অর্থনীতি

ছোটদের অ্যাকাউন্টে হাজার কোটি টাকা

শিক্ষার্থীদের মাঝে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম। গত ৭ বছরে এই হিসাব খোলার সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে আমানতের পরিমাণও। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, সারাদেশে বিভিন্ন ব্যাংকে ১৩ লাখ ৭৪ হাজার ৪৪৩টি স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলা হয়েছে। এসব অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

শিশুকাল থেকেই সঞ্চয়ের মনোভাব গড়ে তুলতে ২০১০ সালে এই ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। শিক্ষার্থীদের পরবর্তী জীবনে আর্থিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত ও শিক্ষার ব্যয় নির্বাহ সহজ করাও এর অন্যতম লক্ষ্য। ছয় থেকে আঠার বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীরা এ হিসাব খুলতে পারে। আর হিসাব খুলতে কমপক্ষে ১০০ টাকা জমা দিতে হয়। ছাত্র-ছাত্রীর পক্ষে তার পিতা-মাতা অথবা আইনগত অভিভাবক এ হিসাব পরিচালনা করে থাকেন। এ হিসাব খুলতে অন্যান্য হিসাবের মত ‘কেওয়াইসি’সহ নির্দিষ্ট ফরম রয়েছে। এসব ফরম পূরণ করে ছাত্র-ছাত্রীর জন্ম নিবন্ধন সনদ ও স্কুলের পরিচয়পত্র জমা দিয়ে এ হিসাব খোলা যায়। এসব হিসাব সাধারণ চলতি হিসাবে রূপান্তরের সুযোগও আছে। কোনো কোনো ব্যাংক আলাদা কাউন্টার বা ডেস্ক খুলে ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুল ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে বলে জানা গেছে।

স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরুর সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন ড. আতিউর রহমান। তিনি গতকাল এ বিষয়ে বলেন, স্কুলের শিক্ষার্থীদের আর্থিক শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত করানোর উদ্দেশ্যেই এটা শুরু করেছিলাম। কাগজে-কলমে শিখলে অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষা পূর্ণ হয় না। ব্যবহারিকভাবে (প্র্যাকটিক্যাল) শেখা দরকার। এছাড়া মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য এ সময়ের সঞ্চয় কাজে লাগতে পারে। একইসঙ্গে এটার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গেও পরিচিত করিয়ে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এসব উদ্দেশ্য নিয়েই স্কুল ব্যাংকিং শুরু হয়। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে স্কুল ব্যাংকিং ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, এই হিসাব খোলায় শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড এবং জমা টাকার পরিমাণের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেড। ইসলামী ব্যাংকে অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ২ লাখ ১৬ হাজার ৫৩৪টি। যা মোট অ্যাকাউন্টের প্রায় ১৬ ভাগ। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংকে এক লাখ ৭৮ হাজার ৫১৪টি, ডাচ্?-বাংলা ব্যাংকে এক লাখ ২৯ হাজার ৬৩১টি, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ৯৯ হাজার ১৮৭টি এবং উত্তরা ব্যাংকে ৮০ হাজার ৫৫১টি অ্যাকাউন্ট রয়েছে।

অন্যদিকে জমানো টাকার দিক থেকে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের স্কুল ব্যাংকিংয়ে জমা পড়েছে ৩৬০ কোটি টাকা। যা মোট জমার প্রায় ৩৩ শতাংশ। এর বাইরে ইসলামী ব্যাংকে ১০৭ কোটি টাকা, ইস্টার্ন ব্যাংকে ৯৫ কোটি টাকা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে ৫৭ কোটি টাকা এবং রূপালী ব্যাংকে ৫০ কোটি টাকা জমা হয়েছে।

ডাচ্?-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম মোঃ শিরিন বলেন, সরকারের বিভিন্ন বৃত্তি ও উপ-বৃত্তির টাকা ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। আর আকর্ষণীয় বিভিন্ন প্রকল্প থাকায় শিক্ষার্থীরা স্কুল ব্যাংকিংয়ে আগ্রহী হচ্ছে।

স্কুল ব্যাংকিং এ সরকারি ব্যাংকের চেয়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলো ভাল করেছে। এসব ব্যাংকে আট লাখ ৪৬ হাজার ৫৫৬টি অ্যাকাউন্ট আছে। যা মোট অ্যাকাউন্টের ৬১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এসব অ্যাকাউন্টে সাড়ে ৯০০ কোটি টাকা আমানত রয়েছে। যা স্কুল ব্যাংকিংয়ের মোট আমানতের ৮৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। প্রসঙ্গত, দেশের ৫৭টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৫৬টি ব্যাংকে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম রয়েছে।

স্কুল ব্যাংকিং এর হিসাবের মাধ্যমে শুধু টাকা সঞ্চয় হচ্ছে তাই নয়, শিক্ষার্থীরা ব্যাংকিং কার্যক্রমের সঙ্গে অভ্যস্ত হচ্ছে। ব্যাংকিং কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত প্রযুক্তির সঙ্গেও পরিচিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা এটিএম কার্ডের মাধ্যমে টাকা তুলতে পারছে। তাদের বেতনের টাকাও অ্যাকাউন্ট থেকে জমা দিতে পারছে। স্কুল ব্যাংকিং হিসাবের বিপরীতে ব্যাংকগুলো এটিএম কার্ড (কেবল ডেবিট কার্ড) ইস্যু করতে পারে। যার মাধ্যমে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা তোলা যায়। তবে অভিভাবকদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সর্বোচ্চ ৫০০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো যায়। স্কুল ব্যাংকিং হিসাব পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সরকারি ফি ব্যতীত অন্যকোন প্রকার সার্ভিস চার্জ নিতে পারে না। এ কার্যক্রমের আওতায় শিক্ষার্থীরা স্কুলে বেতন-ফি জমা দিতে পারে। বৃত্তি বা উপবৃত্তির অর্থ জমা রাখতে পারে।

এদিকে স্কুল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও গ্রামীণ এলাকায় তা বাড়ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, স্কুল ব্যাংকিং এর যেসব হিসাব খোলা হয়েছে তার মধ্যে শহরেই বেশি হিসাব খোলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে গ্রামীণ এলাকা পিছিয়ে রয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, শহরের ব্যাংক শাখাগুলোতে আট লাখ ২৭ হাজার ৪০২টি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। আর পল্লী এলাকার শাখাগুলোতে অ্যাকাউন্ট রয়েছে পাঁচ লাখ ৪৭ হাজার ৪১টি। শহরের অ্যাকাউন্টগুলোতে টাকার পরিমাণও বেশি। অন্যদিকে ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্রদের অ্যাকাউন্ট বেশি।

-অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top