উপ সম্পাদকীয়

উদ্দীপ্ত আওয়ামী লীগের ভিন্নমাত্রার কাউন্সিল অধিবেশন

সদরে অন্দরে
মোস্তফা হোসেইন

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২২ ও ২৩ অক্টোবর। বলতে দ্বিধা নেই বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্ভবত এই সম্মেলনটি হবে সর্বাধিক আড়ম্বরপূর্ণ। যেভাবে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সাড়া পড়েছে তাতে মনে হয় প্রতিটি অংশগ্রহণকারীই আনন্দমুখর এই সময়ের জন্য অপেক্ষা করছেন। আয়োজন দেখে অনেকেই এটাকে বাড়াবাড়ি বলে মনে করলেও একইসঙ্গে কর্মী সমর্থকদের মানসিকতা বিবেচনা করে সেরকম ভাবার অবকাশ কম। যদিও দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা বাড়াবাড়ি না করার পক্ষেই নির্দেশনা দিয়েছেন। এবং স্পষ্টত বলে দিয়েছেন এই ব্যয়ের পুরোটাই যেন দলীয় তহবিল থেকে বহন করা হয়।
এ ধরনের সম্মেলনে অংশগ্রহনকারীদের সবারই আকাঙ্খা থাকে নতুন কমিটি পাওয়া। সর্বোপরি দলীয় প্রধানের কাছ থেকে নতুন কিছু শোনার। আওয়ামী লীগ প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে কর্মী সমর্থকদের সন্তুষ্ট করার মতো অবস্থানও রয়েছে। অন্তত তিনি গর্বসহই বলতে পারেন বাংলাদেশের উন্নয়নের যে চিত্র আজকে বিশ্বসভায় মাথা উচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে, তার প্রায় পুরোটাই তাঁর ও তাঁর দলের কৃতিত্ব। যাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার স্বীকৃত উত্তরাধিকার হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। বিভিন্ন কারণে এবছরের সম্মেলনটি জাতীয় রাজনীতিতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর যৌক্তিক কারণ রয়েছে।
বিগত সময়ে প্রতিটি কাউন্সিল অধিবেশনে কর্মীদের মধ্যে আশঙ্কা, নেতিবাচক রাজনৈতিক ধারা মোকাবেলা করার মতো অবস্থা দেখতে হয়েছে। এবার এর ব্যতিক্রম। তাদের সামনে সাফল্য সর্বকালের মধ্যে অধিকতর। তাদের সামনে এখন দারিদ্র্য বিমোচন আর বড় সমস্যা নয়। এখন তাদের স্বপ্ন দেখার পালা বাংলাদেশকে বিশ্বমাত্রায় পৌঁছে দেওয়া, বাংলাদেশকে কিভাবে উন্নত বিশ্বের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া যায় সেই লক্ষ্য। আর তাদের এই অবস্থা থাকবেই না কেন। তাদের দল সরকার পরিচালনা করে দেখিয়ে দিয়েছে, তারা শুধু স্বাধীকার আন্দোলন কিংবা মুক্তিযুদ্ধই নয় দেশ স্বাধীন করার পরবর্তী কাজগুলোও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছে।
পাহাড়সমান নেতৃত্ব নিয়ে বঙ্গবন্ধু বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের স্বাধীন একটি দেশের জন্ম দিয়েছেন। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির হাতে তিনি নিহত হলে তারা মনে করেছিল বাংলাদেশ নামের দেশটি আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। পাকিস্তান নামের সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের জন্ম হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে ২৩ বছর নেতৃত্ব দিতে হয়েছে। তাঁর কন্যা বঙ্গবন্ধুর শাহাদতের পর ২১ বছরে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। আর পরবর্তী ২৫ বছরের কম সময়ে বাংলাদেশকে ঈর্ষণীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরসুরীর নেতৃত্ব বাংলাদেশকে ব্যাপক প্রতিকূলতা মোকাবেলা করেই এগিয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু সরাসরি পাকিস্তানী অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তাঁর কন্যা শেখ হাসিনাকে লড়াই করতে হয়েছে পাকিস্তানীদের পদলেহী এদেশীয় কিছু চক্রের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চাপ ও চক্রান্তও তাকে সফলভাবে মোকাবেলা করতে হয়েছে। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন বিশ্বের ক্ষুধা পীড়িত একটি দেশ- যাকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল সেই দেশটি আজ পশ্চিমা বিশ্বের কাছেও বিশেষ মর্যাদায় উপনীত হতে পেরেছে।
২০১১ সালে বাংলাদেশের উন্নয়ন মাইল ফলক পদ্মাসেতুকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংক যেভাবে বাংলাদেশকে ব্যর্থ ও দুর্নীতির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল শেখ হাসিনা তাকে প্রত্যাঘাত করেন। বিশ্বব্যাংক আজকে অনুধাবন করতে পেরেছে বাংলাদেশ সত্যিই পারঙ্গম। শেখ হাসিনার সাহসী পদক্ষেপ তাদের দেখিয়ে দিয়েছে, পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্পও বাংলাদেশ নিজের অর্থায়নে করতে সক্ষম। শেখ হাসিনা জোরালোভাবেই বলেছেন, তোমরা প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে নিলে কি হবে, বাংলাদেশে পদ্মা সেতু হবে। আশার কথা পদ্মা সেতু এখন আর শুধু স্বপ্নের বিষয় নয়।
আজকে সেই বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টকেই বাংলাদেশ আসতে হয়। তাকে বিবৃতি দিয়ে বলতে হয়, যে দেশটি মাত্র এক দশককালের মধ্যে দারিদ্র্যসীমা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে পারে সেই দেশটি তিনি একটু দেখতে চান। আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বব্যাংকের দোষারোপটি তিনি প্রত্যাহার না করলেও প্রকারান্তরে এটাই বুঝিয়ে দিয়েছেন, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করেছিল তা ছিল ভুল। এবং এখন তারা নতুন করে চিন্তা করছে। আর বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরটা এমন একটা সময়ে হয়েছে যখন শেখ হাসিনা বিমসটেকের হয়ে ভারতে অবস্থান করছিলেন ব্রিকস এর সম্মেলনে। যে ব্রিকস আগামীতে বিশ্বব্যাংকের প্রধান প্রতিদ্বন্দী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। দুর্মুখেরা বলে, আগে যেখানে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের কাছে বাংলাদেশকে ধর্না দিতে হত এখন সেই বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টকেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
এটাতো শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ফসল। সেই ফসলতো ভোগ করছে বাংলাদেশের মানুষ। শুধু গড় আয়ু ৭০ বছরে উপনীত হওয়াই নয়, দারিদ্র্যসীমা ৪২ শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনার যে আকাশসমান সাফল্য তাকেও বিশ্ব নেতৃত্বকে তাক লাগিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। ভিশন ২১ এখন ভিশন ৪১ এ গিয়ে ঠেকেছে। এখন লক্ষ্য মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠা করা।
তার জন্য প্রয়োজনীয় উন্নয়নগুলো সমান তালে সম্পন্ন হতে শুরু করেছে। সুতরাং দারিদ্র্য বিমোচনই নয় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি সফল হচ্ছেন এটাও নিশ্চিতই বলা যায়। সেক্ষেত্রে অবকাঠামোগত সুবিধাগুলোর উন্নয়ন অবশ্যই উল্লেখ করার মতো। বিশেষ করে যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ-জ্বালানী ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নয়ন বিদেশিদের বিনিয়োগ আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছে। অভ্যন্তরীন অর্থনীতিকে বড় আকারে ইতিবাচক ঝাকুনি দিতে সক্ষম হয়েছে। যে দেশের মানুষ প্রতি ঘন্টা অন্তর ঘন্টাকালের জন্য অন্ধকারে ডুবে থাকত বিদ্যুতের অভাবে সেই দেশ আজকে বিদ্যুতে প্রায় স্বয়ং সম্পূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় দশগুণ বৃদ্ধি তার প্রমান। ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে একের পর এক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা আগামী আশঙ্কাকেও দূর করে দিচ্ছে।
এই সাফল্যগুলোকে মনের বল করে যে মুহূর্তে কাউন্সিলররা ঢাকা রওনা হবে তখন রাস্তায় দেখবে তাদের নেত্রীর সাফল্যের চিহ্ন। ঢাকার সঙ্গে প্রতিটি জেলা ও উপজেলা কেন্দ্রের যোগাযোগ ব্যবস্থায় অকল্পনীয় উন্নয়ন তাদের আপ্লুত করতেই পারে। অন্তত বঙ্গবন্ধুর আমলে কিংবা মওলানা ভাসানীর আওয়ামী লীগ আমলে যেমন কাউন্সিলররা চিড়া আর গুড় নিয়ে ঢাকায় আসতে হতো কয়েকদিনের সময় নিয়ে, এবারের কাউন্সিলরদের আর সেরকম নিরুদ্দেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে আসতে হবে না। কারণ তারা সকালে বাড়ি থেকে রওনা হয়েও কাউন্সিল অধিবেশনে যোগ দিতে পারবেন। কাছাকাছি জায়গাগুলো থেকে কাউন্সিলররা বাড়ি থেকেই এসে যোগ দেবেন। এই যে যোগাযোগের ব্যাপক উন্নয়ন তা তাদের নেত্রীর সাফল্যকেই চিহ্নিত করে। সুতরাং এবারের সম্মেলনটি হবে তাদের উৎসবের আয়োজন।
বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ নামের একটা মানচিত্র দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সেই মানচিত্রকেও সম্প্রসারিত করেছেন। না কোনো আধিপত্যবাদ কিংবা যুদ্ধ করে দেশ দখল করার মাধ্যমে নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত ও মিয়ানমারের সমুদ্রসীমার যে সমস্যা ৬০ বছরেরও অধিক সময় ধরে চলে আসছিল। সেই সমুদ্রসীমা আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্জন করার মাধ্যমে আজকে বাংলাদেশের মানচিত্র পরিবর্তন হয়েছে। আজ বিশ্বে জলসম্পদের বিশালত্বের তালিকায় বাংলাদেশের নামও যুক্ত হয়েছে। গভীর সমুদ্র বন্দর প্রতিষ্ঠায় বিত্তবান দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। সেক্ষেত্রে শেখ হাসিনা নিজের দেশের স্বার্থকে অধিকতর গুরুত্ব দিচ্ছেন। যে কারণে নিকট প্রতিবেশি ও বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের চাহিদা মতোও গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠার বিষয়টি তিনি স্বীকৃতি দেননি। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশকেও তিনি সুযোগ দিচ্ছেন না। মানচিত্রে শুধু জলসীমা সম্প্রসারিত হয়েছে তাই নয়, ১৯৪৭ সালের পর সীমান্তবর্তী কিছু এলাকা যেখানে দেশহীন স্থলভূমি হিসেবে পরিচিত ছিল সেই স্থলভ’মিকেও তিনি নিজদেশের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ফলে স্থলভাগেও মানচিত্রের যোগ হওয়ার বিষয়টি বিশ্বস্বীকৃত।
এটা তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে সম্ভব হয়েছে। আজকে চীনের মতো শক্তিশালী দেশের প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশে আসতে হয় বিশাল বাণিজ্য প্রতিনিধি নিয়ে। তাকে বাংলাদেশকে বেশ কিছু বিষয়ে অফার দিতে হয় তাদের স্বার্থ চিšতা করে। বাংলাদেশও নিজের স্বার্থ চিন্তা করে সুচিন্তিত মতামত প্রদান করেছে। আর বেশ কিছু চুক্তি ও সমঝোতাও স্বাক্ষর হয়েছে সেই সুবাদে। বাংলাদেশ কি কখনো চিন্তা করেছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মতো ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা শীর্ষ পর্যায়ের কোনো নেতা কোনো অনুরোধ করলে তা প্রত্যাখ্যান হবে। শেখ হাসিনার পক্ষে সেটাও সম্ভব হয়েছে একান্তই জাতীয় স্বার্থকে বিবেচনা করে। একাত্তরের মানবতা বিরোধীদের বিচার চলাকালে আমেরিকাসহ বিভিন্ন বহিঃশক্তির অনুরোধকেও তিনি উপেক্ষা করেছেন একান্তই জাতীয় স্বার্থ চিন্তা করে। এই যে শক্তি তা কি শুধু মনোবলের মাধ্যমেই সম্ভব। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশের জনগণের সমর্থন ও তাদের চাহিদাগুলো চিন্তা করে তাকে সময়ের সাহসী মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। এমন একটা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নিভৃত পল্লী থেকে শুরু করে শহর বন্দর থেকে যখন কাউন্সিলররা আসবেন তখন তাদের মনোবল যেমন চাঙ্গা থাকবে তেমনি তাদের চাহিদায়ও পরিবর্তন আসবে আগের ধরণ থেকে ভিন্নতরভাবে।
সঙ্গত কারণেই বলা যায়, এবারের কাউন্সিল হবে একেবারেই আলাদা মেজাজে। যা হবে ইতিহাসের মাইল ফলক।
মোস্তফা হোসেইন: শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top
Left Menu Icon
Right Menu Icon