উপ সম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার বাংলাদেশ : প্রেক্ষিত রামু, নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জ (১১)

মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার বাংলাদেশ: বদ্ধ জলাশয় না বীজের বলাকা

 

12801356_10205237032595808_8365690643804388306_n

বিজয়ের পঁয়তাল্লিশ বছর পর বাংলাদেশ আজ এক গাঢ় তরুণী। বিপন্নতার দীর্ঘ পথ সংগ্রামের ব্যাপ্ত ইতিহাসে পূর্ণ করে বাংলাদেশ আজ এসে দাঁড়িয়েছে সময়ের শালপ্রাংশু সূর্যোদয়ের সামনে। সামনে অবারিত পথ, পেছনে দার্ঢ্য ইতিহাস- বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে মুঠোভর্তি ইতিহাস আর ঐতিহ্য নিয়ে। তার রৌদ্রদগ্ধ করতলে অতঃপর অশ্রু-রক্ত গাথা; অতএব বাংলাদেশকে এই প্রশ্নটি করা যেতেই পারে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অক্ষবিন্দু থেকে কতো ডিগ্রি সরে আসার পর আজ তার দু চোখে রক্ত ও অশ্রু যুগপৎ আধিপত্য বিরাজ করে? প্রকৃত প্রস্তাবে এই প্রশ্ন নিজের কাছে এবং উত্তর সম্বন্ধে সংশয়বাদীতার দরুণ আমরা ফিরে যেতে পারি উনিশশো একাত্তর সালে- বাংলাদেশের যাবতীয় সংজ্ঞায়ন যেখানে সমাপ্ত ও সম্পূর্ণ হয়েছে। ষোলোই ডিসেম্বরে বাঙালির পারাবারপ্রতিম বিজয় তাই যতোখানি উৎসবের, তার চেয়েও বেশি রক্তঋণের; যতোখানি উদযাপনের তার চেয়েও অধিক পুনর্পাঠের প্রত্যয়ের। কারণ, মুক্তিযুদ্ধ না-দেখা প্রজন্মের একজন হিশেবে এ কথা বলা বোধ করি ধৃষ্টতা হবে না যে, গত পঁয়তাল্লিশ বছরেও আমরা নির্ধারণ করতে পারিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংজ্ঞা, রচনা করতে পারিনি মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার ইশতেহার; ফলে বারবারই আমরা ভুল পথে নির্দেশিত হয়েছি, সামরিক আর মোল্লাতন্ত্রের কাদা-জলে ফেঁসেছি এবং আজ এই সময়ে এসে মনে হচ্ছে আমরা বড্ড অভ্যস্থ হয়ে গেছি। স্বাধীনতার এতো বছর পরও বাংলাদেশ দর্শনকে আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি অথবা বলা ভালো পাকিস্তানি দর্শনকে সমূলে উৎপাটন করতে পারিনি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কেবল যুদ্ধ ছিলো না, বরং তা ছিলো একটি মানবিক দর্শনের পক্ষে মানুষের ইস্পাত-কঠিন প্রতিরোধের বিজয়। এবং আজ সম্ভবত সময় এসেছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে জাতিগত সংকীর্ণতার দায় থেকে মুক্ত করার। কারণ, স্পষ্টতই মুক্তিযুদ্ধ ছিলো অধিকার ও দর্শনের সমন্বিত লড়াই। একদিকে আমাদের অর্থনৈতিক অধিকারের জোরালো দাবি, অন্যদিকে পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক দর্শনের বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ দর্শনএর বিজয়। সুতরাং, বাংলাদেশ কেবলই একটি রাষ্ট্র নয়, এটি একটি দর্শন এবং তার প্রগাঢ় অনন্যতা তৎকালীন বিশ্বকে তো নাড়া দিয়েইছিলো, আজও পৃথিবীর যেখানেই মানুষ নিপীড়িত হয়, যেখানেই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ঘটে- তার বিরুদ্ধেই বায়ান্ন-একাত্তরের প্রেরণায় আসলে বাংলাদেশ দর্শনই ক্রিয়াশীল থাকে। এখন রাষ্ট্র বাংলাদেশ দর্শন বাংলাদেশ থেকে কতোটা দূরে, তা থেকেই বোঝা যায় আমরা খাদের কতোটা তলানিতে। আর এই তলানিতে থাকার একটি প্রাথমিক নজির হতে পারে, সদ্য-স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় চূড়ান্ত জাতিগত দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয়া। সম্ভবত এরই মোক্ষম প্রকাশ বাহাত্তরের সংবিধানের বাঙালি জাতীয়তাবাদ। একাত্তরের ষোলোই ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ভৌগলিক ও শাসনযন্ত্রে সার্বভৌমত্ব লাভ করলেও তার মনস্তত্বে বিদ্যমান পাকিস্তানি দর্শনের মূলোৎপাটন হয়নি। ফলে ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানিক স্বীকৃতি লাভ করলেও রাষ্ট্রযন্ত্রে একটি বিশেষ ধর্ম (সুন্নী ইসলাম) এবং একটি বিশেষ সম্প্রদায় (বাঙালি) অধিকতর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়। সাংবিধান স্বীকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা কার্যত আমাদের জীবনবোধে স্থান পায়নি। উল্টো শাসক শ্রেণি ও তৎকালীন বুদ্ধিজীবীদের কারও কারও কাছে এর অর্থটাই পরিষ্কার হয়নি। তাঁরা শব্দটির মূল অর্থ (ইহলৌকিকতা) পরিবর্তন করে উল্টো সকল ধর্ম সমানএই জাতীয় একটি ধারনাতে উপনীত হলেন। রাষ্ট্র এই ধারনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিলো। মূলত সমস্যার শুরু সেখানেই। ধর্ম ও রাষ্ট্রকে সংযোগবিহীন করা হলো না, বরং আরও বেশি সংযুক্ত করা হলো। ফলে রাষ্ট্রীয় সকল অনুষ্ঠানে কোরান-গীতা-বাইবেল-ত্রিপিটক হতে পাঠ আরম্ভ হলো। তৎকালীন আমলা ও বনসাই বুদ্ধিজীবীরা এটাকেই অসাম্প্রদায়িকতা হিশেবে সংজ্ঞায়িত করলেন। তারা বুঝলেন না, সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব রাষ্ট্রের না; রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে জনসাধারণের মাঝে সহনশীলতা ও মানবিকতাবোধ তৈরি হয়। বস্তুত স্বাধীন বাংলাদেশ সেটি করতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই বাঙালি এক সময় আবিষ্কার করলো, বাংলাদেশে বসবাসকারী অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর তুলনায় সংখ্যায় সে বেশি; বাঙালি মুসলমান বুঝতে শুরু করলো তার সংখ্যা বাংলাদেশে বসবাসকারী হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের চেয়ে বেশি এবং মুসলমানদের মধ্যেও সুন্নী সম্প্রদায় বুঝলো, যেহেতু শিয়া সম্প্রদায়ের সংখ্যা কম সেহেতু তাদের ব্রাত্য ভাবা চলে। সুতরাং সকল ধর্মীয় ও জাতিগত সম্প্রদায় কাগজে কলমে সমান হলেও একটি বিশেষ ধর্ম ও জাতি সমানের অতিরিক্ত। মগজে বিরাজমান এই ধারনা কোনো আদেশ বলেই দূর করা গেলো না, বরং দিনে দিনে তা আরও পোক্ত হলো। আর তার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করলো জিয়া আর এরশাদের মতো দুটো অশ্লীল, অসভ্য, বর্বর স্বৈর-শাসক। ধর্মকে ব্যবহার করে অপকর্ম আর শোষণ ধামাচাপা দেবার যে রাজনৈতিক তরিকা পাকিস্তান শিখিয়ে দিয়েছিলো, তার বাধ্য ছাত্র হয়ে এই দুই ইতর তাদের যাবতীয় ইতরামিকে জায়েজ করার অপচেষ্টা চালালো। ধীরে ধীরে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের মতো রাষ্ট্রের নাগরিকরাও সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুতে বিভক্ত হলেন এবং বর্তমান অবস্থা এই যে, রাষ্ট্রের নির্বাহি বিভাগের প্রধানও তাঁর বক্তব্যে নাগরিক শব্দের বদলে সংখ্যালঘু শব্দটি ব্যবহার করেন।

দুই

আজকাল অনেকেই আলোচনায় বলে থাকেন, মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমাদের জাতিগত ঐক্য প্রয়োজন। প্রসঙ্গত মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমাদের বাঙালি জাতির ঐক্যবদ্ধ ইতিহাসের উদাহরণও দিয়ে থাকেন তাঁরা। কিন্তু বিষয়টিকে একটু ভিন্নভাবে দেখা প্রয়োজন। আগেই বলেছি মুক্তিযুদ্ধ একটি দর্শন এবং এই দর্শনের বীজমন্ত্রে একটি মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সারা বিশ্বের বিভিন্ন জাতির বিভিন্ন মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। আবার বাঙালি জাতিভুক্ত কুলাঙ্গাররা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, বিরোধিতা করেছে বিভিন্ন পরাশক্তি রাষ্ট্রও। বস্তুত বঙ্গবন্ধু একটি দর্শনের সৃষ্টি করেছিলেন ঐতিহাসিক ছয় দফার মধ্য দিয়ে, যার পক্ষে কেবল বাঙালিরাই নয়, পৃথিবীর মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। পাকিস্তানের ভূতদর্শনের পরাজয় ঘটেছিলো, কিন্তু তার মূলোৎপাটন হয়নি কেননা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্মের মগজেও এই ভূতদর্শন বিরাজমান ছিলো। সুতরাং আজ পঁয়তাল্লিশ বছর পর বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে অবশ্য ধর্তব্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায় আমাদের দার্শনিক ঐক্যমত। এ কথা সহজেই অনুমেয় যে একাত্তরের পরাজিত দর্শন আজ আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। কেবল তাই নয়, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের ভেতরেও তাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। জিন্নাহ ধর্মকে ব্যবহার করেছিলো দেশভাগ করে পাকিস্তানের প্রধান হবার লোভে, বর্তমানে গঠনতন্ত্রে অসাম্প্রদায়িক শব্দটি লিখেও আওয়ামী লীগের অনেক রাজনৈতিক নেতা ধর্মের জিকির তোলে হিন্দু সম্পত্তি গ্রাসের লোভে। একাত্তরের শরণার্থীদের ক্লান্ত দীর্ঘ যাত্রা আজ পঁয়তাল্লিশ বছরেও অব্যাহত। রাজনীতি-সংস্কৃতি-অর্থনীতি সবক্ষেত্রেই মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খা কেবলই একটি অলঙ্কার বর্ধনকারী শব্দ-যুগল হিশেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, বাস্তবে আমরা হাঁটছি উল্টো পথে। এখন বিজয়ের এতো বছর পরে উল্টো পথে হাঁটার কারণ কী? পদার্থবিজ্ঞান বলে, কোনো বস্তুর ওপর প্রযুক্ত দুটো বল ক্রিয়াশীল হলে, সেটি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে তা নির্ভর করে ক্রিয়াশীল দুটো বলের মধ্যে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী বলের দিক কোনটি। অতএব বিরাজমান দুটো দর্শন- বাংলাদেশ দর্শন এবং পাকিস্তান দর্শনকোনটি সমাজে ও রাষ্ট্রে শক্তিশালী, তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের গতিপথ। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে একাত্তরের পরাজিত পাকিস্তানি দর্শনের দিকেই হেঁটেছে বাংলাদেশ। এ কথা ভুললে চলবে না, সেই ভুল পথ থেকে বাংলাদেশকে ফিরিয়েছে জনগণ গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। আবার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে বাংলাদেশ দর্শনের পক্ষের মানুষরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন, লড়াই করেছেন। বর্তমান সরকারের আমলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজ অনেকখানি এগিয়েছে, সফলতার সঙ্গেই এগিয়েছে। এই বিচারকে বানচাল করতে, ট্রাইব্যুনাল বাতিল করতে সারাদেশে জামাত-শিবির-হেফাজতিরা চালিয়েছে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস। অর্থাৎ পাকিস্তান দর্শনপন্থিরাও ক্রিয়াশীল ছিলো তাদের মতবাদ প্রতিষ্ঠায়। কিন্তু আমাদের যূথবদ্ধতায় ও সরকারের দৃঢ়তায় তা বাস্তবায়িত হয়নি। আবার এই সরকারের আমলেই ঘটেছে রামু ও নাসিরনগরের ঘটনা- অর্থাৎ ধর্মকে ব্যবহার করে ইসলাম ভিন্ন অন্য ধর্মাবলম্বীদের ওপর সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের পাকিস্তানি নজিরানুসরণ; ঘটেছে গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল জাতিগোষ্ঠীর ওপর নির্মম নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। বলাই বাহুল্য, তিনটি ঘটনা তলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে, ক্ষমতাসীন দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ আছে, আছে প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদ। এতোখানি কথা বলার কারণ একটাই, সে-ই পুরোনো সত্যটিই আবার তুলে ধরা যে, পাকিস্তানি দর্শন, যা পরাজিত হয়েছিলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে, গা ঢাকা দিয়েছিলো বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে, পঁচাত্তরের পর যার পুনরুত্থান ঘটেছিলো সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্রে- তা আজও প্রশাসনে, রাজনীতিতে, সেনাবাহিনীতে এমনকি আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টিতেও বিরাজমান। রামু-নাসিরনগর-গোবিন্দগঞ্জ প্রতিটি ঘটনার পরই আবার মানুষ রাস্তায় নেমেছেন, প্রতিবাদ হয়েছে অনলাইনে ও অফলাইনে, রাজপথ অবরুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু এই প্রতিবাদেও কৌশলে কাজ করেছে আমাদের সংখ্যাতত্ত্বের ইতর মানসিকতা। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী নির্যাতনের প্রতিবাদে আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত স্বীয় স্বীয় ধর্মের তকমা বাঁচিয়েছি, সাঁওতাল জাতিগোষ্ঠীর ওপর হত্যা নির্যাতনে আমরা আমাদের জাতিগত সংকীর্ণতার অসামান্য প্রদর্শন ঘটিয়েছি, এমনকি আদালত যখন রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের পক্ষে রায় দিলো, তখনও আমরা মুখে কুলুপ এঁটেছি এইটা বিশ্বাস করেই যে, এদেশের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী মুসলিম অর্থাৎ এই বিষয়ে কথা বললে আমাদের ভোটের রাজনীতি পা পিছলে যেতে পারে। অতএব আমাদের প্রতিবাদের শ্রেণিকরণ ঘটেছে এবং এটাও আমাদের সুবিধাবাদী মানসিকতারই প্রকাশ। আমাদের রাষ্ট্রও পেন্ডুলামের মতো। শাহবাগের অহিংস আন্দোলনে লক্ষ মানুষ জড়ো হলে রাষ্ট্র প্রধানের মন পড়ে থাকে সেখানে, আবার হেফাজত নারকীয় তা-ব চালিয়ে মধ্যযুগীয় তেরো দফা দিলে রাষ্ট্র প্রধান বলেন- ভেবে দেখবেন| একটি নির্দিষ্ট ধর্মের ব্যানারধারীরা সংঘবদ্ধ হয়ে সন্ত্রাস চালালেই রাষ্ট্রের মর্জি ঘুরে যায়, কারণ এই রাষ্ট্র মুক্তিযুদ্ধের দর্শনকে আর ধারণ করে না, কারণ এই রাষ্ট্র মেরুদ-হীন-কপট এবং তারপরও এই রাষ্ট্র আমাদের কেননা এর প্রতি ইঞ্চি মাটিতে একজন শহীদের পবিত্র রক্ত মিশে আছে। এই রাষ্ট্র আমরা রক্তের দামে কিনেছি, স্বজনের লাশ সরিয়ে মুক্তিযুদ্ধের দর্শন খুঁজে এনেছি। এখন রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যর্থ হতে পারে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শাণিত নাগরিক মিছিলের ব্যর্থ হওয়া চলবে না। বিজয়ের পঁয়তাল্লিশ বছর পরও দর্শনের যুদ্ধটা প্রতিদিনের- এটা ভুলে গেলেই চোখের সামনে রামু-নাসিরনগর-গোবিন্দগঞ্জের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

তিন

আমাদের করোটিতে যতক্ষণ না পর্যন্ত পরিষ্কার হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংজ্ঞা, যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা বুঝতে পারছি মুক্তিযুদ্ধের দর্শনের অন্তর্গত শক্তি, ততক্ষণ আমাদের এই দ্বিধান্বিত পদবিক্ষেপ আমাদের আরও পেছনে ঠেলে দিবে। সম্প্রদায় ও জাতিগত বিভেদের দেয়াল যত বড় হবে, মগজে মগজে ১৪৪ ধারা যতক্ষণ জারি থাকবে, ততক্ষণ মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার বাংলাদেশ আমাদের কাছে অধরাই থেকে যাবে। পাকিস্তানি প্রতিক্রিয়াশীল দর্শন যে এখনও আমাদের সামগ্রিক ইতিহাসকে কলঙ্কিত করছে, তা তো রামু, নাসিরনগর আর গোবিন্দগঞ্জের নির্মম ঘটনাগুলোতেই প্রমাণিত। প্রগতিশীল বাংলাদেশ দর্শনকে আক্ষরিক অর্থেই চেতনা ও যাপনে লালন করে আমরা কতটা লড়াই করতে পারবো, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর বাংলাদেশ। আমাদের দার্শনিক লড়াই অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াইয়েও আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত। এই আশাবাদের সাহস একাত্তরের অমর মুক্তিযোদ্ধাদের শাণিত লড়াইয়ের মানচিত্র থেকেই সঞ্চিত। মুক্তিযুদ্ধই আমাদের সার্বিক চেতনার সংজ্ঞায়ন, মুক্তিযুদ্ধের দর্শনই আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের ইশতেহার। ভূতুড়ে অন্ধকারের বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এখনও জয় বাংলাই আমাদের স্লোগান। মুক্তিযুদ্ধের দর্শনই আমাদের একমাত্র উদ্ধার মন্ত্র- রাজনৈতিক ক্রিস্টালের আঁধারে বন্দী হলেও উদ্বায়ী এবং জ্বলছেই।

মারুফ রসূল : লেখক ও ব্লগার

Views All Time
Views All Time
673
Views Today
Views Today
1
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top