জাতীয়

মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়ানোর প্রস্তাব পাস

বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়া ও তাদের ওপর নির্যাতন বন্ধে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর প্রস্তাব জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে।

সোমবার রাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণের পর স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে এ প্রস্তাব পাস হয়। এর আগের মাগরিবের নামাজের বিরতির পরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন সরকারি দলের ডা. দীপু মনি।

আলোচনায় অংশ নেন বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, সরকারি দলের সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবদুল মতিন খসরু, ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, ড. হাছান মাহমুদ, এ টি এম আবদুল ওয়াহাব, সাইমুম সরওয়ার কমল, জাতীয় পার্টির এবিএম রুহুল আমীন হাওলাদার, ফখরুল ইমাম, জাসদের মইনউদ্দীন খান বাদল ও শিরীন আখতার, তরীকত ফেডারেশনের সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী।

সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ১৭৪ (১)-এর আওতায় প্রস্তাব (সাধারণ)-এর ওপর আলোচনায় দীপু মনি তার উত্থাপিত প্রস্তাবে বলেন, ‘সংসদের অভিমত এই যে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অব্যাহত নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধ, তাদের নিজ বাসভূম থেকে বিতাড়ন করে বাংলাদেশে পুশইন করা থেকে বিরত থাকা এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিকত্বের অধিকার দিয়ে নিরাপদে বসবাসের ব্যবস্থা গ্রহণে মিয়ানমার সরকারের ওপর জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের জোরালো কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানানো হোক।’

প্রস্তাব উত্থাপনকালে ডা. দীপু মনি আরও বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যলঘু সম্প্রদায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অব্যাহত নির্যাতন-নিপীড়ন চরম আকার ধারণ করায় সেখানকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর লাখ লাখ লোক ইতিমধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আশ্রয় নিয়েছে। সীমান্তের প্রতিটি পয়েন্টে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নিষ্ঠুর নির্মমতার শিকার- কেউ অর্ধমৃত, কেউ গুলিবিদ্ধ, কেউ বা আবার ক্ষত-বিক্ষত হাত-পা নিয়ে কোনো মতে জীবন নিয়ে ঢলের মতো প্রতিদিন বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। রোহিঙ্গাকে আখ্যায়িত করা হচ্ছে বাঙালি সন্ত্রাসী হিসেবে। নাফ নদীতে ভাসছে সারি সারি রোহিঙ্গা লাশ। নিজ ভূমি থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে জাতিগতভাবে নির্মূলের লক্ষ্যে চালানো অব্যাহত নৃশংসতায় গর্ভবতী মা-বোন, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, বৃদ্ধ- এমনকি দুগ্ধপোষ্য শিশুকে রেহাই দেওয়া হচ্ছে না। রোহিঙ্গারা যাতে নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে না পারে তার জন্য তাদের প্রতিটি বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

দীপু মনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার মানবিক কারণে দুর্দশাগ্রস্ত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আশ্রয় দিয়েছে। তাদের খাদ্য ও চিকিৎসাসহ অন্যান্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রেখেছে।

তিনি বলেন, ঐতিহাসিকভাবেই রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের অধিবাসী। তারা ৫০০ বছরের অধিক সময় ধরে আরাকান রাজ্যে বসবাস করছে। চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে আরাকান ছিল স্বাধীন মুসলিম রাজ্য। এই সময়েই আরাকান সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়। ১৪০৪ সাল থেকে ১৬১২ সাল পর্যন্ত ১৬ জন মুসলিম সম্রাট আরাকান শাসন করেছেন। রাজা বোধাপোয়া ১৭৮৪ সালে আরাকান দখল করে তৎকালীন বার্মার সঙ্গে যুক্ত করেন। ১৯৪৮ সালে ইউনিয়ন অব বার্মা ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের সময়েও আরাকান বার্মার অংশ থেকে যায়।

দীপু মনি তার বক্তব্যে বলেন, কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদন নিঃশর্তভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিকত্ব দিতে হবে। এজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেন মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে সে জন্য আহ্বান জানায়।

তিনি বলেন, ‘এক আইলানের লাশ বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়েছিল। আজ কত আইলানের ক্ষত-বিক্ষত লাশ নাফ নদীর পানিতে ভাসছে। আমরা চাই বিশ্ববিবেক এগিয়ে আসুক। তাদের পাশে দাঁড়াক।’

রওশন এরশাদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। আশা করি এসব পদক্ষেপের পথ বেয়ে এই সমস্যার সমাধান বেরিয়ে আসবে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে তা মঙ্গল বয়ে আনবে না। তাদের ফিরে যেতে হবে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের প্রতিবেদন যথাযথ বাস্তবায়ন করারও দাবি জানান রওশন এরশাদ। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া নেত্রী অং সান সু চি কীভাবে এত অশান্তি সৃষ্টি করতে পারেন। তিনি এ বিষয়ে ভারত ও চীনের পক্ষ থেকে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের জায়গা দেওয়া হয়েছে মানুষ হিসেবে, রোহিঙ্গা বা মুসলমান হিসেবে নয়। এই রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান দরকার। এজন্য সময়ও প্রয়োজন। আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই।

সাইমুম সরওয়ার কমল মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পুরস্কৃত করা দরকার। গণহত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিচার হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী বলেন, রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির নেতা আতাউল্লাহর জন্ম পাকিস্তানে। সে এসে এখানে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠী আরাকান থেকে আসাদের দলে ভেড়াচ্ছে। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা তুরস্কেও পাঠানো যেতে পারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের। নোবেল পুরস্কার আগামীতে শান্তিতে দিতে হলে শেখ হাসিনা পেতে পারেন।

মইনউদ্দীন খান বাদল বলেন, রোহিঙ্গারা মুসলমান বলে বাংলাদেশ তাদের জায়গা দেয়নি। তারা মানুষ বলে জায়গা দেওয়া হয়েছে। এখানে যেন কোনো ভুল না হয়। সু চিসহ বার্মা মিথ্যাচার করছে মন্তব্য করে বাদল বলেন, ‘এটা সারা বিশ্বের কাছে জানানো হোক, ওরা আমাদের জাতিগোষ্ঠী নয়।’ তিনি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ‘সেফজোন’ তৈরি করার দাবি জানান। রোহিঙ্গাদের ঢালাওভাবে সন্ত্রাসী না বলার দাবি জানিয়ে মইনউদ্দীন খান বাদল প্রশ্ন রাখেন, চোখের সামনে মা-বোনকে বলাৎকার করা হলে, হত্যা করা হলে অস্ত্র তুলে নেওয়ার অধিকার কি নেই?

বাদল বলেন, ‘আমরা চাই আপনারা বাংলাদেশকে বিপদমুক্ত রাখুন। সংঘাত এড়িয়ে চলতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে জানান দিতে চাই গাঙে ভাইসা আসি নাই আমরা।’

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ইতিহাস তুলে ধরে হাছান মাহমুদ বলেন, রোহিঙ্গাদের বাঙালি বলার কোনো সুযোগ নেই। বিভিন্ন সময়ে ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। তাদের ফার্টিলিটি বাংলাদেশের দ্বিগুণ। তিনি আনান কমিশনের প্রতিবেদন বাস্তবায়ন ও সেফজোন করার দাবি জানান।

শিরীন আখতার বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে মানবিক, কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এগোচ্ছে। বিএনপি বলছে, সরকার ব্যর্থ। আমি বলতে চাই, কোথায় সরকার ব্যর্থ? বিএনপি অপরাজনীতি করতে চাইছে। রোহিঙ্গারা তাদের ভূমিতেই ফিরে যাবে।

-সংসদ প্রতিবেদক

Views All Time
Views All Time
50
Views Today
Views Today
1
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top