খেলা

‘তবুও আমি কিংবদন্তি’

পরাজিতদের নাকি কেউ মনে রাখে না। দ্বিতীয় হওয়াদের নাকি ইতিহাসে ঠাঁই হয় না। তবে, সেই কথাটাকে উসাইন বোল্টের ক্ষেত্রে খাটে না। ১০০ মিটার দৌড়ে তৃতীয় হওয়ার পরও যে কাউকে নিয়ে এতটা হৈচৈ হতে পারে সেটা উসাইন বোল্টকে না দেখলে বোঝার কোনো উপায়ই নেই।

তবে, বোল্টকে নিয়ে এতটা উদ্দীপনা এত উৎসাহের কারণ, বেজেছে তার বিদায়ের বাঁশি। লন্ডন স্টেডিয়ামে ১০০ মিটার দৌড়ে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়েই যে বর্ণাঢ্য এক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন বোল্ট। আর কখনোই তাকে একক কোনো দৌড়ে অংশ নিতে দেখা যাবে না। আর কখনো দুই হাত উঁচিয়ে সেই ট্রেডমার্ক সেলিব্রেশনে হাজির হবেন না এই কিংবদন্তি।

প্রথম হয়েছেন জাস্টিন গ্যাটালিন। সোনা যে তার হাতে আসছে সেটা দৌড়টা শেষ করেই বুঝতে পেরেছিলেন। বোল্টকে হারিয়ে ফেলেছেন বলে একটু অপরাধীও হয়তো বোধ করছিলেন। মুখ চেপে চোখের জল আটকানোর চেষ্টা করলেন। পারলেন না।

এগিয়ে গিয়ে তৃতীয় হওয়া এক জ্যামাইকানের সামনে এসে দাঁড়ালেন। পুরো লন্ডন স্টেডিয়ামের সবাইকে অবাক করে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে অভিবাদন জানালেন। যেন, বলে দিতে চাইলেন, ‘এই দৌড়টা আমি জিতেছি। তারপরও আপনিই সর্বকালের সেরা, আপনিই কিংবদন্তি!’

তৃতীয় হওয়ার পরও ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের ইতিহাসে খুব কম লোকই পেয়েছেন এমন সম্মান। তবে, তৃতীয় হওয়ার লোকটার নাম যখন উসাইন বোল্ট, তখন নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায় যে, এর মধ্যে কোনো বাড়াবাড়ি নেই।

শনিবার রাতে শেষ বারের মতো বোল্ট নেমেছিলেন ১০০ মিটার দৌড়ে। বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ১০০ মিটারেই শেষ বারের মতো একক কোনো দৌড়ে অংশ নিতে দেখা গেল বোল্টকে।

২০০৮, ২০১২ ও ২০১৬ টানা তিনটি অলিম্পিকের ১০০ ও ২০০ মিটারে সোনা জিতেছিলেন বোল্ট। টানা তিন অলিম্পিকে এই কীর্তি আর কারো নেই। সত্যিকার অর্থেই বোল্ট এক স্বর্ণবালক। বরাবরের মতোই সংবাদ সম্মেলনে বোল্ট কোনো ভনিতা করলেন না। শনিবার রাতে দৌড় শেষে বলে দিলেন, ‘জয় দিয়ে শেষ করতে পারলাম না। আমি দুঃখিত। তবে, সত্যি এটা দারুণ একটা যাত্রা ছিল। আজকের ফলাফল যাই হোক না কেন তারপরও আমি কিংবদন্তি।’

৯.৯২ সেকেন্ডে সবার আগে দৌড় শেষ করেন গ্যাটলিন। ৯.৯৪ সেকেন্ডে রূপা জিতেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিস্টিয়ান কোলম্যান। আর ৯.৯৫ সেকেন্ডে তৃতীয় হন বোল্ট। সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী উত্সব। বোল্টের দৌড়, বোল্টের চালচলন-কথাবার্তা— সব কিছুই ভক্তদের চোখে ছিল উত্সবের মতো। উত্সবের ইতি হওয়ার মধ্য দিয়ে বর্ণাঢ্য এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। বোল্ট নিজেই বলে দিলেন, ‘পার্টি ইজ ওভার। এখানেই শেষ করতে হচ্ছে।’

‘দৌড়াদৌড়ি’ ক্যারিয়ার তো শেষ। এখন কী করবেন ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের মহানায়ক? বোল্টের সাফ জবাব, এখন মা’র লক্ষ্মী ছেলে হয়ে থাকার দিন চলে এসেছে। তিনি বলেন, ‘প্রতিটা স্বর্ণ জয়ের পর আমার কাছে সবচেয়ে তৃপ্তিদায়ক দৃশ্য ছিল আমার মায়ের মুখের হাসি। এখন তার সাথে লম্বা সময় কাটাবো। আপনারা তো জানেনই আমি মায়ের লক্ষ্মী ছেলে… হা হা।’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের খাতা বন্ধ হয়ে গেল। নিভে গেল লন্ডন স্টেডিয়ামের সবকটি আলো। কিংবদন্তি বোল্ট শেষ বারের মতো বের হয়ে যাচ্ছেন। তার ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসিটা তখনো লেগে থাকল। সেই হাসির আড়ালে বিদায়ের বিষাদ একবারের জন্যও কি ভাবালো না তাকে? কে জানে!

বিদায় উসাইন বোল্ট

> বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ১১টি সোনাসহ সর্বোচ্চ ১৪টি পদক জিতেছেন উসাইন বোল্ট। দ্বিতীয় স্থানে থাকা লাশান মেরিট ৮টি সোনাসহ জিতেছেন ১১টি পদক।

> ১০০ এবং ২০০ মিটারে রেকর্ডধারী। ২০০৯ সালের বার্লিন ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে ৯.৫৮ সেকেন্ড সময় নিয়ে ১০০ মিটারে রেকর্ড গড়েছিলেন বোল্ট। একই চ্যাম্পিয়নশিপে ২০০ মিটারে ১৯.১৯ সেকেন্ড সময় নেন জ্যামাইকান কিংবদন্তি।

> অলিম্পিকে ৮, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ১১ এবং কমনওয়েলথ গেমসে ১টি স্বর্ণ জিতেছেন বোল্ট। আইএএএফ-এর বর্ষসেরা অ্যাথলেট হয়েছেন ছয়বার।

> ট্রাকে বোল্টের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৭.৭৯ মাইল। ২০০৯ সালে ১০০ মিটারে রেকর্ড গড়ার সময় এটা রেকর্ড করা হয়েছিল।

> ২০১৬-১৭ সালে প্রাইজ মানি এবং ইমেজ স্বত্ব থেকে প্রায় তিন কোটি ৪২ লাখ ডলার আয় করেছেন বোল্ট। ২০০৮ সাল থেকে জ্যামাইকার অলিম্পিক এবং বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ পদকের ৪০ শতাংশ এসেছে তার হাত ধরে।

বোল্ট কথন

বৈশ্বিক আবেদন নিয়ে

আমি আনন্দ দিতে ভালোবাসি। কারণ এজন্যই লোকজন আমাকে দেখতে আসে। আমি ভিন্নতা আনতে চেষ্টা করি। এ কারণেই লোকজন আমাকে এত বেশি ভালোবাসে।

সমালোচনার জবাবে

আমি বিতর্কিত কিছু বলতে যাচ্ছি। কার্ল লুইসের প্রতি আমার কোনো শ্রদ্ধা নেই। ট্র্যাকের অ্যাটলেটদের সম্পর্কে তিনি যা বলেন, তা অপমানজনক। তিনি আসলে মনোযোগ আকর্ষণ করতে চান। কারণ কেউ তার সম্পর্কে কথা বলেন না। আমি তার প্রতি সব শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলেছি। সব।

জীবন দর্শন

মানুষের আচার-আচরণ সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারেন, আপনি যখন একজন বিকাশমান তরুণ হিসেবে রাস্তায় হাঁটছেন আপনার প্রত্যেককে শুভ সকাল বলা উচিত। প্রত্যেককে। আপনি একজনকেও এড়িয়ে যেতে পারেন না।

-স্পোর্টস ডেস্ক

Views All Time
Views All Time
42
Views Today
Views Today
1
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top