ঢাকা ,  শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  ৭ আশ্বিন ১৪২৪

মতামত

“ছবি আঁকার জন্যে এখন ইনটালেকচুয়াল গ্রোথ সবচে জরুরী”

বর্তমান পাশ্চত্য বিশ্বে হাতে গোনা যে ক’জন বাংলাদেশের চিত্রকলার এবং আরো ব্যাপক অর্থে বললে বাঙালি চিত্রকলার বা প্রাচ্য চিত্রকলার প্রতিনিধিত্ব করছেন তাদের একজন মনিরুল ইসলাম। শুধু যদি বাংলাদেশের চিত্রকলার প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন আসে তবে তিনি আছেন নিশ্চিতই পুরোভাগের একেবারের প্রথম অবস্থানে। তিনি তেমনই একজন ঈর্ষণীয় শিল্পী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রকলাবিদ অ্যানতোনিও তাপিস, কাপা প্রমুখের সঙ্গে পাশ্চত্য বিশ্বযার যৌথ প্রদর্শনীর আয়োজন করে থাকে।
ঢাকার আর্ট কলেজে তিন বছর শিক্ষকতার পর স্কলারশীপে মনিরুল ইসলাম স্পেনের মাদ্রিদে যান। সেই থেকে তিনি মাদ্রিদেই অবস্থান করেন দীর্ঘ সময়। গত কয়েক বছর ধরে ঢাকার ধানমন্ডিতে থাকছেন চাঁদপুরের এই শিল্পী। শিক্ষক থাকাকালীন অবস্থায় এ কথা চালু হয়ে গিয়েছিল যে, মনিরুল ইসলাম জলরঙে খুবই সিদ্ধহস্ত। জলরঙ ছাড়া তিনি তেলরঙ, প্যাষ্টেল, চাইনিজ ইংক, কোলাজ, পেপার কাটিং ইত্যাদি বিভিন্ন গনমাধ্যমে কৃত্বিতের সঙ্গে করেছেন। এখন মনিরুল ইসলাম কাজ করছেন মিশ্র মাধ্যম, এচিং-এ। সমসাময়িক চিত্রকলাবিদের মধ্যে পছন্দের তালিকায় রয়েছেন মিহরা, অ্যানতোনিও তাপিস, জেসপার জন, রোসেল বার্গ, মানলো মীয়ারেস, এনগ্রেকো ভেলেসকেস, গ্যায়া, মকবুল ফিদা হুসেন, গনেশ পাইন প্রমুখ। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের নিউ ফিবারেশন ঘরানার চিত্রকর্মগুলোও তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। বাংলাদেশের প্রয়াত জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান ছাড়াও গোলাম কিবরিয়া, আবদুস সাত্তার মাহমুদ, রফিকুন নবী প্রমুখ তার প্রিয় শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন।মনিরুল ইসলামের সঙ্গে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে ঘনিষ্ঠ কথা হয়। তারই নির্বাচিত অংশ এখানে সাক্ষাৎকার আকারে প্রকাশ করা হলো। এই সাক্ষাৎকার থেকে সমকালীন শিল্পকলার বিভিন্ন প্রবনতা, বিশেষ করে মনিরুল ইসলামের চিন্তা ভাবনার সঙ্গে পাঠকের খানিকটা যোগাযোগ ঘটবে বলেই আমরা আশা করি।সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিপুল রায়হান
monirul_islam
জীবন থেকে নেয়া: শুরুটা এভাবেই করছি যে, আপনি কেন ছবি আঁকেন?
মনিরুল ইসলাম: এই প্রশ্নে পৃথিবীর সর্বত্র আমরা সব শিল্পীরাই এক কথাই বলি যে, ভালোলাগে। খুব ছেলেবেলাতেই আমি ছবি আঁকার একটি ‘ইচ্ছা’ প্রবলভাবে নিজের ভেতর অনুভর করি এবং আঁকতে শুরু করি।
জীবন থেকে নেয়া: শুরুটা ছিল তাহলে ভাল লাগা থেকে।
মনিরুল ইসলাম: না, এখনো একি। বেসিক্যালি এখনো তা ভাললাগাই, তবে এই ভাললাগাটার ভেতর এখন অন্যরূপ এসেছে। যেমন আগে ছবি আঁকতাম যা দেখে ভাল লাগত তাই। রবীন্দ্রনাথ, মধুসুদনসহ বিভিন্ন কবির পোট্রেট, তারপর আর্ট কলেজে থাকাকালীন ল্যান্ডস্কেপ, স্টিল লাইফ, বিভিন্ন সাধারণ জিনিষ আমরা যা চোখে দেখি। এসব করতাম একাডেমিক কাজ হিসেবে। এখন ঐ কাজটাই একটু ভিন্নভাবে করি। ভেতরটা, বাইরের মানুষটা না দেখে তার ভেতরটা দেখার চেষ্টা করি। এই জন্যে প্রোট্রেটে মুখটা না এঁকে ভেতরটা ঠিক ধরতে চেষ্টা করি। ফলে ছবি এ্যাবষ্টাকট-এর দিকে টার্ন নিয়েছে।
জীবন থেকে নেয়া: সাম্প্রতিক সময়ে আপনি তো বিমূর্ত ধারায় কাজ করছেন। বিমূর্ততার প্রতি আপনার আগ্রহের কারণ।
মনিরুল ইসলাম: শিল্পীরা একটা পর্যায়ে এসে যায় যখন কোন কোন শিল্পীর মধ্যে, সবার কথা বলছি না, কোন একটা এ্যাবসট্রাক্ট আসবেই। বিশেষ করে এই বিংশ শতাব্দীতে আর্টিষ্টরা ভিন্নভাবে চিন্তা করছে। বিমূর্ততাকে অনেকে বলে প্লাষ্টিক আর্ট, এ্যাবসট্রাক্ট, কেউ কেউ বলে প্লাষ্টিক ইমেজ। এই বিমূর্ততা আমরা সাধারণত শুরু করি নেচার থেকেই। নেচার থরোলি কপি করি, তারপর এই কপি করতে করতে অনেকটা ছবি আঁকার পর যখন কোন শিল্পী কোনকিছু আর ইমেজ সেভাবে ধরতে বা ফোটাতে পারে না। সেটা যখন আর সম্ভব নয়, তখন আলটিমেটলি তার জন্যে এ্যাবসট্রাক্ট আসছে। এরপর আরেকটা সময় আসে যখন তার ভেতর আবার সুর-রিয়া-লিজম যা অনেকটা স্বপ্নের মতো, চলে আসে। এ ধরনের কাজ ইমেজও হতে পারে, আবার ইমেজ ছাড়াও।
জীবন থেকে নেয়া: এবাওে কনটেমপরারি আর্টের প্রবণতা প্রসঙ্গে আসতে চাই।
মনিরুল ইসলাম: প্রবণতা বলতে কি টেনডেনসি অব আর্ট বোঝাচ্ছে?
জীবন থেকে নেয়া: হ্যাঁ, কনটেমারারি আর্টের ক্ষেত্রে।
মনিরুল ইসলাম: কনটেমারারি আর্টে এখন প্রচুর কাজ হচ্ছে। অনেক ধরনের ছবি আঁকা হচ্ছে। এখনো ছবি আকাটা মূলত মিডিয়া অব এক্সাপ্রেশন। যে যেভাবে পারে। মিডিয়াটা কালিও হতে পারে পেন্সিলও হতে পারে, আবার মাটিও হতে পারে। অনেক ভাস্কর, স্কালপচার করছে। এরকম অনেক মিডিয়া। এই যে ইমেজ প্রবণতা যেটা আমরা বলি, অনেকে ছবি আঁকছে এইটিস্থ সেঞ্চুরীতে যেভাবে ছবি আঁকা হতো সেভাবে। অনেকেই ল্যান্ডস্কেপ আঁকছে। আসলে সবই আঁকা হচ্ছে। আবার আমরা বলি যে, আমরা একটি জাতি এবং এ কথা বলে আমরা শিল্পে জাতীয়তাবোধ খুঁজতে অতি মাত্রায় তৎপর হয়ে উঠি। কিন্তু আর্টের ক্ষেত্রে একটি বিষয় কিছুতেই উপেক্ষা করা যাবে না, আর তা হচ্ছে কমিউনিকেশন। অনেক সময় আমাদের বাংলাদেশের লোক, ধানক্ষেত বা নৌকা, এগুলো কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে, আমি যা মনে করি ছবির মধ্যে সবচে বেশী দরকার, কমউনিকেশন অব আর্ট সেটা বোধহয় সম্ভব নয়। অনেকেই এজন্যে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আমি কেন এসব বিষয় নিয়ে ছবি আঁকি না। এটা অবশ্য যারা বাংলাদেশে আছেন, তাঁরা বলবেনই এবং আমি মনে করি এটা ঠিক। কারণ আমরা চাই যে, বাংলাদেশের লোককহিনী বা ট্র্যাডিশনাল যা কিছু আছে তা বিভিন্ন শিল্পে বিষয় হয়ে ইন্টারন্যাশনাল কিমিউনিকেশন, তখন আর ঐ লোকগীতি, নকশীগাঁথা সেগুলো ওভাবে কমিউনিকেট করতে পারে না। ঠিক সার্বজনীন হয়ে উঠতে পারে না। এটার জন্যে একটা স্টাইল আছে ছবি আঁকার। যেমন এ্যাবস্ট্রাক্ট, সিম্বলিজম বা অন্যকিছু যেখানে একটা ছবি তার ইনফরমেশন বা কমিউনিকেশন আফ্রিকা, আমেরিকা বা বাংলাদেশে একই রকম। ভিন্ন ভিন্ন স্থানে একটি ছবির স্বাদ মোটামুটি একইভাবে গ্রহন করা সম্ভব। ঐ ছবি দেখে বলবে না, ওটাতো বাংলাদেশের ফোক আর্ট বা একটা পারিটি কুলার ইমেজ। আমি চাই ছবির একটা সার্বজনীন ইমেজ।
জীবন থেকে নেয়া: এখানে আমাদের দেশের কনটেমপরারি আর্ট প্রসঙ্গে আসা যায়।
মনিরুল ইসলাম: দুটো ব্যাপার। একটা কনটেমপরারি আর্ট, অরেকটা মাডার্ণ আর্ট। কনটেমপরারি আর্ট বলতে আমরা বাংলায় সমসাময়িক চিত্রকলা বুঝি। অন্যদিকে মডার্ন আর্টেও এখন একটা রূপ দাড়াচ্ছে। এখানে অনেক শিল্পীই একটা ভূল করে যে, মডার্ণ আর্ট বা এ্যাবসট্রাক্ট আর্ট না আকলে কনটেমপরারি আর্টিষ্ট বলা যাবে না। আসলে যে যেভাবে করতে পারে। সেটা ড্রয়িং বা ইমেজ বা অন্য কোনভাবেও হতে পারে। যদিও আমি এটার পক্ষপাতি তারপরও বলছি, সবাইকে যে মডার্ণ আর্ট করতে হবে নন অবজেকটিভ ইমেজে, আমি তা মনে করি না। অনেকেই ফিগারোটিভ করছেন এবং তারা তা করতেও পারেন। তারপর আবার যার যার স্টাইল আছে। আমাদের দেশের ইয়াং কনটেমপরারি গ্রুপের ভেতর ইন্টারন্যাশনাল এনাকিজম, যা অনেক সময় দরকার এবং ইনডিভিজুয়ালিজমের প্রভাব সুস্পস্ট। তেইশ বছর আগের অবস্থাটা কিন্তু এরকম ছিল না। বিভিন্ন দেশের সমসামিয়িক চিত্রকলা দেখার তেমন কোন সুযোগ ছিল না। এখন যেমন শিল্পকলা একাডেমীর এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের সসামায়িক কাজ দেখার সুযোগ আছে। তাছাড়াও ইয়ং কনটেমপরারি গ্রুপ এখন যে সব সুযোগ পাচ্ছে, যেমন বিভিন্ন আর্ট জর্নাল পড়তে পারছে কিংবা তারা যে ভাবে সুযোগ পাচ্ছে বাইরে যাবার, তেইশ বছর আগে আমরা তা পাইনে। এদিক থেকে দেখলে ইন্টারন্যাশনাল কমিউকেশন এখন আনেক কাছাকাছি চলে আসছে। এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী দেখে বোঝা যায়, অন্য দেশে কি টেনডেনসি-ও ছবি আকা হচ্ছে। জানা যায় জাপানীদেও সাম্প্রতিক কাজ কেমন বা আমেরিকানরা কি ধরনের ছবি আঁকছে। এগুলো দেখে একজন জানতে পাওে আর্ট এর টেনডেনসি কোনদিকে রান করছে, যা অত্যন্ত দরকার। করন, নো বডি ক্যান গো বিহাইন্ড ব্যাসাইড। এসব কারনে আমি খুবই আশাবাদী আমাদের কনটেমপরারি আর্টিষ্টদেও সম্পর্কে। এরপর আসছে মডার্ণ আর্ট।
জীবন থেকে নেয়া: এ জায়গায় কনটেমপরারি আর্ট এবং মডার্ন আর্টের মধ্যে পার্থক্যটা পরিস্কার হওয়া দরকার
মনিরুল ইসলাম: কনটেমপরারি বা সমকালীন চিত্রকলার মধ্যে আসতে পারে আমাদের সমকালীন এই এখন যারা বেঁচে আছেন এবং ছবি আঁকছেন, এসবের ভেতর ল্যান্ডস্কেপ আছে, ট্র্যাডিশনাল আর্ট আচ্ছে, তারপর আছে গ্রামের ছবি, গ্রামের কাহিনী নিয়ে একই সময়ে কেউ আবার এ্যাবসট্রাক্ট ছবিও আঁকছে। এগুলো অর্থাৎ বর্তমানে যে ধরনের ছবি আঁকা হচ্ছে আমাদের দেশে তা হলো কনটেমপরারি। অন্যদিকে মডার্ন আর্টের ভেতর আছে অনেক শাখা। যেমন রিয়ালিজম, এক্যুরিয়ালিজম, ফর্ম আর্ট, ট্রান্সপ্লান্ট আর্ট, এক্সটেনশন আর্ট, নিউ ওয়েভ এক্সপ্রেশন আর্ট। এগুলো মডার্ন আর্টের মধ্যে পড়ে। মর্ডান আর্টে ছবি আঁকার রীতিনীতি অনেক পাল্টে গেছে। যেমন আমরা আগে ভাবতাম রং তুলি ছাড়া ছবি হয় না। কিন্তু এখন মনে হয় রং তুলির দরকার নেই। কেউ কেউ তো এখন মাটি দিয়েও ছবি আঁকছে। কাগজ, ক্যানভাসের পাশাপাশি বোর্ডেও ছবি আঁকা হচ্ছে। তারপর স্পেস-এর ব্যবহার নিয়েও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ চলছে। তবে জলরং বা তেলরংসহ যেসব ট্র্যাডিশনাল মিডিয়া আছে, সেগুলোও সমান দরকার। এই শতাব্দীতে অনেক ধরনের উপাদান ছবিতে সংযুক্ত হয়েছে কখনো ইমেজ হিসেবে, কখনো মেটেরিয়াল হিসেবে। এগুলো আর্টিষ্ট-এর মধ্যে দি ওয়ে অব মডার্ন এক্সপ্রেশন।
জীবন থেকে নেয়া: অর্থাৎ ইনডিভিজুয়াল এক্সপ্রেশন কখনো মিডিয়ার লিমিটেশনে আবদ্ধ থাকে না।
মনিরুল ইসলাম: তাতো বটেই। মিডিয়া হলো ম্যাটার অব ইনডিভিজুয়াল এক্সপ্রেশন ইন ডিফারেন্ট ওয়ে। যার কোন জগৎ নেই। যে যেভাবে ব্যক্ত করতে পারে।
জীবন থেকে নেয়া: এত মিডিয়ার ভেতর আপনি ছাপচিত্রকে বেছে নিলেন কে?
মনিরুল ইসলাম: অনেকাটা আকষ্মিক ভাবেই ছাপচিত্রে কাজ করছে করতে শুরু করি। মাত্র নয় মাসের জন্য স্কলারশীপে স্পেনে যাওয়ার পর দেখলাম যে এই শতাব্দীতে ছাপচিত্রে একটা বিরাট বিপ্লব হয়ে গেছে। আসলে বেক্যালি আর্টে ছিল বিশেষ কতগুলো শ্রেণী। পাঁচ শো বছর আগে রাজাদের কোট পেইন্টার ছিল এবং তাদেরকে দিয়ে বাজার বেডরুম বা খ্রীষ্টানদের চার্চ ইত্যাদি আকানো হতো। এখনো সেই একই জিনিস চলে আসছে একটু ভিন্নভাবে। এখন রাজাদের জায়গায় এসেছে বড় বড় কোস্পানী বা ব্যাংক। ছাপচিত্রের সুবিধা হলো একটা ইমেজ লিমিটেড কপি করি আমরা এবং এই ছবির যে এক্সপ্রেশন সেটা বিক্রি করা যায় এবং একই সময়ে একটি ছবির ইমেজ, বক্তব্য বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন জায়গায় লোকে সংগ্রহ করতে পারে। এই সময়ে পৃথিবীতে বহু ইন্টারন্যাশনাল বিয়েনাল আছে ছাপাচিত্রের। জাপান, হল্যান্ড, বুলগেরিয়া, আমেরিকা, স্পেন, পোল্যান্ড, জার্মানী, ফ্রান্সসহ বহু দেশেই ছাপচিত্রের বিয়েনাল হচ্ছে। আমাদেও বাংলাদেশের আর্টিষ্টরাও সুযোগ পাচ্ছে এবং অংশগ্রহন করছে বিভিন্ন বিয়েনালে। এটা পেইন্টিং দ্বারা সম্ভব হতো না, কারন পেইন্টিং করার জন্যে প্রচুর টাকা দরকার। অন্যদিকে যোগাযোগের জন্য ছাপচিত্রই উত্তম। দি ওয়ে অব এক্সপ্রেশনটা ছাপচিত্রে আনেক সহজ। তাছাড়া এই মিডিয়াতে কাজের পদ্ধতিটাও আমার ভাললাগে। এসব কারণেই আমি ছাপচিত্রকে বেছে নিয়েছি কাজের মাধ্যম হিসেবে। বিশেষ করে এচিং।
জীবন থেকে নেয়া: ছাপচিত্রে বাংলাদেশের শিল্পীদের সম্পর্কে বলুন।
মনিরুল ইসলাম : ছাপচিত্রটা আমার কাছে মনে হয় পৃথিবীকে আরো ছোট করে এনেছে শিল্পের ক্ষেত্রে। একই সময়ে আমরা বিভিন্ন শিল্পীরা ইন্টারন্যাশনাল বিয়েনালে অংশ নিচ্ছি। এরকম একটি এগজিবিশন আমরা যদি বাংলাদেশে আয়োজন করি, সেখানে বিভিন্ন দেশের শিল্পীরা অংশ নেবে এবং এর ফলে আমরা বিভিন্ন শিল্পীর কাজ দেখে, তাদের বক্তব্য শুনে বুঝতে পারবো, জানতে পারবো পৃথিবীতে কী ধরনের ছবি আঁকা হচ্ছে এবং সেইসাথে আমাদের দেশের শিল্পীরাও নিজেদের তুলনা করতে পারবেন অন্যান্য শিল্পীদের সঙ্গে। কিন্তু তারপরও আমি বলবো বাংলাদেশের শিল্পীরা গত পনের/বিশ বছরে অত্যন্ত ভাল কাজ করছে। ইদানিং ইন্টারন্যাশনালি তাদের পারটিসিপেশন অনেক বেশী। তাছাড়া ছাপচিত্রের বিভিন্ন মেটেরিয়াল আমাদের দেশে তৈরি হয় এবং খুব অল্প খরচেই তা পাওয়া যায়। বাংলাদেশে প্রথম ছাপচিত্র কর্মশালাটি আশিতে শিল্পকলা একাডেমীতে আমি পরিচালনা করি এবং গত মাসে আরেকটি ওয়ার্কশপ করেছি। সেখানে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যে এক্সাইটমেন্ট লক্ষ্য করছি, তা আমার ভীষন ভাল লেগেছে এবং আমি অত্যন্ত আশাবাদী ছাপচিত্রে বাংলাদেশের শিল্পীদের নিয়ে।
জীবন থেকে নেয়া: ইদানিংকালে আমাদের শিল্পীদের কাজের কাজের বিশেষ কোন দিকটি আপনার কাছে উল্লেখ্যযোগ্য মনে হচ্ছে।
মনিরুল ইসলাম : আমার কাছে লক্ষনীয় দিকটি হচ্ছে, জলরং বা তেলরং ছাড়া ছবি করা যায় না। এই যে ট্র্যাডিশনাল চিন্তা এটার পরিবর্তন হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের টেকনিক ব্যবহার করে বিভিন্ন মেটিরিয়াল দিয়ে প্রচুর ছবি আঁকা হচ্ছে এখন যা আমাকে বিস্মিত করেছে এবং এটা আমার ভীষন ভাল লেগেছে।
জীবন থেকে নেয়া: এই সময়ে ঢাকার শিল্পরসিক ও শিল্পক্রেতা সম্পর্কে আপনার ধারণা।
মনিরুল ইসলাম: আমার মনে হয় আমাদের দেশে শিল্পরসিক বেড়েছে। এর ভেতরে দুটো জিনিস লক্ষ্য করলাম যে, কিছু কিছু ছবি বিক্রী হচ্ছে এবং গ্যালারির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। গত তিন মাসেই প্রায় তিন/চারটি নতুন গ্যালারি হয়েছে।কারন আমার মনে হচ্ছে মানুষ ছবি দেখছে, কেউ কেউ কিনছেও। ছবির গ্রাহক ছবি কিনে ছবির স্বাদ নিচ্ছে। ছবি বোঝাটাকে আমি অনেকসময় অস্বীকার করি। বলা যায় একজন ছবির স্বাদ নিচ্ছে। আর এটা বোঝা যাবে আরো পরে যে, সত্যিকারের ছবির গ্রাহক বাড়ছে কিনা। আমাদের মত গরীব দেশে রাজনৈতিক ছবি আকা হয় বিক্রি করা হয়। এগুলো আমার কাছে মনে হয় না সত্যিকারের ছবির ক্রেতা বাড়ছে। বরং আমার মনে হয় ছবির রাসিক বাড়ছে, যারা কিনতে পারে না ছবি। কিন্তু তারা প্রদর্শনীতে আসছে, ছবি দেখছে। এরা কেনে না, কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে ছবি দেখে।
জীবন থেকে নেয়া: শিল্পী ও শিল্প সমালোচক তো দুটো আলাদা স্বত্বা। একজন শিল্পী একইসঙ্গে শিল্প-সমালোচকদের ভূমিকায় কতোটা সফল হতে পারেন?
মনিরুল ইসলাম : হ্যা, এটারও একটা কনট্রাডিকশন আছে। একজন শিল্পী ছবিটাকে যেভাবে দেখে একজন আর্ট ক্রিটিক ঠিক সেইম ডিরেকশন দেখে না। আর্ট ক্রিটিক আমার মনে হয় অন্যান্য ক্রিটিকের চেয়ে বেশী গভীর। কিন্তু একজন শিল্পী যখন কাগজে আর্ট ক্রিটিক হিসেবে লেখেন, সেটা আমার খুব ভাল লাগে না। টেবিল কে অনেক সময় আমরা এক শিল্পী আরেক শিল্পীর ক্রিটিসাইস করি, কিন্তু তা লিখে প্রকাশ করাটা আমার কাছে ভাল লাগে না। তাছাড়া আমার মনে হয় একজন শিল্পীর জন্যে বেষ্ট ক্রিটিসিজম হচ্ছে সেলফ ক্রিটিক। আমার ছবির আমিই ক্রিটিক। আমি কেন ছবি আঁকছি, যদি নিজেকে প্রশ্ন করি, তাহলে ঠিক উত্তরটা আমি পেয়ে যাই। ক্রিটিকের ক্রিটিসিজম চলে যাবে, কিন্তু শিল্পীর ছবিটা থেকে যাবে হয়তো একশো বছর পরও। তবে এই শতাব্দীতে আর্ট ক্রিটিসিজমের প্রয়োজন আছে। যদিও আমাদের দেশে যেটা হচ্ছে সেটা ঠিক ক্রিটিক নয়, বলা যায় আর্ট এ্যাপ্রিসিয়েশন। আসলে আমরা সবাই চাই যে ভাল লেখা হোক। এজন্যে ক্রিটিকরাও একটু অন্য এঙ্গেলে ছবিটা দেখে। প্রসংশা না করলে আমরা রেগে যাই।
জীবন থেকে নেয়া: আপনার শিল্প-ভাবনার কথা বলুন।
মনিরুল ইসলাম: আমার শিল্প ভাবনা হলো যে, আমি ছবি আঁকছি এবং সবচে বড় জিনিষ যে একটি ছবি আঁকার পর ঐ দিনই আমার ইচ্ছে হয় একটা নতুন কিছু করতে। আসলে ছবি আকাটা আমার নিজের কাছেই একটা সারপ্রাইজ। টেনশন থাকে যদি ছবিটা লোকের কাছে সেভাবে গ্রহণযোগ্য না হয়। আবার আজকে আমি যে ছবিটা আঁকছি, কালও কি এই ছবিটা সমসাময়িক থাকবে? এটাই একটা ফ্রিকশন আমার মধ্যে যে আর্ট ফর টুডে, আর্ট ফর টুমরো। তবে এটা অনেকটা আকাশ কুসুম চিন্তা হয়ে যায় যে, আজ আমি যে ছবি আঁকছি তা কালও লোকের ভাল লাগবে বা টিকে থাকবে।
জীবন থেকে নেয়া : একটি ছবি আঁকার প্রথম পরিকল্পনাটি কিভাবে করেন?
মনিরুল ইসলাম : সাধারণত ছবিটা শুরু করি একটা লাইন বা রং দিয়ে। ডট দিয়েও শুরু হতে পারে। অস্পষ্ট একটা ইমেজ মোটামুটি ধরে নেই, তারপর লাইন দিলে লাইফ আমাকে গাইড করে নিয়ে যায়। লাইনের ভেতর ছন্দ আছে, ছন্দ মিলে তারপর একটা ডিজাইন, এরমধ্যে এই রং থাকবে না ঐ রং থাকবে। আবার কতটুকু স্পেস থাকবে। আমার মনে হয় ছবির জন্যে স্পেস খুব গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। এরপর আবার লাইন থেকে স্পেসে এবং লাইনের কাছে লাইনে যাতে ছন্দ থাকে, তারপর ডেপথ্ থাকে এসব ভাবতে হয়। আবার একই কারণে ছোট ছবিও বড় মনে হয়।
জীবন থেকে নেয়া: ছবি কি করে দেখতে হয়, ছবি কি কওে বুঝতে হয়, আপনি কিভাবে ছবি দেখেন? কিভাবে ছবির আত্মার প্রবেশ করেন?
মনিরুল ইসলাম : আমি প্রথম ছবির ইনার ডিজাইনটি লক্ষ্য করি তারপর দেখি ড্রয়িং-এর কমপোজিশন। স্পেস-এর কমপোজিশন, কালার কমপোজিশন ইত্যাদি। আর এসব দেখতে দেখতেই কখন ছবির ভেতরে চলে যাই নিজেই বুঝতে পারি না।
জীবন থেকে নেয়া: জীবনের বেশ কিছুটা পথ তো পেরিয়ে এলেন জীবন সম্পর্কে আপনার এখকার উপলদ্ধি কি?
মনিরুল ইসলাম : এখন বড় বেশি করে মনে হয় একজন মানুষের কাজের তুলনায়, কর্তব্যের তুলনায় জীবন খুবই ছোট। মানুষের সভ্যতার অহংকার, মানুষের বিজ্ঞানের অহংকার, প্রযুক্তির অহংকার কোন কিছুই সময়কে বাগে আনতে পারে না- সময় কত দ্রুত ফুরিয়ে যায়।
জীবন থেকে নেয়া: সবশেষে এবার জানতে চাইবো আপনার কোন ভবিষৎ পরিকল্পনার কথা।
মনিরুল ইসলাম: আমি কালকে কি ছবি আঁকবো সেটাই আমার কাছে সবচে বড় পরিকল্পনা। শিল্পীরা এখন খুব প্র্যাকটিক্যাল। তারা এখন ল’ইয়ারের মতোই থাকতে চায়। আগে ইজেলটা বাইরে নিয়ে গিয়ে ছবি আঁকা হতো। এখন আর্টিষ্টরা ইজেল নিয়ে ঘরের ভেতর ছবি আঁকে। এখন ছবি আঁকার জন্যে ইনটালেকচুয়াল গ্রোথ একান্ত দরকার। ছবি আঁকলেই যে শুধু ষ্টুডিওতে বসে আঁকবো, এটা আমার কাছে খুব বড় নয়। ছবি আঁকা জন্যে অত্যন্ত দরকার কবি, লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিকদের সঙ্গে কথা বলা, ঘনিষ্ঠভাবে মেশা। প্রয়োজনে ভাল ভাল বই পড়া, ভাল সিনেমা দেখা, ভাল থিয়েটার দেখা এমন কি বাইরে বেড়ানোও। ছবি আঁকার জন্যে ইনটালেকচুয়াল গ্রোথ সবচে জরুরী

Views All Time
Views All Time
347
Views Today
Views Today
1
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top