ঢাকা ,  মঙ্গলবার, ৩ অক্টোবর ২০১৭,  ১৮ আশ্বিন ১৪২৪

আমি এবং আমরা

বিবিএস জরিপ :৮০ শতাংশ বিবাহিত নারী নির্যাতনের শিকার

  • ১৫ থেকে ৩৪ বছরের নারীরা এই নির্যাতনের সবোচ্চ হুমকীর মুখে থাকে।
  • শতকরা ৫১.৮ ভাগ গ্রামীন নারী বলেছেন তারা এই নিষ্ঠুরতার শিকার। এই হার শহর এবং জাতীয় স্তরে যথাক্রমে শতকরা ৪৮.৫ এবং ৪৯.৬ ভাগ।
  • অর্থনৈতিক শোষনের ক্ষেত্রে গ্রামীন এবং শহুরে বিবাহিত নারীদের মধ্যে খুব কমই পার্তক্য দেখা গেছে। ১২% গ্রামীন নারী এবং ১০.২% শহরের নারী এই বৈষম্যের শিকার।
  • গবেষনায় দেখা গেছে স্ত্রীকে নির্যাতনের প্রবণতা শিক্ষিত শ্রেনীতে অপেক্ষকৃত কম দেখা যায়।

সাঈদা সানী

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বি বি এস) সর্বশেষ ভায়েলেন্স অ্যাগেইনষ্ট উমেন সার্ভে, ২০১৫ শীর্ষক দ্বিতীয় জরিপের ফলাফল আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ করা হয়েছে, বি বি এসের এ জরিপ পরিচালনায় সহায়তা করে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউ এন এফ পি এ) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
জরিপ মতে বর্তমানে বিবাহিত নারীদের ৮০ দশমিক ২ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার।২০১১ সালে এ বিষয়ে প্রথম জরিপে এ সংখ্যা ছিল ৮৭ দশমিক ১ শতাংশ।
একটি সরকারী গবেষনা প্রতিবেদনে বলা হয় বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ নারী তাদের বিবাহিত জীবনের কোনো না কোনো সময়ে তাদের স্বামী অথবা স্বামীর আন্তীয়দের দ্বারা শারিরীক, মানসিক, যৌন অথবা অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বি বি এস)-এর ২০১৫ সালে করা নারীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাস জরিপে দেখা গেছে শতকরা ৫০ ভাগ নারী বলেছেন তারা শারিরীক নির্যাতনের শিকার। অন্যদিকে শতকরা ২৭ ভাগ নারী বলেছেন যে তারা যৌন নির্যাতনের শিকার, বি বি এস-এর এক জন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী গত বছর (২০১৪ সাল) ১৩ থেকে ২২ আগষ্ট ২১,৬৮৮ নারীর সাক্ষাৎকার গ্রহনের মধ্য দিয়ে গবেষনাটি পরিচালিত হয়। তিনি বলেন ২০১১ সালের সংখ্যার সাথে তুলনায় বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতন কমে এসেছে তবে শারিরীক নির্যাতনের ক্ষেত্রে তা বেড়ে গিয়েছে। গবেষনার ফলাফলে প্রকাশ যে ১৫ ভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষেরা তাদের স্ত্রীদের তাদের আচরণের উপর নিয়ন্ত্রন লাভের জন্য নির্যাতন করে থাকে।
গত ২ অক্টোবর, রবিবার রাজধানীর শেরে বংলা নগরের এন ই সি সম্মেলন কক্ষে বি বি এসের জরিপের প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বি বি এসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াজেদ। আলোচনায় অংশ নেন পরিসংখ্যান এবং তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব এ কে এম মোজাম্মেল হক, ইউ এন এফ পি এর প্রতিনিধি আর্জেন্টিনা মাতাভেল পিচ্চিন, ইউরাপীয় ইউনিয়নের রাস্ট্রদূত পিয়েরে মায়াজু প্রমুখ। জরিপের বিভিন্ন ফলাফল উপস্থাপন করেন বি বি এসের জরিপে প্রকল্প পরিচালক জাহিদুল হক সরদার।
দেশের সাতটি বিভাগের শহর গ্রাম, সিটি করপোরেশন এবং সিটি করপোরেশনের বাইরের শহরকে জরিপের আওতায় আনা হয়েছে। শারিরিক, যৌন, অর্থনৈতিক, স্বামীর নিয়ন্ত্রনমূলক আচারণ বা অনোভাবের কারনে এবং আবেগীয় নির্যাতনকে জরিপের আওতাভূক্ত করা হয়েছে।
শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পুরুষের হাতে শারিরীক যৌন বা অর্থনৈতিক নির্যাতনের চাইতে ৫৫ শতাংশ বিবাহিত নারী বলেছেন তারা নিয়ন্ত্রনমূলক আচরন বা মনোভাবের বেশি শিকার। যেমন বন্ধুর সাথে কথা বলতে না দেয়া, বাবার বাড়ি যেতে নিষেধাজ্ঞা জারি, সন্দেহ করা, আবেগ, অনুভূতির মূল্যায়ন না করা, বিনা অনুমতিতে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যেতে না দেয়া, বাইরের মানুষের সামনে হেয় বা অপমান করা, যখন-তখন স্বামীর রেগে যাওয়াসহ তার নিয়ন্ত্রনমূরক আচরণ বা মনোভাব ছিল সাধারণ বিষয়। তবে জরিপে দেখা গেছে, নারী শিক্ষার হার বাড়ার সাথে সাথে এ ধরনের নির্যাতনের সংখ্যা কমতে থাকে।
সংখ্যাগত ভাবে নির্যাতন কিছুটা কমলেও স্বামীর নির্যাতনের শিকার হওয়া বেশির ভাগ নারী (৭২ দশমিক ৭ শতাংশ) কখনোই নির্যাতনের কথা কাউকে জানাননি। কেন নির্যাতনের কথা জানাননি এ প্রশ্নের উত্তরে শতকরা ৩৯ ভাগ নারী বলেছেন, পারিবারিক সম্মানের কথা চিন্তা করে, আরও নির্যাতনের ভয়ে, স্ত্রীকে স্বামীর প্রহার করার অধিকার আছে এই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, অথবা লজ্জায় তার। বিষয়গুলো কাউকে জানাননি।
জরিপ বলছে ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীরা শারিরীক নির্যাতনের ঝুঁািকর মধ্যে থাকেন বেশি। দরিদ্র নারীদের বেশি নির্যাতনের শিকার হতে হয়। জরিপ মতে, স্বামীর হাতে নির্যাতনের ঘটনা সিটি কর্পোরেশনভুক্ত এলাকার (৫৪.৪%) তুলনায় গ্রামেই (৭৪,৮%) বেশি। সিটি কর্পোরেশনের বাইরে অন্যান্য শহরে নির্যাতনের হার ৭১ শতাংশ। রাজশাহী বিভাগে শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা বেশি। ৪১ শতাংশের বেশি নারী জানিয়েছেন জীবন ভর স্বামীর শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের করনে তাদের বিভিন্ন আঘাতের সম্মুখীন হতে হয়েছে। ২৮ শতাংশের বেশি নারীকে আঘাতের কারনে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। সব চেয়ে দুঃখ জনক, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন ৪ শতাংশের বেশি নারী।
জরিপ অনুযায়ী, আচরণগত নিয়ন্ত্রনের জন্য মানসিক নির্যাতনের শিকার ৫৫.৪% নারী, শারীরিক নির্যাতনের শিকার ৪৯.৬%, আবেগীয় নির্যাতনের শিকার ২৮.৭%, যৌন নির্যাতনের শিকার ২৭.২% এবং অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার ১১.৪%।
জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ইউ এন এফ পি এ এর প্রতিনিধি মাতাভেল পিচ্চিন বলেন, আমাদের এটা উপলব্ধি করতে হবে যে, স্ত্রীরা ক্রীতদাসী নয় এবং সবাই একত্রিত হয়ে এই নির্যাতনকে প্রতিহত করতে হবে। সময় এসেছে নিশ্চুপ থাকার চাইতে এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতীয় কর্মসূচী হাতে নেয়।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চেীধুরীর দু’জনই মনে করেন যে, দেশে গত চার বছরে বিবাহিত নারীদের নির্যাতনের সংখ্যা ৭ শতাংশ কমলেও এ তথ্যে খুশি হওয়ার তেমন কিছু নেই। কারন নির্যাতনের হার এখনো ভয়াবহই আছে।
মানব সভ্যতার প্রায় সাড়ে ছয় হাজার বছরের ইতিহাসের কাঠামো তৈরী করেছে যে পুরাণ, শাস্ত্র, ধর্মগ্রন্থগুলো, সেখানে উল্লেখ রয়েছে যে সৃষ্টিকর্তা পুরুষকে প্রথম সৃষ্টি করেছেন এবং তার জন্য তার প্রয়োজন মেটাতেই নারীকে সৃষ্টি। এই সৃষ্টি তত্ত্বের মাশুল আজও আমরা দিয়ে চলেছি।
আমরা জানি যে, জন্ম গ্রহনের পর প্রতিটি নারী-পুরুষকে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। পুরুষের সামাজিকীকরণ ঘটে তার ব্যাক্তি চরিত্রের উন্মেষ তার আর্থিক স্বনির্ভরতা এবং নারীর রক্ষক হিসাবে। অন্য দিকে নারীর সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার প্রধান প্রতিপাদ্য পুরুষকে খুশী করার যন্ত্র হিসেবে বেড়ে ওঠা। তার নৈতিক উৎকর্ষতা বিবেচ্য নয়, তার অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা তো আরও নয়; যুগে যুগে পুরুষ নারীকে যে রূপে চেয়েছে তাকে সেই ভূমিকাই পালন করতে হয়েছে। নারী মুক্তির অগ্রদূত বেগম রোকেয়া ১৯০৪ সালে মতিচূর এ লিখেছেনঃ “পুরুষের সক্ষমতা লাভের জন্য আমাদিগকে যাহা করিতে হ­ তাহাই করিব। যদি এখন স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয়, তবে তাহাই করিব,…
কণ্যাদায়ে কাঁদিয়া মরি কেন?” মেয়েদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরনের কারনেই তিনি এই কথাগুলো লিখেছেন।
আমরা বেগম রোকেয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি, নারীদের জন্য এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারিনি যেখানে তাদের অর্থনৈতিক মুক্তিকে মূল্যায়ন করা হবে শতবছরেরও আগে বেগম রোকেয়া লিখেছিলেন, নারীরা যে কোনো পেশা-বিচারক, ম্যাজিস্ট্রেট, ব্যারিষ্টার এবং এমনকি ভাইসয়র হওয়ার উপযুক্ত। বিয়ে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটা তো পুরুষ ও নারী উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কেন বিয়েকে কেন্দ্র করেই শুধু মেয়েদের জীবন আবর্তিত হবে? নারীদের পূর্ণ মানুষ হিসেবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ যদি না দেয় এবং নারী পুরুষের মানুষ হিসেবে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত না হলে কোনো উন্নয়নই যথেষ্ট বলে বা টেকসই বলে বিবেচিত হবে না। মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স কমিয়ে দেয়া নিয়ে অনেক বির্তক হয়েছে। বাংলাদেশে মেয়েদের বিয়ের বয়স ন্যূনতম ১৮ বছর হলেও, বাল্য বিবাহের হার (৬৪%) অনেক বেশি। বিয়ের মধ্যে দিয়ে একটি মেয়ে শিশুর পরিসমাপ্তি ঘটে। এর মাধ্যমে মেয়ে শিশুদের প্রতি পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ে। শারীরিক ও মানসিক অপরিপক্কতার কারনে বিবাহিত কিশোরী মেয়েরা তাদের শ্বশুর বাড়ীর প্রত্যাশা মোতাবেক দায়িত্ব পালন করতে পারে না। ফলে তারা নির্যাতনের ঝুঁকির মধ্যে থাকে। তাছাড়া বিবাহিত কিশোরীরা পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে না। ফলে পুরুতান্ত্রিক সামাজিক ধারা চলতেই থাকে। বিবাহিত কিশোরীরা অকালে গর্ভধারন করে এবং কিশোরীবধূ প্রস্তুতি ছাড়াই মা হয়ে যায়। কিশোরী মায়েরা প্রাপ্ত বযস্ক নারীদের তুলনায় গর্ভকালীন জটিলতায় বেশি আক্রান্ত হয়, তাছাড়া তাদের মধ্যে অপুষ্টির ঘটনা খুবই সাধারণ।
আবারও সেই জরিপ প্রতিবেদনেই ফিরে আসি। প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, এই অমানবিক চর্চ্চা বন্ধ করতে সরকার অনেক পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই গ্রহণ করেছেন। যেমন, নির্যাতনের শিকারদের সহায়তা কেন্দ্র, হেল্প লাইন, নীতি মালা শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মোবাইলের ব্যবহার। আমরা আশাবাদী যে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার হার উল্লেখযোগ্য ভাবে কমানোর মাধ্যমে অচিরেই আমরা সবার জন্য একটি উন্নত ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে সক্ষম হব।
প্রধান অতিথির ভাষনে পরিকল্পনামন্ত্রী এ.এইচ.এম কামাল বলেন নারীর প্রতি সহিংসতা শুধুমাত্র একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা নয়। বরঞ্চ বলা যায় এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এটা সম্পূনভাবে নির্মূল করা সম্ভব নয় কিন্তু সহিংসতার হার অন্তত:পক্ষে হ্রাস করা সম্ভব।

Views All Time
Views All Time
205
Views Today
Views Today
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top