অর্থনীতি

চামড়ার বাজারে ধস

চলতি বাজার দরের চেয়ে কম দর নির্ধারণ, ঈদের আগে চামড়া কিনতে ট্যানারি থেকে অগ্রিম অর্থ না দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে। ১ লাখ টাকার গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র ৮শ’ থেকে ১ হাজার টাকায়। এমনকি ৪শ’ থেকে ৫শ’ টাকায়ও গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে। এদিকে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে চামড়ার দাম কম হওয়ায় পাচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

তবে গতকাল সোমবার রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি দাম দিয়ে কাঁচা চামড়া কেনার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ)। অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদ এ ঘোষণা দিয়ে বলেন, আগামী সপ্তাহ থেকে ট্যানারি মালিকরা চামড়া কেনা শুরু করবেন।

শাহীন আহমেদ বলেন, এবার ব্যাংকগুলো চাহিদা অনুযায়ী কাঁচা চামড়া কিনতে ঋণ দেয়নি। তাই নগদ টাকার সংকট থাকায় চামড়া কিনতে অগ্রিম অর্থ দিতে পারিনি। এ কারণে পাইকারি ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা সুবিধামতো বিভিন্ন দরে চামড়া কিনেছেন। তবে এবার চামড়ার দাম কম হওয়ায় কোরবানির পশুর চামড়া পাচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চামড়া যাতে পাচার না হয়, সেজন্য ব্যবস্থা নিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা চেয়েছেন টানারি ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্ক্রিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব টিপু সুলতান কোরবানির চামড়া পাচার হচ্ছে বলে অভিযোগ করে বলেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে কোটি কোটি টাকা পাওনা হলেও ট্যানারিগুলো সাভারে স্থানান্তরসহ নানা অজুহাতে ট্যানারি মালিকরা আমাদের টাকা পরিশোধ করছেন না। এ কারণে তারাও খুচরা ব্যবসায়ীদের টাকা দিতে পারছেন না। ফলে এবার লালবাগের পোস্তায় কাঁচা চামড়া বাজারে একশ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে কম চামড়া এসেছে।

উল্লেখ্য, এবার সরকারিভাবে কোরবানির গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ঢাকায় ৫০ থেকে ৫৫ টাকা ও ঢাকার বাইরে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া সারাদেশে খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২০ থেকে ২২ টাকা ও বকরির চামড়া ১৫ থেকে ১৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। *চামড়া ক্রেতা ও বিক্রেতারা জানান, ঢাকায় ঈদের দিন শনিবার মাঝারি গরুর চামড়া ৭/৮শ’ ও বড় গরুর চামড়া ১ হাজার থেকে ১২’শ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

বগুড়ায় কোরবানির চামড়ার বাজারে ধস

বগুড়া অফিস থেকে জি এম সজল জানান, সরকারের বেঁধে দেওয়া দামের কারণে বগুড়ায় মাঠ পর্যায়ে গত বছরের চেয়ে শতকরা প্রায় ৪০ শতাংশ কমমূল্যে কেনাবেচা হয়েছে কোরবানির চামড়া। ট্যানারি মালিক ও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট এবার মূল্য ধসের মূল কারণ। জেলা চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতি বাজার ধসের জন্য ট্যানারি স্থানান্তর এবং ঈদের আগে পূর্বের বকেয়া টাকা ট্যানারি থেকে না পাওয়ায় নগদ টাকার প্রবাহ কম থাকা এবং এবং চলতি বাজার দরের চেয়ে অনেক কম দর নির্ধারণ করে দেওয়াকে দায়ী করেছেন।

বগুড়ায় চামড়ার বাজারখ্যাত বাদুড়তলা, চকসুত্রাপুর ও চকযাদু রোড ঘুরে দেখা গেছে, ভালো মানের বড় আকৃতির গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকায়, মাঝারি আকৃতির এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। আবার নিম্নমানের গরুর চামড়ার চাহিদা না থাকায় বিক্রি হয়েছে ৩শ’ থেকে মাত্র ৪ শ’ টাকায় । এছাড়া ছাগলের চামড়া আকৃতি ভেদে প্রতিটি ৫০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

শহরের চামড়া ব্যবসায়ী নূর ইসলাম, আপেল, পুটু মিয়া, শাহিনূর, বিপ্লব জানান, প্রতিবছরই কোরবানির ঈদে বগুড়ার চামড়া ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ফড়িয়া ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও চামড়া কিনে থাকেন। জেলা থেকে প্রতিবছর কোরবানির প্রায় ২ লাখ গরু এবং ১ লাখ ছাগলের চামড়া ঢাকার ট্যানারিগুলোতে সরবরাহ করা হতো । লাভের আশায় ধার দেনা করে এবারও কোরবানির চামড়া কেনেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ট্যানারি মালিক ও বড় ব্যবসায়ীরা ঈদের আগে সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে। স্বাভাবিক বাজার দরের চেয়ে প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম অনেক কম নির্ধারণ করাই মূল্য ধসের প্রধান কারণ। জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির কোষাধক্ষ্য মুক্তার শেখ, নির্বাহী সদস্য রোকন, খোকন জানান, ঢাকায় ট্যানারি স্থানান্তর, জেলা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের টাকা ট্যানারি মালিকদের আটকে রাখা এবং লবণের বাজারে সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানোই এবার চামড়ার বাজার ধসের কারণ।

আড়াইহাজারে চামড়ার বাজারে ধস

গোপালদী বাজার (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা মাসুম বিল্লাহ জানান, আড়াইহাজারে চামড়া বাজারে ধস নেমেছে। সরকার চামড়ার দর নির্ধারণ করে দেওয়ায় দাম ছিল কম। আর যে সকল মৌসুমী ব্যবসায়ী গ্রাম থেকে চামড়া কিনেছে তাদের মাথায় হাত পড়েছে।

নেত্রকোনায় সিন্ডিকেটের কবলে কোরবানির চামড়ার বাজার

নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, নেত্রকোনায় কোরবানির চামড়া বিক্রয় করতে গিয়ে বিক্রেতারা সিন্ডিকেটের কাছে হার মেনেছেন। চামড়া ব্যবসায়ীরা কম মূল্যে চামড়া বিক্রয় করতে তাদের বাধ্য করেছেন।

সিরাজগঞ্জে পানির দামে কোরবানির চামড়া বিক্রি

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, এ বছর সিরাজগঞ্জে কোরবানির চামড়া পানির দামে বিক্রি হয়েছে। জানা গেছে, ১ লাখ টাকা মূল্যের গরুর চামড়া ১ হাজার থেকে ১২শ টাকা, ৬০/৭০ হাজার টাকার গরুর চামড়া ৮শ থেকে ১ হাজার টাকা এবং এর নিচের দামের গরুর চামড়া ৫শ থেকে ৭শ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

বাজিতপুরে পানির দরে বিক্রি হয়েছে পশুর চামড়া

বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা আ.কা.মো. গোলাম মোস্তফা জানান, বাজিতপুরে পানির দরে বিক্রি হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া। ১/২ জন বেপারী চামড়া কিনতে এসেছে। আবার অনেক বাড়িতে ক্রেতা আসেইনি।

পথে বসেছে বরিশালের মৌসুমী ব্যবসায়ীরা

বরিশাল অফিস থেকে শাহীন হাফিজ জানান, সরকার কর্তৃক কম মূল্য নির্ধারণ, লবণের দাম বৃদ্ধি ও শ্রমিকের মজুরি বেশি হওয়ায় কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন এখানকার চামড়া ব্যবসায়ীরা। পাইকারি ব্যবসায়ীরা নানা সংকটে চামড়া কেনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলায় বিপুল টাকা লোকসান দিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীদের।

চামড়া ভারতে পাচার হওয়ার আশঙ্কা

খুলনা অফিস থেকে এনামুল হক জানান, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তের চোরা পথ দিয়ে সিংহভাগ চামড়া ভারতে পাচার হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন ব্যবসায়ীরা। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, ভারতে চামড়া পাচারের আশঙ্কা নেই।

খুলনা মহানগরীর শেখপাড়া চামড়াপট্টির ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি বছর ঈদের আগে ট্যানারি থেকে ব্যবসায়ীদের বকেয়া টাকা পরিশোধ করা হত। কিন্তু এবার শুরু থেকেই ট্যানারি মালিকরা তাদের সাথে কোনো যোগাযোগ করেনি। তাদের বকেয়া টাকাও পরিশোধ করা হয়নি। ফলে এবার অনেক ব্যবসায়ী চাহিদা অনুযায়ী চামড়া কিনতে পারেননি। যার কারণে বাজার দখল করে নিয়েছে ফড়িয়া ও মৌসুমী ব্যবসায়িরা।

চট্টগ্রামে কপাল পুড়েছে গরিব মানুষের

মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন, চট্টগ্রাম অফিস থেকে জানান, চট্টগ্রামে কোরবানির চামড়া নিয়ে ফড়িয়াদের কারসাজিতে কপাল পুড়েছে চামড়ার টাকার সুবিধাভোগী গরিব দুস্থ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের। ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি চামড়া বিক্রি করতে পারেনি কোরবানিদাতারা। অতীতে কোরবানির চামড়া নিয়ে এ ধরনের কারসাজি হয়নি। ফড়িয়ারা সস্তায় চামড়া কিনে নগরী ও আশপাশের উপজেলাগুলোতে লবণ দিয়ে মজুদ করে রেখেছে। চট্টগ্রামের আড়তদারদের কাছে এখনো অর্ধেক চামড়া সংগ্রহ হয়নি। তাঁবু দিয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় চামড়া মজুদ করায় পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।

নগরীর ফরিদারপাড়া, ডবলমুরিং, পাহাড়তলী, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ, পশ্চিম পটিয়া এলাকায় বিভিন্ন স্থানে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনে মজুদ করে রেখেছে। তারা তাঁবু টাঙিয়ে ও কাঁচা ঘরের মধ্যে এসব চামড়া লবণ দিয়ে মজুদ করেছে। খোলা জায়গা ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কাঁচা চামড়া মজুদ করে রাখায় আশপাশে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে।

-নিজস্ব প্রতিবেদক

Views All Time
Views All Time
26
Views Today
Views Today
1
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top