উপ সম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার বাংলাদেশ : প্রেক্ষিত রামু, নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জ (১০)

এবারের বিজয়ের শ্লোগান হোক

অধিকার হরণ করে ত্রাণ বিতরণ নয়

 

13924855_948985121879287_2130495411427238668_n

দেশ স্বাধীন হয়েছে পঁয়তাল্লিশ বছর, কম নয়, দীর্ঘ সময়। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ ছিল, পাক শত্রুমুক্ত হবার, একটি দেশকে স্বাধীন করবার দুর্বার এক সংগ্রাম। যে যা পেরেছে, তাই নিয়ে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের আহ্বান ছিল এই মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র, যা মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামকে বেগবান করে মাত্র নয় মাসে একটি দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, দিয়েছে পতাকা, সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষ একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ড। পরাধীনতার নাগ পাশ ছিন্ন করবার এমন দুর্বার মুক্তির সংগ্রাম ছিল শুধুমাত্র ভৌগলিক সীমা অর্জন, তা নয়। একটি স্বাধীন ভূ-খন্ডে সাংবিধানিক অধিকার ভোগ, সেই অধিকার ভোগের মধ্য দিয়ে সকল ধর্মের, বর্ণের নাগরিকদের বেঁচে থাকা, থাকতে পারার বিষয়টি সুস্পষ্ট, সুনিশ্চিত করা। অর্থাৎ পরাধীনতা থেকে স্বাধীন হবার আকাঙ্খার নেপথ্যে ছিল মূলতঃ নিজস্ব ভৌগলিক সীমার মধ্যে সংবিধান স্বীকৃত নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে নাগরিকের জীবন-যাপন, বেঁচে থাকা, বেড়ে ওঠা, প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং সামাজিক মর্যাদা লাভ করা। পাশাপাশি পাক হানাদারদের লাগামহীন গণহত্যা, ধর্ষণ থেকে জাতিকে রক্ষা করবার বিষয়টি জনসাধারণের ভেতর এতটাই প্রকট চাহিদায় পরিণত হয়েছিল যে, মাত্র নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে সকল স্তরের, সকল ধর্মের জনগণের অংশগ্রহণে দেশটা স্বাধীন করা সম্ভব হয়েছিল। বিজয়ের পঁয়তাল্লিশ বছর পর আজ প্রশ্ন, যে চেতনায় স্বাধীনতা অর্জন, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়, সেই চেতনা কতটুকু ধারন করছি আমরা জাতিগতভাবে, জাতীয়ভাবে বা রাষ্ট্রীয়ভাবে? আর এই প্রশ্নের উত্তরটাই জানান দেবে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য কতটা সম্মানিত পর্যায়ে. মর্যাদায়, সততায়, স্বচ্ছতায় বাস্তবায়ন বা অর্জিত হয়েছে, হচ্ছে এবং বলতে দ্বিধা নেই যে, আমরা অনেকাংশেই ব্যর্থ হয়েছি, হচ্ছি। ব্যর্থতার বিষয়টি যেমন সত্য, ঠিক তেমন এই ব্যর্থতায় কারোর দুঃশ্চিন্তা নেই, বিকার নেই. নেই আপাদমস্তক লজ্জা, সেটাও কঠিন সত্য। তার জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ, রামু, নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জ।

কী ঘটেছে রামু, নাসিরনগর ও গোবিন্দগঞ্জে? আমরা দেখেছি, পৈশাচিক আক্রমণে লন্ডভন্ড হয়েছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। ১৯৭১ সাল ও ২০১৬ সালের মধ্যকার পার্থক্য হল, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত পাক হানাদারদের পৈশাচিকতায় জাত ও ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতন সংখ্যালঘিষ্ঠরাও ছিল সমান আক্রান্ত, নির্যাতিত এবং দেশ ছিল তখন পরাধীন। কিন্তু ২০১৬ সালে কিছু দেশীয় হানাদারদের পৈশাচিকতায় জাত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত, নির্যাতিত এবং দেশ এখন স্বাধীন, আর এই স্বাধীনতার বয়স পঁয়তাল্লিশ বছর। মর্মান্তিক বিষয় হল, স্বাধীন দেশে জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসীন হয়ে পাকিস্তান আমলের বর্বরতার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে কেউ কেউ। আরও বেশি মর্মান্তিক বিষয় হল এই যে, এই কেউ কেউদের অন্যায়, হিংস্রতা দেখবার কেউ নেই, থাকলেও আওয়াজ নেই, দমনের দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই। ফলে সাধারণ মানুষ এখন ভেবে নিয়েছে, নিরাপত্তার বিষয়টি শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন, প্রভাবশালী ও বিত্তবানদের জন্য এবং প্রশাসন, আইনশৃংখলারক্ষাকারী বিভিন্ন সংস্থা  হল একমাত্র তাদের ভৃত্য। বলতে দ্বিধা নেই যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী হলেও, তাঁর মন্ত্রীসভায় বিরাজমান মন্ত্রীদের অনেকেই সংবিধানে উল্লেখিত এই ধারা সম্মত নন, হননা। আর সে কারণে সংখ্যালঘুদের ওপর আঘাত প্রতিহত, আঘাতের প্রতিকার করবার জোরালো দৃষ্টিভঙ্গি বা মনোভাব তাদের অনেকেরই হয় না। উপরন্তু সংখ্যালঘুদের ওপর আঘাতকে তাদের অনেকেই আমলে নেন না, নিলেও সেটার ওপর তাঁদের মন্তব্য, বক্তব্য অপরাধীকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেবার সামিল হয়, অপরাধীকে মুক্ত করবার পথ তৈরি করে দেয়। সবচাইতে দুঃখজনক বিষয় হল, মুক্তিযুদ্ধের দাবীদার রাজনৈতিক সরকার আমলের অঙ্গসংগঠনের সদস্যরা যখন এমন পৈশাচিক আচরণে লিপ্ত হন, তখন তাদের রাজনৈতিক গডফাদাররা তাদেরকে নিরপরাধী বানাবার জন্য মরিয়া হন, অপরাধীকে নির্দোষ প্রমাণ করতে সফল হন।

প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর আমাদের অর্জিত বিজয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আমরা ব্যক্তি থেকে গোষ্ঠী, গোষ্ঠী থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মৃতিচারণ করি মহান বিজয়ের ইতিহাস। শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি, শপথ নিই, দেশ প্রেমের বানী-সাজ ছড়াই দেশ জুড়ে। কী হয় এসবে? মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা জাগ্রত হয়, মহান বিজয়ের পর যে সংবিধান রচিত এ দেশের, তার মর্যাদা সংরক্ষিত হয়? জনগণ তার সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করবার কথা ভাবতে পারে, পুরোনো ক্ষত ভুলে? সম্ভবত না। আর তাই পরাধীন রাষ্ট্রের মতন এদেশের সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হয়, ধর্ষণের শিকার হয় নারী শিশু থেকে বিভিন্ন বয়সের নারী, পাশাপাশি হত্যা, গুম, নিরীহ মানুষের জানমালের নিরাপত্তাহীনতা, বিচারহীনতা ইত্যাদি তো রয়েছেই। যদি বিজয়ের পঁয়তাল্লিশ বছরের অংক কষতে বসি, তাহলে স্বাধীনতাবিরোধী, মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকরের বিষয়, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের ফাঁসি কার্যকরের বিষয় ছাড়া তেমন সফলতা দেখিনা। পাক হানাদাররা যেভাবে নারীদের ধর্ষণ করেছে, তার চাইতেও একধাপ এগিয়ে বাংলাদেশের নরপিশাচ ধর্ষকগণ। কারণ, স্বাধীন দেশের ধর্ষক আট মাসের কন্যা শিশুকেও রেহাই দেয়নি, দেয় না। পাক হানাদাররা নারীদের ধরে ক্যাম্পে নিয়ে ধর্ষণ করত, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ধর্ষণের শিকার এদেশের নারীরা পথে-ঘাটে-রাস্তায়-হাসপাতালে-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে-ঘরে-থানায় ইত্যাদি ইত্যাদি জায়গায়, পার্থক্য তো এই, তাইনা? রামু, নাসিরনগর বা গোবিন্দগঞ্জে যেভাবে সংখ্যালঘুদের ঘর বাড়ি পোড়ানো হয়েছে, লুটতরাজ করা হয়েছে, গুলিবর্ষন করা হয়েছে, সে সবের ভিডিও ফুটেজ, একাত্তরের পাক সেনাদের নির্যাতনের চিত্রের মতন অবিকল লাগে কিনা, আমি সংশ্লিষ্টদের দেখবার অনুরোধ জানাই। অনুরোধের কারণ, দেশ রক্ষার মহান ব্রত নিয়ে যারা ক্ষমতার আসনে উপবিষ্ট, যদি তাঁদের বোধোদয় ঘটে।

দুঃখ যেন না বাড়ে, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দাবীদার সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধূলিস্যাৎ হতে দেখে। এ দেশের পবিত্র সংবিধান যেন আঁধারে কেবল পুস্তক হিসেবে না থাকে। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বিজয়ের উদ্দেশ্য যিনি বোঝেন না, তেমন নির্বোধ বা বোধশক্তিহীনকে জাতির বিবেক না বানাই।

সব শেষে বলব, অধিকার ভোগের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকবার অধিকার এদেশের প্রতিটি ধর্মের প্রতিটি মানুষের। সেটা নিশ্চিত করা জরুরি, সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই ক্ষমতা বেশি, অধিকার বেশি, এটা উগ্রবাদ, পরিহার জরুরি। আর আসুন, অধিকার হরণ করে ত্রাণ বিতরণ নয়, এটা নির্মম প্রহসন। আমরা প্রহসনমুক্ত রাষ্ট্র গড়বার শপথ নিই পঁয়তাল্লিশ বছরের স্বাধীন দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে।

স্বপ্ না রেজা : কথাসাহিত্যিক

Views All Time
Views All Time
293
Views Today
Views Today
1
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top