দেশ

কর্মকর্তা ‘ঘুমিয়ে’, রাতের মেঘনায় ইলিশ উৎসব!

ভোলার চরফ্যাশনের মেঘনায় দিনে আড়ালে আবডালে আর রাতে উৎসবমুখর পরিবেশে মা ইলিশ শিকার করা হচ্ছে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নির্ধারিত হারে ঘুষ পরিশোধ করে রাতে মাছ শিকারের ‘অনুমতি’ নিয়েছেন বলে জেলেরা জানিয়েছেন। রাতের শেষভাগে স্বল্প সময়ের জন্য মেঘনা পাড়ে জমে উঠা মাছঘাটগুলোতে হানা দিয়ে পুলিশের লোকজনও জেলেদের শিকার করা মাছে ভাগ বসাচ্ছে।

গত রবিবার দিবাগত রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত মেঘনার বেতুয়া, নতুন স্লুইসঘাট, সেন্টারের ঘাট এবং ডাক্তারের ঘাট এলাকায় সরেজমিনে অনুসন্ধানে মা ইলিশ শিকার এবং বেচা-বিক্রির উৎসব দেখা গেছে। যদিও এসময় মেঘনা নদী বা সংলগ্ন ঘাটগুলোতে প্রশাসনের কোনো লোকজনের উপস্থিতি দেখা যায়নি।

জানা যায়, চরফ্যাশনে প্রশাসনের কর্মকর্তারা মেঘনার ঘাটেঘাটে দালালদের মাধ্যমে জেলেদের কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে নিষিদ্ধ সময়ে মাছ শিকারের ‘অনুমতি’ দিয়েছে। এজন্য রাতের মেঘনায় মা ইলিশ শিকারের উৎসব চলছে। এমন খবরের ভিত্তিতে রবিবার রাত ১০টার পর স্থানীয় সংবাদকর্মীদের একটি দল মেঘনার বেতুয়া, নতুন স্লুইস, সেন্টারের ঘাট এবং ডাক্তারের ঘাট এলাকায় অবস্থান নেয়। মধ্যরাতে জাল ফেলার সময় হলে জেলেরা জাল নৌকা নিয়ে মেঘনায় নেমে যায়। রাত ৩টার পর থেকে জেলেরা নৌকাভর্তি মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরতে থাকে। কিন্তু সংবাদকর্মীদের ‘অপ্রত্যাশিত’ উপস্থিতির খবর পেয়ে জেলেরা ঘাট ছেড়ে দ্রুত অন্যত্র চলে যেতে থাকে।

তাৎক্ষণিক বিষয়টি অবহিত করার জন্য চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আমীনুল ইসলাম, কোস্টগার্ডের কন্টিনজেন্ট কমান্ডার এবং উপজেলা মত্স্যসম্পদ কর্মকর্তা পলাশ হালদারকে ফোন দেওয়া হয়। কিন্ত তারা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেননি। ফলে সংবাদকর্মীরা ভোলা জেলা প্রশাসক মো. সেলিম উদ্দিনকে বিষয়টি অবহিত করেন। জেলা প্রশাসক উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে বিষয়টি অবহিত করতে বলেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেঘনায় অভিযানিক দল মোতায়েন আছে বলে সংবাদকর্মীদের জানান। কিন্তু এমন কোনো দল মেঘনায় নেই বলে সংবাদকর্মীদের তরফ থেকে জানানোর পর নির্বাহী অফিসার বিষয়টি দেখার আশ্বাস দেন। রাত ৪টা পর্যন্ত প্রশাসনের কোনো পর্যায়ের কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে মেঘনায় দেখা যায়নি। রাত ৩টার কিছু পরে নুতন স্লুইসঘাটে একটি ইঞ্জিনচালিত ট্রলার মাছ নিয়ে ঘাটে আসে। কিন্তু সংবাদকর্মীদের দেখে ট্রলার মালিক বাকের, মাঝি জামালসহ ৬ জেলে ট্রলার এবং জাল-মাছ ফেলে পালিয়ে যায়। একই সময় ডাক্তারের ঘাটে মাছ নিয়ে আসে মান্নান মাঝির ট্রলার।

সংবাদকর্মীরা মাছসহ মাঝি মান্নানকে ঘিরে ধরলে শাহাবুদ্দিন ছায়েদসহ অপর ২ জেলে পালিয়ে যায়। সংবাদকর্মীদের উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়লে ঘাটে ফেরার জন্য অপেক্ষমাণ ট্রলারগুলোকে মাঝ নদীতে নোঙ্গর ফেলে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। দু’ ঘাটে আটক দু’টি ট্রলার এবং জাল-মাছসহ নদীতে ভাসমান ট্রলারগুলো জব্দ করতে প্রশাসনের লোকজনের কোনো সহযোগিতা মেলেনি। তবে রাত ৪টার পর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নির্দেশে একজন সহকারী সাব ইন্সপেক্টর এবং একজন আনসার সদস্য নতুন স্লুইসঘাটে পৌঁছে জেলেদের ফেলে যাওয়া ট্রলার জাল এবং মাছ জব্দ করেন।

রাতভর সংবাদকর্মীদের অনুসন্ধানকালে তালতলা ঘাটের জেলে আব্দুল মান্নান জানান, ঘাটের দালাল কুদ্দুস এবং ছায়েদ প্রশাসনকে ম্যানেজ করার জন্য জেলেদের থেকে টাকা নিয়েছে। যেসব জেলেরা টাকা দিয়েছে রাতে তারাই মেঘনায় মাছ ধরতে পারছে। ডাক্তার ঘাটের জেলে নূর হোসেন জানান-রাতের মেঘনায় শিকার করা মাছের একটা অংশ প্রতি রাতে দালালদের থেকে পুলিশ বুঝে নিচ্ছে। পুলিশের অংশ বাদ দিয়ে বাকি সব মাছ দালাল কুদ্দুস এবং ছায়েদ ৫ হাজার টাকা পোন (১ পোন=৮০টি) দরে জেলেদের থেকে কিনে নেয়। পরে এই মাছ তারা (দালাল) সাড়ে ৭ হাজার টাকা পোন দরে বাছাইকৃত ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছে। ক্রেতাদের একটা অংশ চরফ্যাশন বাজারের মাছ ব্যবসায়ী। যারা এসব মাছ বাড়িতে বাড়িতে ফেরি করে বিক্রি করছে।

জেলেদের অভিযোগ এবং রাতে মেঘনায় মা ইলিশ শিকারের উত্সব প্রসঙ্গে সিনিয়র উপজেলা মত্স্য কর্মকর্তা পলাশ হালদার জানান-রবিবার রাতে মত্স্য বিভাগের একটি দল তেঁতুলিয়া নদীতে অভিযানে ছিল। মেঘনায় অভিযানের কথা ছিল কোস্টগার্ডের। কিন্তু কোস্টগার্ডের একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন—ওই রাতে মেঘনায় কোস্টগার্ডের অভিযানে থাকার কথা সঠিক নয়। কোস্টগার্ড ওই রাতে তেঁতুলিয়া নদীর মানিকার ঠোডা এলাকায় অভিযানে ছিল।

জেলেদের শিকার করা মাছে পুলিশের ভাগ বসানোর বিষয় সম্পর্কে চরফ্যাশন থানার অফিসার ইনচার্জ ম. এনামুল হক জানান—ঘাট থেকে পুলিশের মাছ সংগ্রহের বিষয়টি তার জানা নেই। পুলিশের কোনো লোক এমন অপকর্ম করলে তার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যকে বহন করতে হবে।

এদিকে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দেশের আরো বিভিন্ন স্থান থেকে মা ইলিশ ধরার খবর পাওয়া গেছে।

সদরপুর (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, সদরপুর উপজেলার পদ্মায় মা ইলিশ ধরা অব্যাহত রয়েছে। জরুরিভিত্তিতে সদরপুরের পদ্মায় কোষ্টগার্ড নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

মুলাদী (বরিশাল) সংবাদদাতা মুলাদীতে মা ইলিশ নিধন চলছে অবাধে। মত্স্য অফিস ও প্রশাসন অভিযান চালিয়ে সোমবার পর্যন্ত উপজেলায় ৬৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে জেল জরিমানা দিয়েও থামাতে পারছে না অবাধে ইলিশ নিধন।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী সংবাদদাতা জানান, গোয়ালন্দ উপজেলার পদ্মা নদীতে জেলেরা ইলিশ শিকার অব্যাহত রেখেছেন। এসব ইলিশ গ্রামগঞ্জে অপেক্ষাকৃত কম দামে বিক্রি হচ্ছে। অল্প দামে কিনে অনেকে মজুদ করছে। ­

-চরফ্যাশন (ভোলা) প্রতিনিধি

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top