উপ সম্পাদকীয়

অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ প্রেক্ষিত পাঠ্যপুস্তকের হেফাজতিকরণ (৩)

পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন

মনোজগতে আধিপত্যবাদের রাজনীতি

 

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে মুক্তিসংগ্রামের মহাবাদলের মধ্য দিয়ে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১Ñ এ দীর্ঘ সময়ে বাঙালি তার মুক্তি সংগ্রামের দার্শনিক ইশতেহার রচনা করে। কার্যত মুক্তিযুদ্ধই একটি স্বচ্ছ অসাম্প্রদায়িক দার্শনিক ভিত্তির ওপর রচিত জনযুদ্ধ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজনীতি নির্মিত হয়েছে দর্শনরহিতভাবেই। ভূ-খ- স্বাধীন হয়েছিলো, কিন্তু মনোজগৎ তখনও পাকিস্তানি ভূতগ্রস্থ ছিলো। ফলে বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরের শাসনামলে এই মনোজগৎ আড়ালে থাকলেও নিষ্ক্রিয় ছিলো না এবং তারই চূড়ান্ত বেদনাদায়ক পরিণতি ছিলো পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা। এরপর সামরিকতন্ত্র ও মোল্লাতন্ত্র হাত ধরাধরি করে বাংলাদেশ শাসন করেছে আর তাতে রসদ যুগিয়েছে পাকিস্তানি ভাবাদর্শগ্রস্থ আমলাতন্ত্র। মুক্তিযুদ্ধের দর্শনকে আড়াল করা হয়েছে পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক অপ-দর্শন দিয়ে। শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তককে তখন ব্যবহার করা হয়েছিলো রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে। পঁচাত্তরের পর তিনটি প্রজš§ বড় হয়েছে পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষাব্যবস্থাকেন্দ্রীক অপরাজনীতির ভিতর দিয়ে। ছিয়ানব্বই সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে মুক্তিযুদ্ধের কিছু মৌল বিষয় পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হয় বটে, কিন্তু গোটা শিক্ষা ব্যবস্থায় তার কোনো প্রভাব প্রতীয়মান হয় না। ২০০১ সালে বিএনপি-রাজাকার জোট ক্ষমতায় এসে আবার পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন আনে এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করে। এ পর্যন্ত আমরা পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তনগুলোকে মোটা রাজনৈতিক দাগে দেখে আসছিলাম। সম্প্রতি ২০১৭ সালের পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তনগুলো একটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ্যপুস্তকের রাজনীতিকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে।

১৯৪৭ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত গত সত্তর বছরে যে কটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে, সেগুলোর কোনটি বাতিল হয়েছে, কোনোটির আংশিক গৃহীত হয়েছে, কোনোটির কিছু সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়েছে; কিন্তু পূর্ণাঙ্গভাবে কোনো শিক্ষা কমিশনই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে বাস্তব রূপ দিতে পারেনি। ১৯৪৭ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত মোট এগারোটি কমিশন/কমিটি হয়েছে যার মধ্যে সাতটি স্বাধীন বাংলাদেশে। প্রতিটি কমিশন/কমিটির রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে কিন্তু কোনোটিই সরকার কার্যকর করেনি সম্পূর্ণভাবে। আবার কোনো কোনোটি জনতার দাবির মুখে বাতিল হয়েছে। লক্ষ্যণীয় পাকিস্তান আমলে (১৯৬২ সাল থেকে) যে রিপোর্টগুলো এসেছে সেগুলো বিতর্কিত এবং সেগুলোর বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে। বর্তমানের অনেক রাজনৈতিক নেতাই সে-ই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টগুলো পড়লে বোঝা যায়, একমাত্র কুদরত-এ-খুদা কমিশনের রিপোর্টেই রাষ্ট্র পরিচালনার চার মৌল নীতি- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ- মোটামুটি প্রতিফলিত হয়েছিলো। স্বাধীনতার মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই এই কমিশন তৈরি হয়েছিলো। এরপর যে কমিশনগুলো তৈরি হয়েছিলো, সেগুলো এই কমিশনেরই বিভিন্ন সুপারিশ গ্রহণ বর্জন বা পরিবর্তন। ১৯৭৮ সালের কাজী জাফর কমিশন ও ১৯৮৮ সালের মফিজ কমিশন সংবিধানের চার নীতি অস্বীকার করে এবং ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিল ও ধর্ম শিক্ষার গুরুত্ব বহাল করে। ১৯৯৭ সালের শামসুল হক কমিশনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও অসাম্প্রদায়িকতা গুরুত্ব পায়। ২০০৩ সালের মনিরুজ্জামান কমিশন পুণরায় ধর্মীয় নৈতিকতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে এবং সর্বশেষ ২০০৭ সালের কবীর চৌধুরী কমিশনে অসাম্প্রদায়িকতা গুরুত্ব পায়, তবে তা সংবিধানের চার মূল নীতি প্রতিফলন করে না। স্বাধীন বাংলাদেশের সাতটি শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট পর্যালোচনা করলে মোটা দাগে কতগুলো বিষয়ের দিকে আমাদের চোখ যায়। প্রায় সকল কমিশনই তাদের রিপোর্টে বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা বাতিলের সুপারিশ করেছে, কিন্তু সব সরকারের আমলেই বৈষম্যমূলক শিক্ষার ধারা বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭২ সালে ধর্ম শিক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভেতরে না রাখার সুপারিশ করা হয়। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম পর্যন্ত বৃত্তিমূলক শিক্ষা হিসেবে ধর্ম শিক্ষাকে বিবেচনার কথা বলা হয়। ১৯৮৮ সালে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ক্লাশ সময়ের ১০ ভাগ ও তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৮.৮৫ সময় ধর্ম শিক্ষার জন্য রাখার প্রস্তাব করা হয়। ১৯৯৭ সালে তৃতীয় শ্রেণি থেকে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়। ২০০৩ সালে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়। বলাই বাহুল্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই ধর্ম শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব বেশি আরোপ করা হয়। এখানেই বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ ও তৎ-পরবর্তী আওয়ামী লীগের মধ্যে আদর্শের পার্থক্য সুস্পষ্ট।

২০১৭ সালে যে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হয়েছে, তা নিয়ে সর্বমহলে বিতর্ক সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ সমালোচনার তিনটি দিক রয়েছে। প্রথমত: বানান, ব্যাকরণ ও বাক্য-গঠন সংক্রান্ত ভুল; দ্বিতীয়ত: বিভ্রান্তিকর ও ভুল তথ্য পরিবেশন; তৃতীয়ত: সাম্প্রদায়িকীকরণ।

এ বছর মোট ৭৮টি পাঠ্যপুস্তক প্রকাশিত হয়েছে। জাতীয় শিক্ষা পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত এই ৭৮টি বইয়ের বাইরেও বিভিন্ন কিন্ডারগার্টেনসহ বিভিন্ন ধরনের স্কুলে যে বইগুলো পড়ানো হয়, সেগুলোও পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সেখানেও কী নিন্মমানের সাম্প্রদায়িকীকরণ করা হয়েছে। দুঃখজনক হলো, এগুলো দেখারও কেউ নেই। পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িকীকরণের প্রস্তাব আসে মূলত তিনটি ধর্মভিত্তিক সংগঠনের কাছ থেকে। এক, হেফাজতে ইসলাম (১৬ মে, ২০১৬ তারিখে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপির মাধ্যমে); দুই, কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড- বেফাক (২০১৬ সালের ০৩ মে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে) এবং তিন, ইসলামী ঐক্যজোট (০৩ মে, ২০১৬ সালের সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে)। তাদের স্মারকলিপি ও সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মোট চারটি অভিযোগ এই তিনটি মৌলবাদী সংগঠনই উল্লেখ করেছে। সেগুলো হলো- এক: পাঠ্যসূচিতে ‘ইসলামি’ ভাবধারার লেখা বাদ দেয়া হয়েছে। হিন্দুত্ববাদ প্রচারের রচনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তার স্থলে; দুই:  ষষ্ঠ শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ে তারা ৫৮টি ভুল আছে বলে দাবি করেছে; তিন: হিন্দুত্ববাদ প্রচারে এনসিটিবি ও বোর্ডসমূহে হিন্দুদের রাখা হয়েছে; চার: পাঠ্যসূচিতে হিন্দু ও নাস্তিক লেখকদের রচনা বেশি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, হেফাজত, বেফাক ও ইসলামী ঐক্যজোট সবচেয়ে বেশি দাবি তুলেছিলো প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা বইয়ের বিষয়ে। তাদের দাবি অনুযায়ী ষষ্ঠ শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ে ৫৮টি ভুল থাকলেও মাত্র ৬টি ভুলের কথা তারা উল্লেখ করেছে। তারা মূল আলোচনায় রেখেছে বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যক্রমে থাকা বাংলা বইগুলো। পর্যালোচনা করে দেখা গেছে হেফাজত যে ২৯টি পরিবর্তনের কথা বলেছে, তার পুরোটাই মেনে নিয়েছে এনসিটিবি। সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির দুটি পাঠ্যবই ছাপা হবার পর যখন দেখা গেল হেফাজতের দাবি মতে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর রামায়াণ-কাহিনী  ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লালু  বাদ পড়েনি, তখন চার কোটি টাকা মূল্যের ১৫ লক্ষ বই বাতিল করে আবার তা ছাপানো হয়, যেন হেফাজতের দাবি নিখুঁতভাবে মানা হয়।

২০১৭ সালের পাঠ্যপুস্তকে যে সাম্প্রদায়িকীকরণ করা হয়েছে, তা হঠাৎ করে হয়নি। আবার ব্যাপারটি এমনও নয় যে, এখানেই শেষ। বস্তুত একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার বড় ফলাফলটি আমরা প্রত্যক্ষ করলাম এ বছরের পাঠ্যপুস্তকে। এর পরে কী কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। বস্তুত শিক্ষার্থীদের মনোজগতে একটি সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়িয়ে দেয়া হলো এবং এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ করা হয়নি। প্রশ্ন হলো, পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তন কি কোনো একক সিদ্ধান্তে হতে পারে? নিশ্চয়ই না। এর জন্য একটি কমিটি নিশ্চয়ই রয়েছে, যারা পরিবর্তনের কারণগুলো পর্যালোচনাপূর্বক সংযোজন, বিয়োজন বা পরিমার্জন করেন। সে কমিটির কার্যাবলীও নিশ্চয়ই একক সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না। সেখানেও মতামতের ক্ষেত্রে সংখ্যাধিক্য বিবেচনায় নেয়া হয়। অর্থাৎ সমাজে অন্যান্য সংগঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, তার অভিজ্ঞতায় আমরা বলতে পারি, এখানেও নিশ্চয়ই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া গৃহীত হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা এনসিটিবি’র কর্তা ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় এই সাম্প্রদায়িকীকরণ করেছেন। কিন্তু বিষয়টি এত সরল সম্ভবত নয়। কেননা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বলে, সরকার পরিবর্তন হলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের একটি রদ-বদল ঘটে। সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ ব্যক্তিরাই তখন প্রশাসনের নানা পর্যায়ে আসেন। প্রশাসন বা অন্যান্য ক্ষেত্রে এই দলীয়করণ ভালো না মন্দ, সে আলোচনা এখানে নয়; কিন্তু যে আলোচনাটি গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো- বর্তমান মহাজোট সরকার প্রায় সাত বছরের অধিক সময় ধরে ক্ষমতায় থেকে কাদের নিয়োগ দিলেন, যারা হেফাজতের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী পাঠ্য পুস্তকে পরিবর্তন করলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বাংলাদেশের গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে তাকাতে হবে। এই কিছুদিন আগে এডভোকেট রাণা দাশগুপ্ত একটি আলোচনায় বলেছেন, বর্তমান সরকারের সময় জামায়াতে ইসলামের ৭২ জন রোকন পর্যায়ের নেতা বিভিন্ন স্থান থেকে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক নৌকা মার্কায় নির্বাচন করে চেয়ারম্যান পদে জয় লাভ করেছে। তাছাড়া প্রায়শই গণমাধ্যমে আমরা দেখতে পাই, জামাত-বিএনপি’র নেতারা এখন দলে দলে আওয়ামী লীগে যোগদান করছে। এটি তো গেল প্রকাশিত তথ্য, এমন অপ্রকাশিত নানা তথ্য রয়েছে, যেগুলো এখনও হয়তো আমরা জানতে পারি না। প্রশাসনের নানা পর্যায়ে এখন জামায়াতের ভাবাদর্শের লোকজন বেশ শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। কাজটি তারা করেছে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মেরুদ-হীনতা ও অসততার সুযোগে। এরা ভোল পাল্টে এখন বঙ্গবন্ধুর বাণী আওড়াচ্ছে এবং সরকারও তেলে টইটুম্বুর হয়ে এদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে বসাচ্ছে। ফলে আক্ষরিক অর্থেই যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেন, তারা ধীরে ধীরে হয়ে পড়ছেন সংখ্যালঘু। ফলে মতামত দেবার স্বাধীনতা তাঁদের থাকলেও, তা কোনো কাজে লাগছে না। ২০১৭ সালের পাঠ্যপুস্তকে যে সাম্প্রদায়িকীকরণ ঘটেছে, তা হলো এই ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধবিরোধিদের প্রতিষ্ঠারই ফলাফল। সরকারের আপোষনীতি তো আছেই, প্রশাসনেও এই আপোষকে হাততালি দিয়ে স্বাগত জানানোর মত লোকের অভাব নেই। বস্তুত শিক্ষাক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটিই গত কয়েক বছরে প্রতিষ্ঠা করেছে স্বাধীনতাবিরোধি চক্রের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মেরুদ-হীনতা।

কয়েকটি নির্দিষ্ট বয়সের অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগের সবচেয়ে কার্যকর পন্থাটি হলো পাঠ্যপুস্তক। এ বিষয়ে মিশেল ডাব্লিউ অ্যাপেলের তিনটি প্রবন্ধ যুগান্তকারী কিছু তথ্য আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। একটি প্রবন্ধের নাম আইডিওলজি অ্যান্ড কারিকুলাম, যেখানে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষাক্রমের রাজনীতি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েতবিরোধী বেশ কয়েকটি প্রজন্ম গড়ে তুলেছে কেবল পাঠ্য পুস্তকের মাধ্যমে। চীন এবং হংকং ঔপনিবেশিকতার যে নিজস্ব বয়ান তৈরি করেছে, তাও তারা পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে করেছে। জন লিমন হার্ট তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য সিআইএস’ রাশিয়ানস- এ আমাদের জানিয়েছেন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পর বিভিন্ন রাষ্ট্রের পাঠ্যপুস্তকে মার্ক্স ও লেলিনবাদ বিরোধী বক্তব্য বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সিআইএ কীভাবে কাড়ি কাড়ি ডলার খরচ করেছে। সুতরাং সব দেশেই সব সময়েই পাঠ্যপুস্তককে যোগাযোগ ও মানসকাঠামো গঠনের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে এই মাধ্যম আরও শক্তিশালী, কেননা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠ্যপুস্তকের বাইরে আর কিছু তেমন গুরুত্ব পায় না। অন্যদিকে পাঠ্যপুস্তকে যা দেয়া হচ্ছে, যেহেতু পরীক্ষা সেগুলোর মধ্য থেকেই হবে, সেহেতু এগুলো শিক্ষার্থীরা পড়তে বাধ্য। সম্প্রতি পাঠ্যপুস্তকের যে সাম্প্রদায়িকীকরণ ঘটেছে, তা ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে চলে গেছে এবং এর আলোকে ক্লাশও শুরু হয়ে গেছে। আর কিছুদিন পর পরীক্ষা শুরু হবে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে। অর্থাৎ একটি প্রজন্ম এই বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতা মাথার মধ্যে নিয়ে বড় হবে। ধরা যাক, আগামী পাঠ্যপুস্তকগুলো যদি অসাম্প্রদায়িকও হয়, তবুও তার মনোজগত পরিবর্তন হবে না বা হওয়াটা কঠিন। কারণ, ইতোমধ্যেই তার কাছে একটি বার্তা পৌঁছে গেছে যে, এই পাঠ্যপুস্তকে যা রাখা হয়েছে তা কতিপয় হুজুরের পরামর্শে রাখা হয়েছে; আগামীতে তা পরিবর্তন করলে তার প্রথমেই মনে হবে বা তাকে বোঝানো হবে যে, হুজুরদের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। রাষ্ট্র যে হুজুরদের নয়, রাষ্ট্র যে সবার- এই ধারণা তখন তাকে দেয়া অনেক কঠিন কাজ হয়ে পড়বে।

পাঠ্যপুস্তকে যে গরমিল রয়েছে, তার মাত্র একটি দিক নিয়েই আলোচনা হয়েছে- “সাম্প্রদায়িকতা”। তথ্য ও তত্ত্বগত ভুল, ব্যাকরণগত ভুল, উপস্থাপনার ভুল, অসম্পূর্ণ তথ্যসহ আরও অন্তত ১৩ রকমের ভুল রয়েছে চলতি বছরের পাঠ্যপুস্তকে। সেগুলো পড়েই একটি প্রজন্ম এ বছরের শিক্ষাবর্ষ শেষ করবে। এর চেয়ে আত্মঘাতী আর কোনো ঘটনা আমার চোখে পড়ে না। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে এর চেয়ে বড় কোনো বাধা আর হতে পারে না। এমনিতেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলেছে, বিগত কয়েক বছরে তাকে একেবারে শয্যাশায়ী করে ফেলা হয়েছে। আমাদের সকলের এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। না হলে সরকার এই রোগাক্রান্ত শয্যাশায়ী শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রথমে মর্গে পাঠাবে, তারপর ফরমালিন দিয়ে সেটাই আবার আমাদের সামনে হাজির করবে। আগামী প্রজন্মের মগজের কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুকার আগেই আমাদের প্রতিরোধ যেন রাষ্ট্রের যাবতীয় অসভ্যতাকে আঘাত করতে পারে- রমনার বটমূলে সূর্যোদয়ের ভৈরবী রাগের সঙ্গে এই অন্তর্গত শ্লোগানটুকুও নথিভুক্ত হোক। শুভ নববর্ষ।

 

মারুফ রসূল : লেখক, ব্লগার

চিত্রশিল্প : নতুন দিন, মুস্তাফা মনোয়ার

Views All Time
Views All Time
175
Views Today
Views Today
1
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top