উপ সম্পাদকীয়

পাকিস্তানের ঘোলা পানিতে মাছ শিকার (পর্ব-২)

মারুফ রসূল : বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস পাঠ করলে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সঙ্গে পাকিস্তানের কাছে আমাদের পাওনা বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতার হেরফের ঘটেছে। দেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধু সরকার পাকিস্তানের কাছে আমাদের পাওনা আদায়ে নানা রকম কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছিলেন। কিন্তু একটি যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে বিষয়টি অত সহজ ছিলো না। পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে সপরিবারে এবং জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মাধ্যমে পাকিস্তানের কাছে আমাদের পাওনা অর্থের বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা কেবল থেমেই যায়নি বরং উল্টো পথে চলেছে। কিন্তু  আজ স্বাধীনতার পঁয়তাল্লিশ বছর পরও বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, কেননা, বর্তমানে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইনে পাকিস্তানের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষতিপূরণসহ আমাদের পাওনা আদায়ের পথ অনেকটা সহজ । এ বিষয়ে শক্ত মেরুদ-সম্পন্ন কূটনৈতিক নীতি অবলম্বন জরুরি, যা বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের কাছে আমরা প্রত্যাশা করতে পারি।

পাকিস্তানের কাছে আমাদের পাওনা

পাকিস্তানের কাছে আমাদের পাওনার বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যেই অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু  রাষ্ট্রীয়ভাবে সে আলোচনাগুলো আন্তর্জাতিকমহলে খুব বেশি উত্থাপন করা হয়নি। তাছাড়া পাওনার ক্ষেত্রে কেবল বৈদেশিক ঋণ, যেগুলো ১৯৪৭-১৯৭০ পর্যন্ত পাকিস্তান লাভ করেছে, মোটা দাগে সেগুলো পাওনা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের তেইশ বছরের নির্মম শোষণের সময় বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) বিভিন্ন পর্যায়ে যে বৈষম্যের শিকার হয়েছে, সে বিষয়ক আলোচনা খুব বেশি হয়নি। তৎকালীন পাকিস্তানের শিল্প-বাণিজ্য নীতি, আমদানি-রপ্তানি নীতি, বৈদেশিক সাহায্য নীতি তথা সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশকে প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা বঞ্চিত করেছে। এসব বৈষম্য নিরসনে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী কোনো উদ্যোগ তো গ্রহণ করেইনি, উল্টো বৈষম্য নিরসনে বাঙালির দাবি-দাওয়াকে পিষে ফেলতে নির্মম আক্রমণ করেছেন গণহত্যা চালিয়েছে।

তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে যে বৈষম্য, তা পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ‘চূড়ান্ত’ ও ‘আপেক্ষিকভাবে’ বেড়ে যায়। ১৯৪৯ সালে দুই অঞ্চলের ব্যবধান যেখানে ছিলো ৬৩ টাকা, অর্থাৎ ২১.৯%, তা কুড়ি বছরের ব্যবধানে ১৯৬৯ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২০২ টাকায় বা ৬১.০৫% (বাঙালি জাতীয়তাবাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি, রেহমান সোবহান, পৃ: ৬১৯)। ১৯৪৭-৭০ পর্যন্ত পাকিস্তান যে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি পায় (৭৬৪০ মিলিয়ন ডলার), তার ৮৪.২৮% (৬৪৩৯ মিলিয়ন ডলার) পশ্চিম পাকিস্তান উন্নয়ন কাজে ব্যয় করে। এর মাত্র ৩০% পায় পূর্ব পাকিস্তান (১৯৩১.৭ মিলিয়ন ডলার)। অথচ জনসংখ্যার ভিত্তিতে ৫৬% বা সমবণ্টনের ভিত্তিতে ৫০% ঋণ সুবিধা আমাদের পাবার কথা ছিলো। বাণিজ্যনীতির ক্ষেত্রে যে ভয়াবহ আগ্রাসী জোচ্চুরি করেছে পাকিস্তান, তা সম্ভবত তৎকালীন ইতিহাসে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। ১৯৪৭-৭০ সালের মধ্যে মোট রপ্তানিতে পূর্ব পাকিস্তানের আয় ছিলো ২৫,৫৫৯ মিলিয়ন টাকা (৫৩৭০ মিলিয়ন ডলার); অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তান আয় করেছে ২১,১৩৭ মিলিয়ন টাকা (৪,৪৪০ মিলিয়ন ডলার)। কিন্তু  এই উপার্জিত অর্থ যখন আমদানির জন্যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, তখন হিসেব উল্টে ফেলেছে শোষক পাকিস্তান সরকার। মোট রপ্তানি আয় ৪৬,৬৯৬ মিলিয়ন টাকার (৯৮১০ মিলিয়ন ডলার) মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান বরাদ্দ পেয়েছে মাত্র ১৭,০৬৭ মিলিয়ন টাকা (৩৫৮৫.৪৭ মিলিয়ন ডলার)। বাকি অর্থ (২৯,৬২৯ মিলিয়ন টাকা বা ৬২২৪.৫৩ মিলিয়ন ডলার) পশ্চিম পাকিস্তানের কাজে ব্যয় হয় (Monthly Foreign Trade Statistics, June 1970, Karachi, p1)। অর্থাৎ, আমাদের আয়ের উদ্বৃত্ত অর্থ (৮৪৯২ মিলিয়ন টাকা বা ১৭৮৪.৫৩ মিলিয়ন ডলার) ব্যয় হয় পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন খাতে। কোনো কোনো অর্থনীতিবিদের মতে, রপ্তানি আয় থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ হবে ২০০০ মিলিয়ন ডলার। আবার দুই অঞ্চলের বাণিজ্যতেও পাকিস্তানের শোষকরা আমাদের রক্ত চুষে মুনাফার পাহাড় গড়ে। ১৯৪৭-৬৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে রপ্তানি হয় ১৭৩৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য অথচ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আমদানি করতে হয় ৩৩০৯ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। ১৯৭৪ সালের ০৪ এপ্রিল দৈনিক বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন মতে শুধু বৈদেশিক বাণিজ্য খাতে পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের ৫০০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এই আলোচনাতে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী ইতিহাসের যে জঘন্যতম লুটপাট, অগ্নি-সংযোগ, ব্যাংকের টাকা পাচারসহ নানাবিধ ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তার বিষয়ে কেবল ঢাকায় জাতিসংঘের কার্যক্রম পরিচালনা কর্তৃপক্ষের হিসাবটি উপস্থাপনা করছি। তাদের হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিলো ১.২ বিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশের সরকারের হিশাবে ১২৪৯ কোটি টাকা।

পাওনা দাবির আইনি ভিত্তি

পাকিস্তানের কাছে আমাদের পাওনা দাবির আইনি ভিত্তি নিয়ে কথা বলার আগে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন যে, ভূ-খণ্ডের ওপর রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের পরিবর্তনের বেশ কয়েকটি ধারা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী স্বীকৃত। সেগুলো হলো: রাজনৈতিক নিষ্পত্তি, স্বেচ্ছা একত্রীকরণ, ভূ-খণ্ডের হস্তান্তর, স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধ, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র কর্তৃক স্বাধীনতা অর্জন ইত্যাদি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ভূ-খণ্ড অর্জন করেছে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকার রাষ্ট্রের সব সুবিধা অর্জনের অধিকারী। বলে রাখা ভালো, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, ভূ-খণ্ড সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্যে দায়-দায়িত্বের ক্ষেত্রে এক রাষ্ট্র কর্তৃক অন্য রাষ্ট্রের স্থলাভিষিক্ত হওয়াকে ‘রাষ্ট্রীয় উত্তরাধিকার’ বলে। এ প্রসঙ্গে ‘ভিয়েনা কনভেনশন’ আইনের আওতায় আমরা আমাদের পাওনা দাবি করতে পারি। ১৯৮৩ সালের কনভেনশনের ৪০-৪১ ধারায় বলা আছে, যখন কোনো রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের অংশ বিশেষ একাধিক রাষ্ট্রের মধ্যে ভাগ হয়ে একাধিক রাষ্ট্রের অংশে পরিণত হয়, তখন বিভক্ত রাষ্ট্র বা ভূ-খণ্ডের ঋণও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের মধ্যে আনুপাতিক হারে ভাগ হবে। সম্পদ বণ্টন বিষয়ক আন্তর্জাতিক আইনের নিয়মানুযায়ী, হস্তান্তরিত ভূ-খণ্ডের অবস্থিত বা হস্তান্তরিত ভূ-খণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত সকল স্থাবর ও অস্থাবর রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি এবং তহবিলের অধিকার উত্তরাধিকারী রাষ্ট্রের ওপর বর্তাবে। এই স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি পূর্ববর্তী রাষ্ট্রের সীমানার বাইরে বা বিদেশে অবস্থিত হলেও, তা যদি হস্তান্তরিত ভূ-খণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়, তবে তার অধিকার উত্তরাধিকার রাষ্ট্রের। এই বিধানে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক আদালত এবং স্থায়ি আন্তর্জাতিক আদালত বেশ কিছু সিদ্ধান্ত এবং অভিমত প্রদান করেছেন। এই বিধান ১৯৭৮ সালের ভিয়েনা কনভেনশনের আর্টিক্যাল-২ এ উল্লেখ আছে। এই বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ পাকিস্তান রাষ্ট্রের তহবিল এবং অস্থাবরসহ সব বিষয়ে সম্পত্তিতে হিস্যার দাবিদার। এই আইন অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের আগের পাকিস্তানের যে সকল সম্পত্তি বিদেশের মাটিতে ছিলো (যেমন বিভিন্ন দূতাবাসের ভবন বা ভবনস্থলের অস্থাবর সম্পত্তি), সেগুলোতেও আমাদের পাওনা রয়েছে।

এই আইনে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা আছে, যেটি ‘দায় সংক্রান্ত’, অর্থাৎ পূর্ববর্তী বা সাবেক রাষ্ট্রের ঋণের দায় গ্রহণ। পাকিস্তান কিন্তু  নিকটবর্তী অতীতেও এ বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকবার জল ঘোলা করেছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ এলেই কতিপয় পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবী ভিয়েনা কনভেনশনের এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করে। কিন্তু  এই আলোচনা ধোপে টিকে না। কারণ, পাকিস্তান আমলে ঋণ হিসেবে নিয়ে ১৯৭৮ সালের মধ্যে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে সমাপ্ত প্রকল্পের মোট ৫০৬.৭৬১ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১৩.৪৮৫ মিলিয়ন ডলারের দায় বাংলাদেশ গ্রহণ করে। আবার চলমান প্রকল্পের ১৪৫.৮৬ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১৩৬.১২১ মিলিয়ন ডলারের দায়ও বাংলাদেশ গ্রহণ করে (বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের বিতর্ক, দ্বিতীয় খণ্ড, সংখ্যা ১৪, ০৮ জুন, ১৯৭৯, পৃষ্ঠা: ৮৫৭-৮৬৩)। সুতরাং ভিয়েনা আইনের এই ধারটির কথা উল্লেখ করে বৈদেশিক ঋণের এক-তৃতীয়াংশ তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে ব্যয়ের যে ঘ্যানঘ্যানানি পাকিস্তান করে থাকে, তা অযৌক্তিক কেবল নয়, সর্বৈব মিথ্যা।

পাওনা আদায়ে আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতার খতিয়ান : পাকিস্তানের কাছে আমাদের ন্যায্য পাওনা আদায়ের কূটনৈতিক তৎপরতাকে তিনটি ভাগে ভাগ করে সংক্ষেপে আলোচনা করতে পারি। প্রথম ভাগে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের কূটনৈতিক তৎপরতা। দেশ স্বাধীন হবার পর সম্পদ বণ্টনের বিষয়টি বিক্ষিপ্তভাবে পাকিস্তানের কাছে উত্থাপন করা হয়। ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে পাওনার বিষয়টি উত্থাপন করেন। তার ঠিক পরের মাসেই জাপান সফরকালে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্পষ্টভাবে সম্পদ বণ্টনসহ অন্যান্য পাওনা আদায়ের প্রসঙ্গে কথা বলেন। আন্তর্জাতিক আইনে ন্যায়সংগত প্রাপ্যের দাবি আদায়ের জন্যে বঙ্গবন্ধু যে পাকিস্তানের স্বীকৃতির বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন, সেটা অনুমান করা যায়। কারণ, পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেই তাকে আমাদের ন্যায্য পাওনা দিতে হবে। সুতরাং, এ বিষয়ে প্রথম গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয় ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, স্বাধীন রাষ্ট্র হিশেবে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের স্বীকৃতি প্রদানের পর। শুরু থেকে এ কাজটি কেনো গুরুত্বের সঙ্গে করা যায়নি, তা বিচার করার জন্যে, সে সময়ের পরিস্থিতি বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। সদ্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্র হিশেবে বিভিন্ন দেশ থেকে স্বীকৃতি আদায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ও বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তি ছাড়াও বাংলাদেশকে তখন পাকিস্তান ও তার দোসর বিভিন্ন রাষ্ট্রের তৈরি নানা অপ-প্রচারের জবাব দিতে হচ্ছিলো। এরই মধ্যে পাকিস্তানি ব্যবসায়িরা (স্বাধীনতার আগে যারা বাংলাদেশে ব্যাবসা করতো) সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের কাছে সম্পদ দাবি করতে থাকে। এটা ছিলো পাকিস্তানের আগাম প্রতিষেধক, যাতে বাংলাদেশ পাওনা আদায় ও সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে কোনো জোরালো দাবি করতে না পারে। পাকিস্তানও জানতো, এখনও জানে, আন্তর্জাতিক আইনে বাংলাদেশের দাবি যতোটা যৌক্তিক, পাকিস্তানের দাবি ততোটাই হাস্যকর এবং বালখিল্য। ফলে মুক্তিযুদ্ধের পর সম্পদ বণ্টনের বিষয়ে পকিস্তান কার্যত মৌন থেকে বাংলাদেশকে নিষ্ক্রিয় রাখার কৌশল অবলম্বন করে। তবে ১৯৭৪ সালের ০৫-০৯ এপ্রিল দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে ভারত ও বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তান আলোচনায় বসে। সে সময় এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা হয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী দু দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর বিষয়টি সমাধানের কথা বলে। এ সময় বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে থাকে। মোনে রাখতে হবে, ঠিক তখনই (১৯৭৪ সালে) পাকিস্তানের গণমাধ্যম ও কোনো কোনো মহল ‘হঠাৎ করে’ বাংলাদেশের কাছে পাল্টা সম্পদ দাবি করে। এ ঘটনার সঙ্গে এই কিছুদিন আগে পাকিস্তানের অর্থ দাবি করার বিষয়টির পদ্ধতি ও পরিস্থিতিগত মিল রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠকের পূর্বে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পরিকল্পনা কমিশন ১৯৭১ সালের পাকিস্তান সরকারের পরিসংখ্যানকেই বিবেচনায় রেখে সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে চারটি নীতি নির্ধারণ করে। এছাড়াও দু দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে যে খসড়া দলিল হয়, তাতেও সম্পদ বণ্টনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিলো। কিন্তু  পাকিস্তান এ বিষয়ে কোনো আলোচনা করতে রাজি হয়নি, উল্টো জানিয়ে দেয়, নীতিগতভাবে এ প্রস্তাব গ্রহণে সে প্রস্তুত নয়। সুতরাং সম্পদ বণ্টনের ইস্যুতে ভুট্টোর সফর ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। পাকিস্তানের দক্ষিণপন্থী দলগুলো এবং তাদের বুদ্ধিজীবী-গবেষকরা এ বিষয়ে কোনো গবেষণা তথ্য-তত্ত্ব-উপাত্ত ছাড়াই বাংলাদেশের দাবির সমালোচনা করতে থাকে। কিন্তু  বাংলাদেশও সাফ জানিয়ে দেয়, কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হলে সম্পদ বণ্টন ও অবাঙালি প্রত্যাবাসনের বিষয়টি সমাধান করে আসতে হবে। তবে বঙ্গবন্ধুর সরকার এই ন্যায্য দাবির বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভ করতে সমর্থ হন। ফলে ১৯৭৫ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ সরকার-প্রধানদের বৈঠকেও বাংলাদেশের পাওনা ও সম্পদ বণ্টনের দাবিটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। জুলাই মাসে ওআইসি’র সম্মেলনেও বাংলাদেশের পাওনার দাবিতে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখে ওআইসি। বিষয়টি নিয়ে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনেও আলোচনা হবার কথা ছিলো আগস্ট মাসে। কিন্তু  তার আগেই জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করা হয়।

এ পর্যায়ে দ্বিতীয় ভাগের আলোচনা করা যেতে পারে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে পূর্ব-নির্ধারিত পাওনার দাবি আর উত্থাপন করেনি বাংলাদেশ। জিয়াউর রহমান পাওনার দাবি প্রত্যাহারেও রাজি হয় এবং এ শর্তেই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের বৈঠকে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। শুধু তাই নয়, তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার এক প্রজ্ঞাপন জারি করে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেবার ঘোষণা দেয়। এতে সবচেয়ে লাভবান হয় পাকিস্তানি ব্যবসায়িরা, কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের মালিকই ছিলো তারা। ব্যাপক প্রতিবাদ হবার পরও বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৮ সাল থেকে কিছু কিছু পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ দেয়া শুরু করে। ১৯৭৯ সালের জুলাই মাসে সরকারের এক আদেশে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া সাপেক্ষে পরিত্যক্ত সম্পদের মালিকানা দাবি করে হাইকোর্টে রিট আবেদনের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। এই অধ্যাদেশের ফলে পরিত্যক্ত সম্পত্তির বাঙালি মালিকদের অংশ বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ফলে পাকিস্তানিরা ঢাকায় এসে জাল নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট তৈরি করে আদালতে রিট করে তাদের সম্পত্তি ফেরৎ পায় এবং তা বিক্রি করে টাকা নিয়ে পাকিস্তান চলে যায়। এরপর ১৯৭৭, ৭৮ ও ৮০ সালে তিনবার সম্পদ বণ্টনের ইস্যুতে আলোচনা করার জন্যে পরারাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের যৎসামান্য উদ্যোগ থাকলেও, তার কোনো কিছুই আলোচনার টেবিল পর্যন্ত গড়ায়নি। ১৯৮৬ সালের জুলাই মাসে পুনরায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি হয় স্বৈরশাসক এরশাদের পাকিস্তান সফরকালে, যেহেতু আলোচনার তালিকায় এটি ছিলো। কিন্তু  এরশাদকে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাব দেয়া হলে, এ বিষয়ে তিরি আর কোনো আলোচনা করেননি। পরবর্তীতে আরেকবার আলোচনার সুযোগ হয় ১৯৯০ সালের মার্চে; কিন্তু  তখনও বিহারি সমস্যা নিয়ে আলোচনা শেষ করা হয়।

তৃতীয় ভাগের আলোচনা নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাঙলাদেশে তথাকথিত গণতন্ত্রের কালের আলোচনা। ১৯৯২ সালে খালেদা জিয়া পাকিস্তানে সফর করলেও, জিয়াউর রহমানের মতোই বিষয়টি উপস্থাপনে আপত্তি জানায়। ৫২ জন সফরসঙ্গী নিয়ে পাকিস্তান গেলেও গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়ে তিনি ছিলেন স্পিকটি নট। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৯৬ সালে সম্পদ বণ্টনের বিষয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়। এ বছরের আগস্টে ৯-১১ তারিখ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব পাকিস্তানে সফরকালে বিষয়টি নিয়ে জোর দাবি তোলেন। ফলে ১৬-১৮ আগস্ট পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিবের সফরকালে তারা আলোচনা করতে বাধ্য হয়। যদিও সফলভাবে পাশ কাটানো নীতি অবলম্বন করে। ১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাকিস্তান সফর করেন বটে, তিনি উল্লেখও করেন যে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু  কোনো কাজ যে হয়নি, তা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট। এরপর আবার বিষয়টি নিয়ে সামান্য আলোচনা হয় ২০০৬ সালের ১২-১৪ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পাকিস্তান সফরকালে। আবারও তিনি বিহারিদের বিষয়ে আলোচনা করে আসেন, কিন্তু  সম্পদ বণ্টনের বিষয়টি ছিলো ফলশূন্য। এরপর সরকার বদল হয়েছে, বাঙলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় ও তা কার্যকর হয়ে চলছে, এই বিষয়ে পাকিস্তান কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত মন্তব্য করছে; কিন্তু  বাংলাদেশ সম্পদ বণ্টন ও পাওনা আদায়ে কোনো জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে না। ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর গণজাগরণ মঞ্চ দীর্ঘদিন পর বিষয়টি আবার দাবি হিসেবে উত্থাপন করে। সরকার যে এ বিষয়ে নতজানু পররাষ্ট্র নীতি অবলম্বন করছে, সেটিও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। কিন্তু  অদ্যাবধি এ বিষয়ে সরকারের কোনো হেলদোল নেই।

পাকিস্তানের কাছে আমাদের পাওনার বিষয়টি কেবলই অর্থনৈতিক নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রের ডিগনিটিও জড়িত। একদিকে এই পাওনা আদায় যেমন বাংলাদেশের জনগণের অধিকার, তেমনি এটি আদায়ের জন্যে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোও সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। মারুফ রসূল: লেখক ও ব্লগার

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top