ঢাকা ,  বৃহস্পতিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  ৬ আশ্বিন ১৪২৪

পকেট ভর্তি জীবন

একটি গল্পের খসড়া

এক শহরতলীর দালান।
দালানের ছোট্ট একটি ঘর।
ঘরে সিগারেট ফুকছে যুবক।
এ দৃশ্য নিতান্তই গতানুগতিক, যদি না সময়টা মধ্যরাত হয়।
অনিদ্রা? না, তা নয়, কোন এক দু’স্বপ্নে জেগে ওঠে যুবক।
হ্যাঁ, এ-ও গতানুগতিক বটে। যুবকেরা প্রায়ই স্বপ্ন দ্যাখে; দুঃস্বপ্নও।
পানির গ্লাসটা তুলে নেয় সে এবার জলতৃষ্ণা। কি মনে হ’তে দু’একবার ভাল করে দেখে নিল গ্লাসটা। খানিকটা ঝুঁকে প’ড়ে ঘ্রাণ নেবার চেষ্টা করলো পানির। হ্যাঁ, পানিরও গন্ধ আছে একরকম সে পায়, মাঝে মধ্যেই পায়। তবে গন্ধটা মিলিয়ে দেখবার মতো কোন গন্ধ সে খুঁজে পায় নি এযাবৎ।
বিষ নেই তো পানিতে?
হেসে ওঠে সে…. তাওকি সম্ভব! তবু গ্লাসটা আবার রেখে যুবক, পানির গাঢ় রংয়ের দিকে তাকিয়ে সে নিশ্চিত হ’তে পারে না এ বিষয়ে।
হঠাৎ করেই আলোটা নিভে যায়, কারেন্ট চলে গ্যাছে। একঝাঁক গাঢ় অন্ধকার এসে গ্রাস করে তাকে। অন্ধকারের রং যে এ্যাতোটা কালো, এই প্রথম উপলদ্ধি করলো যুবক।
নাকি এ রং মৃত্যুর! মৃত্যুকে এ্যাতো কাছ থেকে দেখা হয়নি কখনও। এখন অন্ধকারকে বড় বেশী আপন মনে হয় তার, আগেরকার মতো আর অসনীয় নয়। কবে কোন্ কালে, খুব ছোট এক ছেলে, আলো জ্বলা ঘরে চোখ বুঁজে শুয়েছিল। জানে না কখন আম্মা এসে বাতিটা নিভিয়ে দিয়ে গ্যাছে। পরে চোখ খুলে সে দ্যাখে শুধু অন্ধকার। ভাবে বুঝি অন্ধ হয়ে গ্যালো সে। বার বার ভয়ে কেঁপে কেঁপে ওঠে শরীর। এখনতো এমন হয় না। অন্ধকার দিব্যি লাগে, মৃত্যুর সাথে যেন বা কিয়ৎ মোলাকাত হয়ে যায়। যেন হাত বাড়ালেই তাকে ছোঁয়া যায়।
এ অন্ধকারে এখন কী-ই বা করার আছে তার। এখন হিংস্রতা মরে গ্যাছে, ভালবাসা ম্রিয়মান, মিথ্যাচার আর নেই -জাগে শুধু যৌনতা। হ্যাঁ এই অন্ধকারে বীর্যস্খলা করা যায় নারীর দেহে, যৌবন যার অহংকার।
বাইরের অন্ধকারে চোখ রাখে যুবক। সবেগে চলে গ্যালো একটা ট্রাক বড় রাস্তা দিয়ে। ট্রাক? না ডাইনোসর? কী এক প্রাচীনতা ঘিরে আছে সবখানে।
এবার কিন্তু সত্যি সত্যি গ্লাসে ঠোঁট ছোঁয়ালো সে। কণ্ঠনালী বেয়ে ঈষদেষ্ণা জলের ধারা নেমে যায় হৃৎপিন্ডের কাছাকাছি। কুঞ্চিত হয় মুখের বলিরেখা, ক্ষুদ্রান্ত্র বেয়ে নেমে যাচ্ছে পানির ধারা বৃহদান্ত্রের দিকে—এই ভেবে।
সেই বৃদ্ধের কথা মনে পড়ে যুবকের। লোলপরা ঠোট যুগলে উৎপ্রেক্ষার মতো ধ্বনি উচ্চারিত হতো তার। হাত দুটো প্রসারিত করে শুতো বুড়ো। যেন বা লালায়িত জীবনকে নতুন করে আঁকড়ে ধরতে চাইতো তার শীর্ণ হাত দুটো। একথা কেন মনে পড়ছে আজ গাঢ় অন্ধকারে? সে কি ড্রাগাসক্ত? যুবক সচকিত হয়, চিমটি কাটে হাতে, নাহ্ সবকিছু ঠিকঠাক আছে।
তলপেটে আলতো চাপ আসতেই এবার উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করে সে। খুব মনে হ’লে বসে থাকা চলে আরও কিছু ক্ষণ। একবার মনে হ’লো শুয়ে পড়া যাক। তবু দাঁড়ালো যুবক। টয়লেট পর্যন্ত একবারও হোঁচট না খেয়ে সে অবাক হলো না একটুও। সরে যাওয়া চোখে অন্ধকারের ফিকে রং বড় কপট লাগে। ঝট্ করে ঢুকে পরে সে টয়লেট গহীণে।
এখন ও ঘরে শূণ্যতা। এখনও ঘরে কোন দৃষ্টি নেই। এখন ওখানে কোন চিন্তা নেই, কোন স্বর নেই। এখন ওঘরে কোন অন্ধকার নেই, কেননা দেহ বর্জিত শূণ্যতার কোন রং নেই। এখন ও ঘরও নেই।
দেড়.
শোভন বল্লো, শুয়োর! রোজারিও চোখ পাকাল। শোভন আবর বল্লো, শুয়োর।
রোজারিও বল্লো, আমি জানোয়ার না সাবধান।
ঃ তুই জানোয়ার, তোর বাপ জানোয়ার, শালা…….।
ঃ তাহলে তুই আমার দুলাভাই, হিঃ হিঃ হিঃ……
ঃ না, আমি কুত্তা। তুই শুয়োর আর আমি কুত্তা, লেজ ট্যারা।
রোজারিও গম্ভীর হয়। সমগ্র আরবান সিটটা এখন মরুভূমি মনে হয়। সেই মরুভূমির মধ্যে বসে হাঁপাচ্ছে একটি শুয়োর এবং একটি কুকুর, যার লেজটি ট্যারা।
এখন তাদের দৃষ্টি পরস্পরের দিকে নিবদ্ধ। এখন তাদের আন্দোলিত করে না কিছুই। না রাজনীতি না প্রেম। বিশ্বাস এখন ধর্ষিতা নারীর মতো পোড় খাওয়া। এখন তাদের দৃষ্টিতে আছে ভয়, আছে সন্দেহ আর অবিশ্বাস।
ছুরিটা হঠাৎই চোখে পড়ে শোভনের। আগুনের লকলকে ফণার মতো তার অগ্রভাগ। ছুরি ধরা হাত প্রসারিত হয় রোজারিওর। রোদ লেগে ছুরিটাতে ঠিক্রে ওঠে আলো, আর ঝল্সে যায় তাতে শোভনের চোখজোড়া। সে চোখ লাল টক্টকে সে চোখে হিংস্রতা শুধু। সে চোখ পুড়িয়ে দ্যায় রোদ লাগা ছুরির ঝলক।
রোজারিওর পা জোরা প্রসারিত হয়। মাটি ঠুকে ঐ পা ঘোড়ার খুরের মতো। হাতে আছে এক মুঠো ধাতব উষ্ণতা। এ্যাতো শক্ত সে হাতের মুঠো, ছুড়ির বাট যেন বা ভেঙ্গে গুড়িয়ে যাবে নিমেষেই। রোজারিওর হাত এখন একতাল পাথরের মতো শক্ত। রোজারিও দ্যাখে, শোভন নয়, মেফিষ্টোফিলিস দাঁড়িয়ে আছে যেন বা তার সমস্ত হিংস্রতা নিয়ে। যার সারা গা জুড়ে থক্থকে ঘা। দুর্গন্ধ নাকে লাগে রোজারিওর। এ যেন কোন উন্মত্ততা নয়, বরং নেশার মতো এক ভীষন আমেজ-ছুরি হাতে মনে হয় তার। হৃৎপিন্ড বরাবর ছুরিটা আমূল বিদ্ধ করা গ্যালে নির্মিত হবে এক উচ্চমার্গীয় শিল্প, রোজারিও হবে যার নির্মাতা—সে ভাবে।
শোভন কিন্তু দেরী করলো না একটুও। আকেটা ছুরি এখন তারও হাতে, যাতে নকশা আঁকা। নিপুন হাতে চালাতে হবে তাকেও, একেবারে শিল্পসম্মত হওয়া চাই। শোভনের চোখে নামে তাই মহাকালের শীতলতা।
তাদের দৃষ্টি এখন পরস্পরের প্রতি নিক্ষিপ্ত। চোখের মনির গভীরে কী যেন দেখার চেষ্টায় রত দু’জনে। দু’জনে এক বিশাল মরুভূমির মধ্যে দাঁড়িয়ে সবেগে পা ঠুকে চলেছে মাটিতে। দু’জনের ঠোঁট এখন কম্পমান, ঈষৎ প্রসারিত।
পোকায় খাওয়া দাঁত বের করে ক্রুঢ় হাসিতে মেতে ওঠে তারা। তারপর হাতে উদ্যত ছুরি, চোখে আমৃত্যু হিংস্রতা নিয়ে একটি পূর্ণ বৃত্ত রচনা করে পরস্পর মুখোমুখি পাঁক খেতে থাকে তারা,
পাঁক খেতে থাকে,
পাঁক খেতে থাকে,
পাঁক খেতে থাকে…..
দুই.
কতক্ষণ হয়ে গ্যালো জানে না সে। তলপেট প্রজাপতির মতো ফুরফুরে হালকা। এখন অন্ধকারে প্রায় সবকিছু ঠিক ঠাক দেখতে পায় যুবক। ঘরে এসে জানালার পাশে দাঁড়ায় সে। বাতাসের ঝাঁপটায় এলোমেলো হয় চুল, গন্ধ শোঁকে সে বাতাসের। হ্যাঁ মানুষের গন্ধ, তাতে মিশে আছে কোহিনূর কোম্পানীর চিম্নীর কালো ধোঁয়া, রিকশার প্যাডেলের ক্যাঁচক্যাঁচ ধ্বনি, ইটভাঙ্গা মাতারির একটানা খট্ খট্ হাতুরীর বারি আর গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর নারী শ্রমিকের সেলাইয়ের শব্দ। মিশে আছে গ্রাম থেকে উঠে আসা কৃষকের প্রতিবাদ মিছিল, বাসে ঝোলা কেরাণীর চিন্তিত ভ্রুকুটি, ছাত্রদের উত্তপ্ত ঘোঁটপাকা জমায়েত, প্রেমিক যুগলের সশব্দ চুম্বন আর পড়–য়া বুদ্ধিজীবির চাপা খসখসে সেমিনার বক্তৃতা।
জোরে হাততালি দিয়ে ওঠে যুবক। শব্দ হয় তাতে। কী এক দ্যোতনা, আনন্দে আপ্লুত হয় মন। এখনও শব্দ ওঠে শূণ্যতায়! এখনও অন্ধকারে বেঁচে থাকা যায়। এখনও বেঁচে আছে সে। বেঁচে থাকায় কী সুখ মৃত মানুষেরা জানে না কেবল।
সেই বুড়োটা কি এখনও জীবিত? সে-ও কি শুনতে পায় মানুষের কোলাহল ধ্বনি? এখনও বলবীর্য খুব বুড়োটা? চেতনার শেষ স্পর্শ দিয়ে সে অনুভব করে বৃদ্ধের মুখ, তার চোখ, তার ক্ষীণ কটিদেশ।
চিরায়ত চিনচিনে এক ক্ষুধা অনুভূত হয়ে পেটে। বিষাক্ত পাইথন যেন। গোপন ঝাঁপি থেকে উদ্ধত ফণা তুলে বেরিয়ে আসে যখন তখন। কিভাবে সে অগ্রাহ্য করবে ব্যাপারটা? তবু বিছানায় জোর করে সে এলিয়ে দেয় গা। অন্ধকারে জেগে ওঠে তার বিবর্ন অবয়ব। পেশীগুলো টান্টান্ ধনুকের ছিলা। এ যেন স্থবিরতা নয় কোন, এযেন মহাকাশের ক্ষয়হীন এক ফসিল; পৃথিবীর মানচিত্রে মুখ থুব্ড়ে পড়ে থাকা এক দেশজ ঢং।
এরই মাঝে রাতের মুখরতা কমে আসে। হয়তো ভোর হ’লো-আধ বোঁজা চোখে মনে হয় তার। দেহের প্রতিটি বাঁকে জমে থাকা শেষ অন্ধকার পরাজিত হয় সকালের আলোর তীব্রতায়। এরি মাঝে ঘুম নামে যুবকের চোখে। বাইরে স্ফুর্ত কোলাহল- মানুষের। ঘুম থেকে জেগে সে-ও মিশে যাবে সেই কালস্রোতে।

Views All Time
Views All Time
196
Views Today
Views Today
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top