আমি এবং আমরা

নাগরিক এক নারীর প্রোফাইল, নারী তুমি অবলা!

বাজারের ব্যাগ হাতে দ্রুত গতিতে হেঁটে যাচ্ছে অবন্তি। রাত তখন দশটা, এটা অনেক বেশি রাত নয়। ইট-পাথর আর যানজটের এই ঢাকা শহরে রাত তো কেবল শুরু হলো। তাহলে অবন্তি এতো দ্রুত হাঁটছে কেন? তার এতো কিসের তাড়া? তাড়া তো আছেই তার চেয়েও বেশি আছে সর্বাঙ্গে ক্লান্তি। সারাদিনের অফিস শেষে রাজধানীর বিশাল রাজকীয় যানজট পাড়ি দিয়ে সবে মাত্র বাসার কাছের রাস্তায় এসেছে। মোহম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের সাথে লাগোয়া বাজারের রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে ভাবছে বাসায় গিয়ে করতে হবে এমন সব সংসারের হাজারো খুঁটিনাটি কাজের কথা। ভাবতে ভাবতে শেষ হয়ে গেল পথ। দরজার তালা খুলে বাসার ভেতরে ঢুকতেই এলোমেলো ড্রইং রুমের চারপাশ দেখে নিল সে, অজান্তেই বেরিয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস। এরপর বেড রুমে গিয়ে নরম বিছানায় শরীর এলিয়ে শুয়ে পড়ল সে।
ওহ অবন্তির পরিচয়টাতো দেয়াই হলো না। ওর পুরো নাম অবন্তি অনন্যা। একটা কর্পোরেট কোম্পানিতে সে কাজ করে। ঢাকায় অবন্তি ওর স্বামীর সাথে একটা ভাড়া বাসায় থাকে। ওর স্বামীর নাম অরণ্য রহমান। অরণ্যও একটা কর্পোরেট কোম্পানিতে কাজ করে। আপাতত এটুকু জানলেই চলবে।দশ মিনিট বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে আর বিছানায় থাকতে পারল না অবন্তি। বিছানা থেকে উঠে পড়ল সে। কি হলো অবন্তির? তার সারাদিনের ক্লান্তি নিমেষেই কেটে গেল? না তা কাটবে কেন? কিন্তু ওই যে সংসারের সারাদিনের কাজগুলো যে ক্লান্তির মত জমে রয়েছে। তার কি হবে? অবন্তি তার ক্লান্তিকে পাত্তা না দিয়ে সংসারের কাজে লেগে পড়ল। রান্না, ধোঁয়া-মোছা আরও ছোট-বড় হাজারো কাজ করতে থাকল সে।
এসবের মাঝে অরণ্য এলো রাত তখন সাড়ে বারোটা বাজে। অরণ্যের অফিসের কাজের বাইরে তেমন একটা চিন্তা নেই, কাজ নেই। সংসারের সমস্ত চিন্তা ভাবনার দায়িত্ব যেন সে অবন্তিকেই দিয়ে রেখেছে। অরণ্য এসে ফ্রেস হয়ে নিয়ে বিছানায় হেলান দিয়ে ল্যাপটপে তার নিজের অসমাপ্ত কাজ আর কিছু গান, গল্প, নাটক দেখে সময় পার করতে থাকে। রাত তখন দেড়টা বাজে এমন সময় অরণ্যের ডাক পড়ল, অবন্তি ডাকছে ডিনার করতে। খাবার টেবিলে দুজনে খেতে বসেছে।
এমন সময় গল্পে গল্পে অবন্তি তার জমে থাকা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলল, ‘সংসারটা শুধু আমার একার নাকি। তুমি আছো তবু মনে হয় তুমি নেই। কোন কাজে কর্মে আমি তোমাকে পাই না।’
অরণ্য বলল, ‘তোমার প্রতিদিনের এসব কথা শুনতে শুনতে আমি বিরক্ত। আর ভালো লাগে না। কি বলতে চাও তুমি?’
এভাবেই কথা কাটাকাটির মধ্য দিয়ে তাদের রাতের খাবার পর্ব শেষ হলো। অরণ্য ফিরে গেল তার কাজে। আর এদিকে অবন্তি মুখ ভার করে সংসারের বাকি কাজ শেষ করতে চলে গেল। কাজ শেষে ঘুমানোর জন্য যখন অবন্তি বিছানায় এলো তখন প্রায় পৌনে তিনটা বাজে। অবন্তি ঘরের আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লে পরে অরণ্যও তার ল্যাপটপ বন্ধ করে ওর পাশে এসে শুয়ে পড়ল। দুজন দুদিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরে অরণ্য ঘুমিয়ে গেল। এদিকে অবন্তি ঘুমানোর জোর চেষ্টা করছে কিন্তু ঘুম যেন কিছুতেই আসছে না।
অবন্তির নির্ঘুম চোখে এলোমেলো ভাবনা আসে। শৈশব, কৈশোর আর বর্তমানের ভাবনা তাকে জড়িয়ে ধরে। তার মনে পড়ে ছেলেবেলার একটি ঘটনা। ঘটনা না হয়ে তার জীবনের বড় একটা দুর্ঘটনাও হতে পারত সেটি; এমনটাই মনে করে অবন্তি। ও তখন দশম শ্রেণিতে পড়ে। ওরা দুই বোন। অবন্তিই ছিল বড়। ছোট বোন রূপা পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। তাদের সংসারে তখন আর্থিক অনটন ছিল প্রচুর। রংপুরের মত মফস্বল শহরে হাতে পায়ে বেড়ে উঠলেই মেয়ে বড় হয়ে যায়। আর এতে আবার যোগ হয়েছিল আর্থিক অনটন। তাহলে তো আর কথাই নেই মেয়ে বড় হয়েছে, মেয়েকে বিয়ে দিলেই বুঝি তার একটা গতি হয়, সকল দায়িত্ব চুকে যায় সবার তখন এমনটাই মনে করছিলেন অবন্তির মা-বাবা থেকে শুরু করে সব আত্মীয় ও স্বজনেরা। অবন্তিকে বিয়ে দেয়ার কতই না চেষ্টা করেছিল তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অবন্তির জেদের কাছে তার বাবা মাকে হার মানতে হয়েছিল। অবন্তির আজ এ সময়ে এসে এসব কথা মনে পড়লে কষ্টও হয় আবার হাসিও পায়। তাকে তার মামা, খালা, চাচা, ফুফু থেকে শুরু করে সব আত্মীয় ও স্বজনেরা বিয়ে করা নিয়ে কত উপদেশই না দিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, বিয়ে ছাড়া একটা মেয়ের জীবনের কোন গতি নেই। পুরুষ ছাড়া নারী একা চলতে পারে না। নারী সমাজে অচল অবলা ইত্যাদি ইত্যাদি কত কথা।
এর পরে কত সংগ্রাম কত কি করে অবন্তি তার লেখাপড়া শেষ করেছে। আজকে সে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রেম করে বিয়ে করেছে। কিন্তু এ বিয়ে তাকে কি দিয়েছে? এই সমাজে তথাকথিত পুরুষ ছাড়া নারী অচল। তাহলে আজ সে অচল নয়, অবলা নয় কারণ তার একটি পুরুষ সঙ্গী আছে। হোক সে (পুরুষ সঙ্গী) কাজের কিংবা অকাজের। অন্তত সমাজ, তার আত্মীয় ও স্বজনেরা তো তাই মনে করে। কিন্তু প্রতিদিনের ঘরে বাইরের লড়াইটা যে তাকে একাই লড়তে হয়, সেটা অবন্তি ভালো করেই জানে।

 

নুসরাত অদিতি

Views All Time
Views All Time
522
Views Today
Views Today
1
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top