প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।

 

কিন্তু স্বাধীন দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকার পরও পাঠ্যপুস্তকে যে হীন সাম্প্রদায়িকীকরণ করা হয়েছে, তা নজিরবিহীন। মাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তকে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে তার পেছনে অরাজনৈতিক দাবিদার চরম সাম্প্রদায়িক হেফাজতে ইসলামীর দাবি ও আবদার রক্ষা করা হয়েছে। সরকারের এই আত্মসমর্পণের মূলে কেবলই ভোটের রাজনীতি। কিন্তু ভোটের রাজনৈতিক সমীকরণেও সরকার একটি ভুল পদক্ষেপ নিয়েছে। কেননা, হেফাজত কখনোই আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে না, অতীত থেকে আওয়ামী লীগ এই শিক্ষাটি নেয়নি।

 

বর্তমান সরকারের কাছে এ ধরনের গর্হিত সাম্প্রদায়িক শিক্ষা বিস্তারের পদক্ষেপ আমাদের চিন্তারও অতীত। অথচ বাস্তবতা কত নির্মম। একটি চূড়ান্ত সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কাছে সরকারের এই আত্মসমর্পণে আমরা বিস্মিত, হতবাক এবং ক্ষুব্ধ। সরকারের এই হীন সিদ্ধান্তের জন্য জাতির কাছে তাদের জবাব দিতেই হবে। জবাব দিতে হবে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন উৎসর্গ করা ত্রিশ লক্ষ বীর শহীদ ও বীর মাতাদের ত্যাগ-আত্মত্যাগের কাছেও। ধর্ম নিরপেক্ষ ও মানবিক জাতি গঠনের বিপরীতে সরকার ও সরকারের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা জামাতি হেফাজতিদের এই ঘৃণ্য চক্রান্ত রুখে দেবার জন্য প্রয়োজন দুর্বার প্রতিরোধ। সেই প্রতিরোধের শপথই হোক এবারের নববর্ষের প্রথম উচ্চারণ।

 

সঙ্গীতা ইমাম : শিক্ষক, গবেষক, সহ সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী

চিত্রশিল্প : নতুন দিন, মুস্তাফা মনোয়ার

Views All Time
Views All Time
158
Views Today
Views Today
1
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top