উপ সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ: বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬ আইনে ‘বিশেষ ছাড়’ : কন্যাশিশুর সামাজিক মর্যাদায় ‘মূল্য হ্রাস’ এর পায়তারা বৈকি

বলা কথা
না বলা কথা

আমরা আতংকিত আমাদের কন্যাশিশুদের নিয়ে ! আমরা লজ্জিত আমাদের বিবেকহীন বুদ্ধিওয়ালাদের নিয়ে ! আমরা হতাশ আমাদের মন্ত্রীপরিষদ নিয়ে ! কারণ, মন্ত্রীসভায় বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬ খসড়া অনুমোদন পেয়েছে, যেখানে  মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছরই ধরা হয়েছে, তবে বিশেষ ধারায় ‘বিশেষ ক্ষেত্রে’, ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক’ বা ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো মেয়ের ‘সর্বোত্তম স্বার্থ’ বিবেচনায় বিয়ে হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না বলে উল্লেখ আছে। আমাদের প্রশ্ন,  ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক’ নারীর ‘সর্বোত্তম স্বার্থ’ কী ? আমরা তো বিশ্বাস করি, এই সত্য ধারন করি যে, সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করাই একজন নাগরিকের ‘সর্বোত্তম স্বার্থরক্ষা’, যেখানে কন্যাশিশুও অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু সেই  বিশ্বাসকে, অধিকারকে নস্যাৎ করে, ধূলোয় মিশিয়ে দিয়ে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬ এর খসড়া অনুমোদন হওয়া এবং  একটি দৈনিক পত্রিকায়  মুঠোফোনে মাননীয় মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক’ নারীর ‘সর্বোত্তম স্বার্থরক্ষা’র যে যৌক্তিকতা উল্লেখ করেছেন, দুঃখজনকভাবে বলতে হয় তা নিতান্তই দায়সাড়া, পুরুষতান্ত্রিকতার বহিঃপ্রকাশ এবং সর্বোপরি কন্যাশিশুর মানবাধিকার লংঘন। মাননীয় প্রতিমন্ত্রী যুক্তি দেখাতে গিয়ে প্রশ্ন করেছেন, কোনো কিশোরী পরিস্থিতির শিকার হয়ে গর্ভবতী হলে তখন তার ভবিষ্যত কী হবে? মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা রেখে জানতে চাইছি, সরকার তাহলে ‘পরিস্থিতি’ নিয়েই চিন্তিত, কন্যাশিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, অধিকার নিয়ে চিন্তিত নন ? আর তিনি কী এমন ভবিষ্যতের কথা ভাবছেন যে, যেখানে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাশিশু মা হয়ে তার সন্তান লালন পালন করবে, সংসারের ভার, ধকল সইবে, কৈশোরের উচ্ছ্বলতা হারিয়ে শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকির দিকে এগুবে, তাই কী ? অপরিণত বয়সে সন্তান ধারন, সন্তানকে লালন পালন, পরিবারের ধকল সয়ে নেয়া তো নিরাপদ ভবিষ্যত হতে পারে না। আর পরিস্থিতির শিকার কেনোইবা বলছেন, ভেবে বসে আছেন এদেশের কন্যাশিশুরা ‘পরিস্থিতি’ নামক হিং¯্রতার শিকার হবেই? কারণ, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আপনারা সক্ষম নন কখনোই এবং হবেনও না, পুরোটাই ব্যর্থ, তাই কী? আর এই অনাকাংখিত পরিস্থিতিটাই বা কী বলে ভাবছেন, বাল্য প্রেম, নাকি ধর্ষণ ?

প্রেমের ক্ষেত্রে  অনাকাংখিত গর্ভধারন একটি অসচেতন আবেগী ঘটনা, এ ঘটনা  যেনো না ঘটে, তার সুফল-কুফল ইত্যাদি বিষয়গুলোর জন্য তো রাষ্ট্রের অনেক কাজ করবার আছে এবং এই সামাজিক সচেতনতার কাজটি শুরু হবে পরিবার, বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি আনাচে কানাচে।  পাঠ্যপুস্তকে স্পষ্ঠত  উল্লেখ থাকবে, যেন শিক্ষার্থীরা সচেতন হয়ে ওঠে। আর ধর্ষণ তো একটি শাস্তিযোগ্য জঘন্যতম অপরাধ। আইনের সঠিক ও  দ্রুত প্রয়োগ, কঠিন শাস্তি নিশ্চিত করে তো এ ধরনের অপরাধ  দমন করা যায়, যা আমাদের দেশে সহজেই হয় না। বলতেই হয় বাংলাদেশে প্রচুর আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই, বিচার নেই। বিচারহীনতার কারণে  ধর্ষকদের ভেতর ভীতি কাজ করে না, ফলে লাগাতার এ ধরনের অপকর্ম ঘটে, ঘটছে। সরকার কী সচেতনতার কাজটি করবার ও ধর্ষণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবার শক্তি, ক্ষমতা হারিয়েছেন যে, কন্যাশিশুর অধিকার নয়,  ‘পরিস্থিতি’কে তাই তাঁদের প্রাধান্য দিতে হচ্ছে ? কেনো ভাবছেন না যে, এখানে এই ‘পরিস্থিতি’ বৈধতা পেতে চলেছে !

মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে সবচাইতে হতাশার জায়গাটি হল  তিনি বলেছেন, অভিভাবকহীন প্রতিবন্ধী কিশোরীর থাকার জায়গা না থাকলে ১৮ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা না করে মঙ্গলজনক মনে হলে বিয়ে দেয়া যেতে পারে। আমার পাল্টা প্রশ্ন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক শক্তি,সামর্থ  সম্পর্কে কী পরিস্কার ধারনা আছে ? পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিই বা কী প্রতিবন্ধীতা বিষয়ে, জানা আছে তো ? নিশ্চয়ই জানি যে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির যেমন সীমাবদ্ধতা আছে তার শারীরিক, মানসিক বিষয়ে, তেমনই আছে তাদের প্রতি সামাজিক সংকীর্ণতাবোধ।
অভিভাবকহীন একজন প্রতিবন্ধী কিশোরীর ¯্রফে থাকার জায়গার জন্য তাকে আমরা শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেব, নাকি আমরা ভেবে নিয়েছি একজন প্রতিবন্ধী কিশোরীর প্রতি কোনো পতিপুরুষ কামনার দৃষ্টিতে এগিয়ে আসবে না, অপ্রাপ্ত অবস্থায় সে গর্ভবতী হবে না, তাই বিয়েটাই তার নিরাপদ জায়গা ? যেখানে অপ্রতিবন্ধী কিশোরীদের কথা ভেবেই আমরা আতংকিত, সেখানে প্রতিবন্ধী কিশোরী কতটা নিরাপদ, বলুন তো ? আচ্ছা প্রতিবন্ধী কিশোরীরা কী সমাজের বোঝা যে, অভিভাবকহীন হলে তাকে থাকবার জায়গা করে দিতে বিয়েই দিতে হবে, তাহলে তো বড় প্রশ্ন এসে যায়, রাষ্ট্র কী ব্যর্থ অভিভাবকহীন প্রতিবন্ধীদের দায়িত্ব নেবার ? আমরা তো জানি বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধীবান্ধব!
ব্যাপারটি কী এমন নয় যে, চুরি করা একটি অপরাধ হলেও চোরকে চুরি করবার সুযোগ দিয়ে রাখা ? আসলে সাংবিধানিক অধিকার ভোগের চাইতে সর্বোত্তম স্বার্থ কী হতে পারে তা কোনোভাবেই বোধগম্য নয়, আর সেকারণেই সর্বোত্তম স্বার্থ নিয়ে এতসব জল্পনা কল্পনা। আশা করি বিষয়টি নিয়ে উন্মুক্ত মতবিনিময়, অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধির আদান প্রদানের স্বচ্ছ, সরল ও মহৎ সুযোগ থাকবে।

আবার এই বিশেষ ধারার অপব্যবহার বন্ধে আইনেই ব্যবস্থা থাকবে বলে মহিলা ও শিশুবিষযক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী আশ্বস্ত করতে চাইছেন। জানা যায় একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় মুঠোফোনে তিনি বলেছেন, সামাজিক অবক্ষয় রোধে আইনে এই বিশেষ ধারা থাকছে। মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানতে  চাই যে, যে দেশে আইনের সাধারণ ধারায় নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে  না প্রত্যাশানুযায়ী, সেই দেশে বিশেষ ধারায় কতটা নিরাপত্তা নিশ্চিত হবার সম্ভাবনা থাকবে? আর ধারার অপব্যবহার রোধে যে আইনেই ব্যবস্থার কথা বলছেন, সেই ব্যবস্থা কী বিদ্যমান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বাস্তবায়ন বা নিশ্চিত করবেন, যারা দায়িত্বশীল থাকতেই বিগত নয় মাসে ২৬৬জন বিভিন্ন বয়সের নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যা গড়ে মাসিক ৫২ জন? সবচাইতে বড় বিস্ময় এই যে, সামাজিক অবক্ষয় রোধে বাল্যবিবাহের বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে ! ধর্ষণ যদি সামাজিক অবক্ষয়ে একটি অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে সেই সামাজিক অবক্ষয় রোধে বিশেষ ধারায় বাল্যবিবাহের ব্যবস্থার মানে কী দাঁড়ায়, মাননীয় মন্ত্রী একটু ভেবে দেখবেন প্লিজ! এই গোপন সুযোগ গোপন অপকর্মের জন্ম দেবে কীনা ভাবুন। মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, সরকারের বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণায় বাল্যবিবাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসছে। পক্ষান্তরে মাননীয় অর্থমন্ত্রী বাল্যবিবাহ নিয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েছেন এমন সংবাদ আমরা পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারলাম। দু’জন মন্ত্রীর দু’ধরনের অনুভূতিকে যদি গুরুত্ব দিতে হয়, তাহলে তো বাস্তবতা সম্পর্কে সংশয় দেখা দেয়, সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

বারবার নারীর অধিকার, স্বাধীনতা হরণ করে নারীর নিরাপত্তা বিধানের কথা ভাবা হয়, পায়তারা করা হয়। নিঃসংকোচে বলছি, যারা এ কাজটি করেন, তারা মূলতঃ পুরুষতান্ত্রিকতা রক্ষা করেন। কিংবা আদৌ তারা অধিকার, নিরাপত্তা বিষয়গুলো বুঝেন না। আইনে ‘যদি’, ‘তবে’, ‘যেমন’, ‘বিশেষ’ ইত্যাদি শব্দগুলো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে না রাখাই বাঞ্চনীয়। কেননা ওসবে বিচারহীনতা প্রশ্রয় পেয়ে যায়। আর বাল্যবিবাহের সঠিক পরিসংখ্যাণ, কারণ জানা না গেলে, প্রকৃতার্থে আইন তৈরি সম্ভব নয়, লোকদেখানো তৎপরতা হিসেবেই রয়ে যায় সব। অপরিণত বয়সে গর্ভবতী হলে মা ও নবজাতক, দু’জনই ঝুঁকিতে থাকে, যেখানে মৃত্যুর সম্ভাবনা বেশি। এই সত্যকে এড়িয়ে সামাজিক অবক্ষয় রোধে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬ তে বাল্যবিবাহের গোপন সুযোগ করে রাখা চুড়ান্ত মানবাধিকার লংঘনের সামিল, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের সদৃশ বৈকি। আইনের ভেতর ‘বিশেষ ছাড়’ রাষ্ট্রে কন্যাশিশুর মর্যাদার মূল্যহ্রাস’ বৈকি, ভেবে দেখুন !

স্বপনা রেজা : কথাসাহিত্যিক

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top