ফিচার

চলমান অশরীরী বেতালের আশি বছর পূর্তি

নাভিদ ইমতিয়াজ
এই বছর বেতাল কমিকস, ইংরেজিতে “ফ্যান্টম”, এর আশি বছর পূর্তি হলো। বাংলাদেশে ৭০, ৮০ বা ৯০ এর দশকে যারা বড় হয়েছেন তারা প্রায় সবাই পড়েছেন ভারতের “ইন্দ্রজাল কমিকস” এর প্রকাশিত বেতাল। ১৯৩৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারিতে বেতাল প্রথম প্রকাশিত হয়। বেতালের সৃষ্টি করেন লি ফক। এর আগে তিনি “ম্যান্ড্রেক দা ম্যাজিশিয়ান” কমিক রচনা করেছিলেন, যা ছিলো সে সময়ের সবচেয়ে বিখ্যাত কমিকস।
প্রথম প্রকাশের পর পরই প্রচুর সাফল্য অর্জন করে বেতাল। ১৯৬৬ সালে বেতালের সাফল্যের শীর্ষে পৃথিবীর ৫৮৩টি সংবাদপত্রে প্রকাশ করা হত বেতালের কমিক স্ট্রিপ। প্রতিদিন বেতাল পড়তেন সে সময়ের ১০ কোটি মানুষ। এটা এমন একটি রেকর্ড যা সম্ভবত কখনও ভাঙ্গা হবে না।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বেতালের উপর কাজ করে গেছেন ফক। এমনকি ১৯৯৯ সালে যখন তিনি হাসপাতালে ছিলেন, তখনও বেতাল লিখেছেন। অক্সিজেন মাস্ক খুলে স্ত্রী এলিজাবেথকে “টেরর অফ দি অপেরা” এবং “দা কিডন্যাপারস” নামক গল্প তিনি বলে গিয়েছেন, যা তার স্ত্রী লিখেছেন ফকের অসুস্থতার জন্য। এর কিছু দিন পরেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ফকের মৃত্যুর পর, এমনকি তার জীবদ্দশায়ও আরো অনেকে বেতাল লিখেছেন। বেতালের বিভিন্ন প্রকাশে কাজ করেছেন বিভিন্ন চিত্রকর। বেতালের লাইসেন্সিং এর অধিকার এখন কিং ফিচার সিন্ডিকেটের কাছে, এবং তারা এখনও দৈনিক কমিকস প্রকাশ করে যাচ্ছেন। এই দৈনিক সংবাদপত্রে প্রকাশ্য কমিকগুলো লিখেন টনি ডিপল, এবং চিত্রের উপর কাজ করেন পল রায়ান এবং টেরি বিটি। বেতাল বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় চলমান কমিক স্ট্রিপ।
বেতালের কমিকস প্রথমবারের মত একসাথে সংগৃহীত করে উইটম্যান পাবলিশিং কোম্পানি। তারা ১৯৩৬ সালে তাদের “বিগ লিটল বুকস” সিরিজের একটি বইয়ে সর্বপ্রথম বেতাল সংগৃহীত করে। তাদের শেষ বেতাল সংগ্রহ প্রকাশ হয় ১৯৪৭ সালে।
বেতালের নিজস্ব কমিকস বই প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে। গোল্ড কি কমিকস বেতালের মোট ১৭টি ইস্যু প্রকাশ করে। কিং কমিকস পরবর্তীতে বেতালের লাইসেন্স সংগ্রহ করে এবং গত প্রকাশকের নাম্বারিং রেখে ১৮ নম্বর ইস্যু থেকে প্রকাশ করেন। এবার বেতাল ২৮ নম্বর ইস্যু পর্যন্ত প্রকাশ হয়। ১৯৬৯ সালে চার্লটন কমিকস বেতালের কমিক বই প্রকাশ করার লাইসেন্স সংগ্রহ করে এবং ২৯ নম্বর ইস্যু থেকে প্রকাশ করা শুরু করে। তারা বেতালের কমিকস ৭৯ নম্বর ইস্যু পর্যন্ত প্রকাশ করেন। এই তিন প্রকাশনীর ৭৯টি ইস্যুকে একত্রে বেতালের প্রথম ভলিউম হিসেবে ধরা হয়। ১৯৮৭ সালে মারভেল কমিকস ডিফেন্ডারস অফ দি আর্থ টেলিভিশন সিরিজের উপর ভিত্তি করে একটি বেতাল মিনি সিরিজ প্রকাশ করে। এই চার ইস্যুর মিনি সিরিজটি লেখেন বিখ্যাত কমিকস লেখক এবং স্পাইডার ম্যান, আয়রন ম্যান ও অন্যান্য মারভেল কমিকস চরিত্রের ¯্রষ্ঠা স্ট্যান লি। ১৯৮৮ সালে ডিসি কমিকসও বেতাল নিয়ে একটি চার ইস্যুর মিনি সিরিজ প্রকাশ করে। পরবর্তীতে ডিসি একটি ১৩ ইস্যুর মাসিক সিরিজও প্রকাশ করে, যা শেষ হয় ১৯৯০ সালে। কিং ফিচার সিন্ডিকেটের সাথে লাইসেন্সিং সমস্যার কারনে সিরিজটি বাতিল করা হয়।
১৯৯৪ ও ১৯৯৫ সালে মারভেল আবারও বেতালেরকমিকস প্রকাশ করার লাইসেন্স পায়। তারা বেতালের উপর একটি ৩ ইস্যু লম্বা মিনি সিরিজ প্রকাশ করে। এবার কাহিনী রচনা করা হয় ২২তম বেতালকে নিয়ে, অদূর ভবিষ্যৎ এবং সায়েন্স ফিকশনের মতো প্রযুক্তি নিয়ে। ফ্যান্টম ২০৪০ টেলিভিশন সিরিজ নিয়েও একটি মিনি সিরিজ প্রকাশ করে মারভেল, ১৯৯৫ সালে। সিরিজটি লেখেন স্পাইডার ম্যানের ¯্রষ্ঠা (স্ট্যান লি এর সাথে), স্টিভ ডিটকো।
২০০২ সালে মুনস্টোন বুকস বেতাল নিয়ে নতুন গ্রাফিক নভেল প্রকাশ করা শুরু করে। ২০০২ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে তারা ৫টি গ্রাফিক নভেল প্রকাশ করে। ডিসেম্বর ২০০৩ থেকে তারা বেতাল নিয়ে নতুন কমিক সিরিজ শুরু করে, যা শেষ হয় ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। এর মধ্যে ২৬টি ইস্যু প্রকাশ করেন তারা। এর পরে “দা ফ্যান্টমঃ দা ঘোস্ট হু ওয়াকস” নামে আরেকটি নতুন সিরিজ শুরু করে মুনস্টোন। ১২ ইস্যুর পর ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে শেষ হয় সিরিজটি। এরপর ডাইনামাইট এন্টারটেইনমেন্ট বেতালের লাইসেন্স সংগ্রহ করে এবং “দা লাস্ট ফ্যান্টম” নামের সিরিজ প্রকাশ করা শুরু করে ২০১০ থেকে। সিরিজটি সমাপ্ত হয় ২০১২ সালে।
২০১২ সালে সিরিজটি শেষ হবার পরে ডাইনামাইট এন্টারটেইনমেন্ট আরো তিনটি মিনি সিরিজ প্রকাশ করে। সিরিজ তিনটি হলো “কিংস ওয়াচ”, “কিং দা ফ্যান্টম” এবং “কিংস কোয়েস্ট”। এর মধ্যে “কিংস ওয়াচ” ও “কিংস কোয়েস্ট’ সিরিজ দুটিতে বেতাল ছাড়াও ছিল ম্যান্ড্রেক দা ম্যাজিশিয়ান, ফ্ল্যাশ গর্ডন এবং প্রিন্স ভ্যালিয়েন্টের মতো বিখ্যাত চরিত্র।
অস্ট্রেলিয়ার ফ্রিউ পাবলিকেশন বেতালের সবকয়টি কমিক স্ট্রিপ একসাথে সংগৃহীত করে প্রকাশ করেছে। তারা এগুলো প্রকাশ করা শুরু করেছেন ১৯৪৮ সাল থেকে, এবং এখনও প্রকাশ করে যাচ্ছেন। তারা বেতাল নিয়ে নতুন লেখাও প্রকাশ করেন। এ পর্যন্ত ফ্রিউ পাবলিকেশন ১৭০০ এর বেশি বেতাল কমিকস ও অন্যান্য বেতাল সম্পর্কিত বই প্রকাশ করেছে এবং এখনও প্রকাশ করে যাচ্ছে।
ভারতে বেতাল কমিকস প্রকাশের অনেক লম্বা ইতিহাস আছে। ৪০ এর দশকে বেতাল প্রথম ভারতে প্রকাশিত হয় “দা ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অফ ইন্ডিয়া” নামক একটি ম্যাগাজিনে। ১৯৬৪ সাল থেকে ইন্দ্রজাল কমিকস বেতাল প্রকাশ করা শুরু করে ইংরেজি ছাড়াও বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায়। ১৯৯০ সালে তাদের প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেলে ডায়মন্ড কমিকস বেতাল প্রকাশনা শুরু করে ডাইজেস্ট ফরম্যাটে। ইন্দ্রজালের মতই ডায়মন্ড কমিকসও বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় প্রকাশ করে বেতালের কমিকস। ২০০০ সালে তারাও বেতাল প্রকাশ করা বন্ধ করে দিলে এগমন্ট ইম্যাজিনেশন ইন্ডিয়া নামক একটি প্রকাশনা বেতালের ভারতীয় লাইসেন্স সংগ্রহ করে। ২০০২ সাল পর্যন্ত ইংরেজিতে বেতাল প্রকাশ করে তাদের প্রকাশনাও বন্ধ হয়ে পড়ে।
বেতাল এমন একটি কমিক যা বিশ্বের ছেলে বুড়ো যে কাউকে বললেই চিনবে। ইতালিতে বেতাল ল’উয়োমো মাস্কেরাতো (মুখোশপরা লোক), ইংরেজভাষী দেশগুলোতে ফ্যান্টম, তুরস্কে কিজিল্মাস্ক (লাল মুখোশ) নামে পরিচিত বেতাল সবগুলো দেশেই কিংবদন্তি।
পাপুয়া নিউ গিনিতে বেতালের মুখচ্ছবি ব্যাবহার করা হয় ঢালের উপর, ঢালকে মজবুত করার জন্য। বেতালের এ রকম স্থান সব দেশের মানুষের হৃদয়ে।

Views All Time
Views All Time
538
Views Today
Views Today
4
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top