উপ সম্পাদকীয়

পাকিস্তানের ঘোলা পানিতে মাছ শিকার

“বাংলাদেশের কাছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা (৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি) দাবি করতে যাচ্ছে পাকিস্তান”- শীর্ষক সংবাদটি পড়ার পর এ বিষয়ে কিছু খোঁজ-খবর করার চেষ্টা করি। চেষ্টার অংশ হিসেবেই আমার এক প্রবাসী বন্ধুর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলি। পাকিস্তান ইস্যুতে ওর সঙ্গে কথা বলাটা ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে তাৎপর্যপূর্ণ কেননা, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ও প্রায়ই আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করতো- “এই পাকিস্তান আর সেই পাকিস্তান এক নয়”। “কেনো নয়”- জানতে চাইলেই ও নানা রকম পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবীর নাম বলতো যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তান কর্তৃক নৃশংস গণহত্যার জন্যে ‘দুঃখিত’। তো সেরকম কিছু বুদ্ধিজীবীর প্রবন্ধ-নিবন্ধ সম্প্রতি পড়ার সুযোগ হয়েছে। তাদের লেখার মধ্যে গবেষণার নামে যে রাজনৈতিক এজেন্ডা রয়েছে, তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেন্দ্রিক ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ধারায় এক অশনি সংকেত বলেই আমার মনে হয়েছে। কারণ বর্তমান সময়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নানাভাবে গবেষণা হচ্ছে এবং প্রযুক্তির উৎকর্ষতার যুগে সেগুলো খুঁজে পেতেও আমাদের তেমন বেগ পেতে হচ্ছে না। সুতরাং ইতিহাসচর্চার মাঝেও যে রাজনৈতিক একটি দর্শনের প্রভাব আছে, এবং তারও আধিপত্য বিরাজের সুযোগ আছে- সেটি আমাদের গবেষকগণ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। ইতিহাসচর্চা এবং বাংলাদেশ-পাকিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্ক বা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মুক্তিযুদ্ধের দর্শনের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান আগামিতে কী হবে, কেমন হবে- তার অনেক কিছুই নির্ভর করছে বর্তমানে ইতিহাসের কী পরিমাণ রসদ আমরা রেখে যাচ্ছি আগামি প্রজন্মের জন্যে। না হলে এইসব পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবীদের বয়ানেই আগামি প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শিখতে হবে আর সেটাই হবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিরাজমান পাকিস্তানপন্থীদের চূড়ান্ত বিজয়। সে লক্ষ্যেই তারা কাজ করছে।
আমাদের পাওনা না মিটিয়ে পাকিস্তানিদের এই যে উল্টো পাওনা দাবি করা- এর পেছনে আমাদের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দুর্বলতা একটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু এখানেই বিশ্লেষণ শেষ করলে হবে না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিরা বর্বর গণহত্যা, বিভৎস নারী নির্যাতন চালিয়েছে; কিন্তু তারা একই সঙ্গে পরাজয় সুনিশ্চিত জেনে হত্যা করেছে আমাদের বুদ্ধিজীবী সূর্য সন্তানদের। মেধার দিক থেকে বাংলাদেশকে পঙ্গু করার বিভৎসতা তারা চালিয়ে গেছে পুরো মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস। এর বাইরেও, বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থী রাজনীতির কীট-পতঙ্গের চাষ তারা করে গেছে। ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী রাজনীতির ইতিহাসেও পাকিস্তানি চরদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। বলাই বাহুল্য, বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভাতেই পাকিস্তানি চর খন্দকার মোশতাক বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে তাহেরউদ্দীন ঠাকুরদের অবস্থান ছিলো। ফলে পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টের ট্র্যাজিক পরিণতি বাঙালিকে বরণ করতে হয়েছে এবং এই শূন্যস্থানে কার্যত এখনও আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে পাকিস্তানের কাছে পাওনা দাবির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পঁচাত্তরের পর এ বিষয়ে আর কোনো আলোচনা হয়নি। কেনো হয়নি, সে প্রসঙ্গে আমার বন্ধুর উল্লিখিত পাকিস্তানের ‘দুঃখিত’ বুদ্ধিজীবীদের দু চারটে লেখার অবতারণা করা যেতে পারে। ইসলামাবাদের ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. সাদাফ ফারুক, ড. আমেনা মাহমুদ এবং নাদিয়া আওয়ানের একটি জার্নাল গত বছরের এপ্রিল মাসে ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়া থেকে প্রকাশিত হয়। শিরোনাম ছিলো- ‘বাংলাদেশ পাকিস্তান রিলেশনস: অ্য হোস্টেজ টু হিস্ট্রি’। প্রায় আশি পাতা জুড়ে লেখা সেই জার্নালে অনেক ভালো ভালো কথার ফাঁকে তারা খুব কৌশলে ‘মুক্তিযুদ্ধের’ পরিবর্তে ‘গৃহযুদ্ধ’, ‘মুক্তিযোদ্ধা’র বদলে ‘স্যাসেশনিস্ট বা বিচ্ছিন্নতাবাদী’, ভারতের সহযোগিতাকে ‘ষড়যন্ত্র’, পাকিস্তানিদের চালানো গণহত্যাকে ‘প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে চালানো হয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তারা আইয়ুব খান বা জানোয়ার ইয়াহিয়ার সমালোচনা করছে কিন্তু ভুট্টোকে ‘রেগুলার পলিটিক্যাল ফোর্স’ হিসেবে উল্লেখ করে তার সাফাই গাইছে। তারা বলার চেষ্টা করছে, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অভিযাত্রাকে ইয়াহিয়ার বন্দুক দিয়ে ঠেকানোর সিদ্ধান্ত ভুল ছিলো এবং কথাটির সমর্থনে ফুটনোটে যে কয়টি বইয়ের নাম উল্লেখ করেছে, সবগুলোতেই আমাদের জাতির জনককে একজন ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এরকম বইগুলোর নাম উল্লেখ করলে লেখার পরিধি ছাপিয়ে যাবে। তবে একটি বইয়ের নাম বলতেই হচ্ছে, ১৯৯৫ সালে যেটি প্রকাশিত হয়েছিলো অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে, নাম: ‘ওয়ার্কিং উইথ জিয়া: পাকিস্তানস পাওয়ার পলিটিক্স, ১৯৭৭-৭৮’। কে. এম.আরিফের লেখা এই বইটি ১৯৭১ সালে প্রকাশিত ‘সংগ্রাম’ পত্রিকার কাটিংগুলোর মতোই গুরুত্বপূর্ণ। এই বইটি থেকে জানা যায় কীভাবে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশে পাকিস্তানি আজ্ঞাবহ ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করেছে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে এবং জিয়াউর রহমানের সহযোগিতায় তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দরোজাগুলো একে একে প্রসারিত করেছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, জিয়ার শাসনামলে আইএসআই’র দেয়া দিক-নির্দেশনাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিলো ‘ফরগেট অব্যাউট দ্যা ডিউস’ এবং এর সত্যতা পাওয়া যায় ১৯৮০ সালে অবসরে যাওয়া আইএসআই’র প্রধান লে. জেনারেল মোহাম্মদ রিয়াজের একটি উক্তি থেকে, যা ১৯৮৪ সালের ১৪ আগস্ট ‘ডন ওভারসিস উইকলি’কে দেয়া তার এক সাক্ষাৎকারে পাওয়া যায়। সেখানে তার দেয়া বক্তব্যের সারমর্ম হলো- বাংলাদেশ এখনও তাদের ‘আন্ডার দ্য থাম্ব’। সুতরাং পাকিস্তানের ভয় নেই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক শক্তি পাকিস্তানের অনুকূলেই থাকবে। এই পাকিস্তানি আনুকূল্যের রাজনৈতিক শক্তি কারা, তার প্রমাণ আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন আছে, তেমনি পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীদের লেখা বইপত্রেও আছে। ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর গণজাগরণ মঞ্চ যখন প্রথম পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা আদায়ে সরকারকে সোচ্চার হবার দাবি জানায় তখন পাকিস্তানের পেশওয়ারভিত্তিক গণমাধ্যম ‘ফ্রন্টেয়ার পোস্ট’ তাদের এক রিপোর্টে গণজাগরণ মঞ্চকে ‘দ্য গ্রুপ অব হকস’ উল্লেখ করে জানায় যে, আওয়ামী লীগের মতো ‘প্রো ইন্ডিয়ান লবি’ ক্ষমতায় থাকলে এমন হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। আওয়ামী লীগের শাসনামলকে পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবীরাও ‘ফেভারব্যাল পলিটিক্যাল সিচুয়েশন ফর আপরাইজিং দ্য ন্যাশনালিস্ট ফোর্স’ বলে উল্লেখ করেছে বারবার। অন্যদিকে বিএনপি-জামাতের শাসনামলকে উল্লেখ করেছে ‘ব্রাদারলি সাইড অব পাকিস্তান’। বিএনপি-জামাতের ‘প্রো পাকিস্তান ফরেন পলিসি’ বারবার হাততালি পেয়েছে পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবীদের কাছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই আওয়ামী লীগের শাসনামলেও কী আমরা উল্লেখ করার মতো শক্ত কূটনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করতে পারছি? অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, যতোটা শক্ত হওয়া উচিৎ ছিলো, ততোটা পারিনি। গণজাগরণ মঞ্চ ২০১৩ সাল থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে বাঙলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি জানায়। একই সঙ্গে পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা টাকা উদ্ধারের জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোর দাবি জানায়। কিন্তু প্রতিবারই গণজাগরণ মঞ্চের এই দাবিকে সরকার পাশ কাটিয়ে গেছে। সর্বশেষ আমরা দেখেছি, পাকিস্তানি হাইকমিশন কীভাবে কূটনৈতিক পাড়ায় থেকে জঙ্গীবাদের বিস্তার ঘটানোর জন্যে অর্থায়ন করে যাচ্ছিলো। এতোকিছুর পরও আমরা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে উল্লেখ করার মতো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখিনি। আজকে পাকিস্তান যে অন্যায্য দাবি তুলেছে, তার কারণ হলো আমাদের কূটনৈতিক দুর্বলতা। আমরা আমাদের পাওনা আদায়ে যেহেতু জোর তৎপর হতে পারিনি, সেহেতু তারা সুযোগ নিচ্ছে। বিশ্ব গণমাধ্যমে তারা একটি ‘গিমিক’ তোলার চেষ্টা করছে, যা ভবিষ্যতের জন্যে একটি ভয়ঙ্কর ঘটনা। কারণ, অদূর ভবিষ্যতে এই পাওনার বিষয়ে কথা বলতে গেলে পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবীদের মতো বাঙলাদেশের বুদ্ধিজীবীরাও ‘মানবতা’ দেখানোর তরিকা টেনে আনবেন (যেটা ক্ষেত্র বিশেষে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা খুব ভালো পারেন)। সুতরাং, এখন থেকেই বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হয়ে আমাদের পাওনা আদায়ে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক পাওনার দাবি-দাওয়াগুলো নিয়ে আমাদের গবেষণামূলক লেখা তৈরি করতে হবে। তবেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে পাওনা আদায়ের এবং পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবীদের দাঁতভাঙা জবাব দেবার প্রভাবকগুলো রেখে যেতে পারবো।
(চলমান এবং দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্ত)

 

মারুফ রসূল : লেখক ও ব্লগার

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top