ঢাকা ,  শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  ৭ আশ্বিন ১৪২৪

উপ সম্পাদকীয়

অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ প্রেক্ষিত পাঠ্যপুস্তকের হেফাজতিকরণ (৪)

বাংলাদেশের হৃদয় হতে

 

বাংলাদেশের বয়স এখন ৪৬ বছর। ১৯৭১ এ সশস্ত্র যুদ্ধ আর নজিরবিহীন ত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছিল বাংলাদেশ। এটিই একমাত্র দেশ যার ভিত্তিভূমিতে আছে এক বিরল গণহত্যার বিষয়। অর্থাৎ, এই দেশের স্বাধীনতার আকাঙ্খা প্রধানতঃ দেশবাসীর উপর কুশাসন চাপিয়ে দেওয়ার পরিণতিতে জনমনে সঞ্চারিত হয়েছিল। পাকিস্তান আমলে সব উড়ে এসে জুড়ে বসা সামরিক-বেসামরিক শাষকদের হিং¯্র মনোভঙ্গি আমাদের এই আকাঙ্খাকে শানিত করেছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিরাপোষভাবে ও অবিচলিতভাবে ঐ হিং¯্রতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন ষাটের দশকের প্রায় শুরুতেই। এর আগে নিজ রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে তিনি বাঙালীর স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধীকারের দাবীতে অন্য অনেকের চাইতে শুধু বেশী সোচ্চারই থাকেননি, বরং অগ্রণী ভূমিকাও পালন করেছেন। একাত্তরে তিনি সত্তরের সাধারন নির্বাচনে বাংলার মানুষের নিরঙ্কুশ সমর্থন লাভের মধ্য দিয়ে এই বাংলায় একমেবাদ্বিতীয়ম নেতায় পরিগণিত হলেন। ক্ষমতা হস্তান্তরে পাক কুশাষকদের বা সামরিক জান্তার বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ ভূমিকা বাংলার মানুষের জন্য আর কোন পথই খোলা রাখলো না। ফলে স্বাধীনতার আকাঙ্খা এবার বাস্তবায়নের রূপ পেল বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে। বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার অর্থই ছিল বাঙালীদেরকে চরমভাবে অবজ্ঞা ও উপেক্ষা করা। আর এবার তা মেনে নেবার কোন প্রশ্নই ছিল না। বঙ্গবন্ধু তখন বাঙালীর মুক্তি-আকাঙ্খার মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তাঁকে বন্দী করেও তাই বাংলার মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্খাকে দমানো গেলনা। নির্বিচার গণহত্যা আর মানবতাবিরোধী অপরাধ করেও ঠেকানো গেলনা বাংলার অমিত তেজকে। এই যে মুক্তির আকাঙ্খা এর পশ্চাদভূমিতে স্পষ্টতই লক্ষ্যনীয় ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও বাঙালী সত্ত্বার অসাম্প্রদায়িক চেতনা। আমাদের হাজার বছরের লালিত সংস্কৃতি যে দর্শনটিকে উচ্চকিত করে রেখেছে সেই ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ এটাকে পর্যুদস্ত করার সার্বিক প্রয়াসই চালানো হয়েছিল গোটা পাকিস্তান আমল জুড়ে। এক মিথ্যা ও কৃত্রিম মোড়কে বাঙালী সংস্কৃতি চেতনা ও বাঙালীর ভাষাকে আবৃত করার অপপ্রয়াসই ছিল পাক শাষকবর্গের শাষনরীতি। আমরা বাঙালীরা আমাদের স্বকীয়তা, সাতন্ত্র্যবোধ, সভ্যতা, সংস্কৃতিকে লাঞ্ছিত হতে দেখে রুখে দাঁড়ালাম। ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ এই ব্যথা যখন শিল্পীর কন্ঠ ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো তখন বাংলার শহরে-বন্দরে, নগরে-কন্দরে সর্বস্তরের বাঙালীর মনে হাজার বছরের জাতিসত্তার চেতনার সলতেটি জ্বলে উঠলো আবার। সমবেত কন্ঠে সবাই গর্জে উঠে শাষকদের স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিল, ‘যায় যদি যাক প্রাণ, তবু দেবোনা দেবোনা দেবোনা গোলার ধান।’ ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা আর গোলার ধান রক্ষা একই মোহনায় এসে মিলে গেল। সংগ্রামের আর জীবন দানের মহাপ্রেরণা হয়ে উঠলো যেন তা। এরই ধারাবাহিকতায় গেল শতকের পঞ্চাশ ও ষাট দশক জুড়ে আমরা শেরে বাংলা-সোহরাওয়ার্দী-মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালীর সংগ্রাম ও গৌরবময় পরাক্রমের স্বাক্ষর পেলাম বারবার। এই সংগ্রাম সাধনার প্রনোদনাটি ছিলো বাঙালীত্ব, বাংলা ভাষা আর বাঙালী সংস্কৃতির উন্নত মহিমা। তাই পাকিস্তানীদের যাবতীয় অপচেষ্টার বিপরীতে দেশের আপামর বাঙালীদের কিন্তু সম্বিৎ ফিরতে দেরী হয়নি সেদিন। শিক্ষক-ছাত্র, কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক, মুটে-মুজুর-কুলি-রিক্সাওয়ালা, মসজিদের ইমাম, বুদ্ধিজীবি, কামার-কুমোর, নারী-পুরুষ, কিশোর-বৃদ্ধ, সংস্কৃতি কর্মী সকলেই যেন খুঁজে পেল নিজ নিজ ঠিকানা। ইতিহাস নামক দর্পনের সামনে দাঁড়িয়ে সে খুবই স্পষ্টভাবে দেখতে পেল তার নিজ বাঙালী সত্তাটিকে। সত্য বটে, পাকিস্তানীদের অবিমৃষ্যকারীতায় কিছুকাল সে নির্জীব ও আত্মপরিচয়ের ধন্দে পড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলার উপক্রম করেছিল। কিন্তু আঘাত আসতেই সম্বিৎ ফিরে পেল সে। নেতৃত্বে দেখতে পেল অতিকায় মানুষ শেখ মুজিবকে শির যাঁর তখন অভ্রভেদী, যিনি আগা মেমনের মতো একাই সকল শত্রুর মোকাবেলায় হিমালয়ের মতো অটল, স্তিতধী। কন্ঠে তাঁর একই জিজ্ঞাসাঃ ‘বাংলা আমার জননী, আমার ধাত্রী, আমার দেশ/কেনগো মা তোর ধুলায় আসন, কেনগো মা তোর মলিন বেশ?’ জিজ্ঞাসা আগুনের ফুলকি হয়ে সর্বস্তরে সর্বমহলে ছড়িয়ে পড়ল। বাংলা, বাঙালী বাংলা ভাষা তখন সংগ্রামের উপজীব্য হয়ে উঠল আর আমাদের জাতিসত্তার অনির্বাণ দ্বীপ শিখাটি অর্থাৎ, সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনাটি জ্বলে উঠলো লক লক করে। ইতিহাসে যতবারই আমাদের এই চেতনাকে বিকৃত করার প্রয়াস চলেছে ততবারই বাঙালী জেগে উঠেছে- একাট্টা হয়েছে এর বিরুদ্ধে। একাত্তরে আমরা এই জেগে ওঠাটিকেই সবচেয়ে প্রবলরূপে ও সবচেয়ে শাণিতরূপে দেখতে পাই।

মোদ্দাকথা একাত্তর পর্বের সশস্ত্র সংগ্রামটি ছিলো দীর্ঘ রাজনৈতিক ও নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রামের চূড়ান্তরূপ। আমরা এই লড়াইয়ে শুধু যে নিজেদের শৌর্য্য-বীর্য ও সাহসের পরাকাষ্ঠা দেখাতে পেরেছিলাম তাই-ই নয়। এই যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর বাঙালীসত্তার পরিচয়টি প্রচ-ভাবে মেলে ধরতে পেরেছিলাম। আর এখানেই একাত্তরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিহিত। পাকিস্তানীরা আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি ও ভাষা হিন্দুর উত্তরাধিকার হিসেবে আখ্যায়িত করে আমাদেরকে নতুনভাবে মুসলমান বানাবার অপচেষ্টা করেছিল। আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে পঁচাত্তরের নির্মমতার মধ্য দিয়ে ঐ প্রতিক্রিয়াশীল অপশক্তির পুনর্বাসনের দরুন ফের আমাদেরকে ‘নও মুসলিম’ বানাবার এক জঘন্য ও হীন প্রচেষ্টা জিয়া-এরশাদ-খালেদার পৃষ্ঠপোষকতায় আর পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আই এস আই’র প্রত্যক্ষ মদদে চলছে। পাক আমলে আমাদেরকে ‘সাচ্চা মুসলমান’ বানাবার জন্য ভাষা-সংস্কৃতির উপর খবরদারী শুরু হয়েছিল। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা, রবীন্দ্রনাথকে নির্বাসনে পাঠানোর পাঁয়তারা আর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার পংক্তি পরিবর্তনের ধৃষ্টতা দেখাতেও তারা পিছপা ছিলনা সেদিন। এমনকি, রোমান বা আরবী হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব দিতেও কসুর করেনি ঐ অপরিণামদর্শী শাষকগোষ্ঠী ও তাদের পদলেহীরা। কেউ কেউ আবার ‘রবীন্দ্র সংগীত লেখার’ জন্যও কোন কোন লেখক সাহিত্যিককে পরামর্শ দিতে ভোলেন নি। চিন্তা-চেতনার কতখানি দেউলিয়াত্ব ও বন্ধ্যাত্ব হলে, সংস্কৃতি-সভ্যতা সম্পর্কে কতখানি মূর্খ ও অর্বাচীন হলে এমনটা চিন্তা করা যায় তা সচেতন ব্যক্তিদেরকে একটু ভেবে দেখতে অনুরোধ করি। এই বিকৃত মানসিকতা নিয়ে ওরা দেশ শাসন করেছে এবং আজও ঐ একই মানসিকতায় আচ্ছ্বন্নরা এই স্বাধীন বাংলাদেশটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। এজন্য জঙ্গিবাদী তৎপরতা চালাতেও দ্বিধা নেই ওদের।

পাক আমলে ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি’ পরিবর্তন করে ‘ফজরে উঠিয়া আমি দিলে দিলে বলি’ ঐ জঘন্য মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ ছিলো। নজরুলের ‘মহাশ্মশানের’ স্থলে ‘গোরস্থান’ ‘ভগবানের’ স্থলে ‘রহমান’ ইত্যাদি সংশোধনী ঐ বিকৃত ও ইতিহাস বিষয়ে সম্পূর্ণ গন্ডমূর্খ শাষক ও তাদের তল্পীবাহকদের ভন্ডামী আর আত্মপ্রচারণা মাত্র! সাম্প্রতিককালে আবার পাঠ্যপুস্তকে অনুরূপ সংশোধনী আনার অনেকগুলি নিদর্শন দেখতে পাচ্ছি। হেফাজতীদের সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির কাছে নতি স্বীকার করে এককালের প্রগতিবাদী ছাত্রনেতা বর্তমানে শিক্ষামন্ত্রী হয়ে কি আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতিভূ বনে গেলেন তা ভাবতেও আশ্চর্য হতে হয়। শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ সাহেবের অপরিণামদর্শিতায় যে ধ্বংস-প্রায় রূপ ধারণ করেছে তা কি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও প্রশাষনের মধ্যকার তাবড় তাবড় বিশেষজ্ঞরা দেখতে পান? পাঠ্যপুস্তক থেকে যেসব কারণ দর্শিয়ে বিভিন্ন পদ্য, কবিতা, লেখা বাদ দেয়া হলো বা সংশোধন করা হলো তা যে সেই পাকিস্তানী আমলের সাম্প্রদায়িক চক্রের এদেশীয় সংস্করণ তা বুঝতে কি আর রকেট সায়েন্স জানার প্রয়োজন হয়? ভাষা যারা সাম্প্রদায়িক করে তুলতে প্রয়াসী তারা তো মনুষ্য পদবাচ্যই নয়। শীতলক্ষ্যা-পদ্মা-মেঘনা-ভাগিরথী-ইরাবতী-শিপ্রা-আমাজন-দানিয়ুব-ভলগা-গঙ্গা বা রাইন এইসব নদী কার বা কাদের? নদীর তীরবর্তী সকল ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, পেশার মানুষের নাকি ঐ দেশের খ্রিস্টান-হিন্দু-বৌদ্ধ বা মুসলমান শাষকের অধীনস্থ একটা বিষয়? বহতা নদীতো তার সুমহান ঔদার্য্যে সকল ভাষা-ভাষী-বর্ণ-গোত্র-সম্প্রদায়-ধর্মের মানুষকে সেবা দিয়ে যায়। সেবা দেওয়াই তার কাজ। ধোপা, গৃহস্থ, বধূ, ইমাম, রাখাল, শিক্ষক, ছাত্র সবাই ঐ পানিতে গোসল করে, ঐ পানি পান করে। এতে তাদের কারুরই জাত যে যায় না এই কথাটি কি ঐ অর্বাচীনেরা বোঝে? কোন কোন ক্ষেত্রে যে বোঝেনা তা কিন্তু নয়। কেবলই মতলবী স্বার্থে না বোঝার ভান করে মাত্র। ভাষাও ঠিক তেমনি বহতা নদীর মতো। বাংলা ভাষা বাঙালী মাত্রের ভাষা। একে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানের ভাষা বানানোর চেষ্টা আর কিছুই নয় মানুষে মানুষে ভেদ-বিভেদ তৈরী করে গোষ্ঠীগত স্বার্থোদ্ধারের অপচেষ্টা ছাড়া।

পাঠ্যসূচীর হেফাজতীকরণের মধ্যে মুসলমানিত্ব নেই, আছে মোল্লাত্ব। সুতরাং, মোল্লাতন্ত্র ধর্ম বিষয়ে খবরদারী করুক এতে আপত্তি নেই, কিন্তু জাতিসত্তা-ভাষা-সংস্কৃতি নিয়েও যদি তাকে খবরদারী করার সুযোগ দেয়া হয় তাহলে এর ফলাফল অবশ্যই ভাল হবে না- হতে পারে না। পাকিস্তানী প্রতিক্রিয়াশীলতাকে এই উপায়ে ফিরিয়ে আনার অপকৌশলের বিরুদ্ধে ষাট দশকের মতো করে রুখে দিতে হবে, নইলে কি ধরনের বিপদ আমাদের মাথায় একদিন নেমে আসবে তা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে! বর্তমান পাকিস্তান কিন্তু এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

দুনিয়ার অন্যতম ব্যর্থ রাষ্ট্র পাকিস্তান জন্ম থেকেই শিক্ষাকে পদদলিত করে যুদ্ধবাজ ও জঙ্গী / মোল্লাতন্ত্রের দিকে ছুটেছে। ১৯৪৮ সালে দেশের প্রথম বাজেটের ৪১% ই খরচ হয়েছে সামরিক খাতে, শিক্ষাখাতে ছিল সামান্য। সুচতুর পরিকল্পনা করে ইসলামের নামে শিক্ষাকে এমনভাবে হিংস্র ও জঙ্গীবাদী করা হয়েছে যে মাদ্রাসা তো বটেই, স্কুল কলেজগুলো পর্যন্ত হয়েছে মৌলবাদী হিংস্র নাগরিক উৎপাদনের কারখানা। গত ৭০ বছর ধরে বাচ্চারা ওই বিষ গিলে গিলে বড় হয়েছে। ফলে প্রায় পুরো জাতটা এমনভাবে সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গী হয়ে গেছে যে, সে নরক থেকে পাকিস্তান কোনোদিন বেরোতে পারবে কিনা সন্দেহ। বাংলাদেশও সেই পথে এগিয়ে চলেছে।

পাকিস্তানের এই করুণ অবস্থা ফুটে উঠেছে অনেক সমীক্ষায়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো টঝঈওজঋ (ইউনাইটেড স্টেটস কমিশন অন ইন্টারন্যাশন্যাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম)-এর অনুদানে ইন্টারন্যাশন্যাল সেন্টার ফর রিলিজিওন অ্যা- ডিপ্লোম্যাসি (ওঈজউ)-এর ২০১১ সালে করা। তার সাথে পাকিস্তানী সংগঠনও আছে। দেখা গেছে :-

১. অক্ষরজ্ঞান হবার সময় থেকেই বাচ্চাদের রক্তে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গীবাদ ঢোকানো হচ্ছে। যেমন অ-তে আল্লাহ, ই-তে বন্দুক, ঔ-তে জিহাদ ইত্যাদি ।

২. বাচ্চারা শিক্ষকদের অভ্রান্ত মনে করে। প্রত্যেক শিক্ষকই বলেছেন “ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজ”। মুশকিলটা হলো সেই ইসলামটা কি আর কে তার শত্রু সেটা তাঁরাই ঠিক করবেন ও জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দেবেন।

৩. তার পর বই থেকেই ক্রমাগত শেখানো হয়-“পাকিস্তান শুধুমাত্র মুসলিমদের জন্য”, “ভারত, পশ্চিমা বিশ্ব ও হিন্দুরা ইসলামের চিরকালের দুশমন”, “মুসলিমদের জিহাদ করতে হবে ” এরকম শত শত উদাহরণ আছে স্কুল কলেজের বইগুলোতে। আছে হিন্দু ও খ্রিস্টানদের প্রতি ঘৃণা।

৪. সরকারী স্কুলের ৮০ % ছাত্র বলেছে -“অমুসলিমেরা ইসলামের শত্রু।”

৫. শিক্ষকেরা ক্লাসের মধ্যেই সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ান, যা অমোঘ সত্য হিসেবে বাচ্চাদের মাথায় গেঁথে যায়।

৬. বেশীর ভাগ শিক্ষকই বলেছেন অমুসলিমদেরকে কিছুতেই সরকারী উচ্চপদ দেয়া চলবে না।

৭. শিক্ষকদের অনেকেই মনে করেন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাগরিক অধিকার থাকা উচিত নয়।

৮. ক্লাসরুমের মধ্যে ঘুড়ি, দাবার বোর্ড, ক্যারমবোর্ড, গীটার ইত্যাদির ছবি টাঙিয়ে শেখানো হয় সেগুলো “গুনাহের কাজ” ।

৯. সরকারী স্কুলগুলোতে হিন্দু-খ্রিস্টান বাচ্চাদের জোর করে ইসলামী ক্লাসে ঢুকিয়ে দেয়া হয়, তাদের নিজেদের ধর্মীয় ক্লাস করতে দেয়া হয়না।

১০. এসব তথ্যে প্রমাণিত হয় স্কুল-কলেজের বইগুলোতে সাম্প্রদায়িক উপাদান ঢোকালে জাতির কত বড় সর্বনাশ হতে পারে। একবার এরকম হলে তাকে শোধরানো অসম্ভব। ২০০৬ সালে এটা শোধরাবার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু জামাত ও অন্যান্য রক্ষণশীল ইসলামী ও রাজনৈতিক দলের তীব্র বিরোধীতার জন্য কিছুই করা যায়নি।

পাকিস্তানে আজকের এই ভয়াবহ অবস্থা কিন্তু শুরু হয়েছিল খুবই আস্তে করে বহু দিন আগে। আজ ঠিক অনুরূপভাবেই আমাদের দেশে তা শুরু হয়েছে। সুতরাং, এ ব্যাপারে সকল প্রগতিশীল শক্তিকে জেগে উঠতে হবে, কথা বলতে হবে দৃঢ় প্রত্যয়ে।

 

শাহীন রেজা নূর : সাংবাদিক, শহীদ সন্তান

চিত্রশিল্প : নতুন দিন, মুস্তাফা মনোয়ার

Views All Time
Views All Time
140
Views Today
Views Today
1
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top