ঢাকা ,  শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  ৭ আশ্বিন ১৪২৪

উপ সম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার বাংলাদেশ : প্রেক্ষিত রামু, নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জ (১২)

বাংলাদেশ এখনো ব্যর্থ যেখানে!

 

লেখার শুরুতে শামসুর রাহমানের একটা কবিতা পাঠ করা যাক।

দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে নতুন বাজার।

পুড়ছে দোকান-পাট, কাঠ,

লোহালক্কড়ের স্তূপ, মসজিদ এবং মন্দির।

দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে ঐ নয়াবাজার।

বিষম পুড়ছে চতুর্দিকে ঘরবাড়ি।

পুড়ছে টিয়ের খাঁচা, রবীন্দ্র রচনাবলি, মিষ্টান্ন ভাণ্ডার,

মানচিত্র, পুরোনো দলিল।

মৌচাকে আগুন দিলে যেমন সশব্দে

 সাধের আশ্রয় ত্যাগী হয়

মৌমাছির ঝাঁক

তেমনি সবাই

পালাচ্ছে শহর ছেড়ে দিগ্বিদিক। নবজাতককে

বুকে নিয়ে উদভ্রান্ত জননী

বনপোড়া হরিণীর মত যাচ্ছে ছুটে।

 

অদূরে গুলির শব্দ, রাস্তা চষে জঙ্গী জীপ। আর্ত

শব্দ সবখানে। আমাদের দুজনের

মুখে আগুনের খরতাপ। আলিঙ্গনে থরো থরো

তুমি বলেছিলে,

‘আমাকে বাঁচাও এই বর্বর আগুন থেকে, আমাকে বাঁচাও,

আমাকে লুকিয়ে ফেলো চোখের পাতায়

বুকের অতলে কিংবা একান্ত পাঁজরে,

শুষে নাও নিমেষে আমাকে

চুম্বনে চুম্বনে।’

 

দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে ঐ নয়াবাজার।

আমাদের চৌদিকে আগুন,

গুলির ইস্পাতি শিলাবৃষ্টি অবিরাম।

তুমি বলেছিলে,

‘আমাকে বাঁচাও।’

অসহায় আমি তা-ও বলতে পারিনি।

 

 

12144784_1021317911246404_89969862116852661_nকবিতার নাম ‘তুমি বলেছিলে।’ কাব্যগ্রন্থ বন্দি শিবির থেকে। এই কাব্যগ্রন্থে আমাদের দ্রোহকালের, আমাদের যুদ্ধকালের আরো কটি কবিতা আছে, যা ১৯৭১ সালের আগুনময় বাংলাদেশকে বুঝিয়ে দেয়, চিনিয়ে দেয়।

এটাতো কোনোভাবেই অস্বীকার করার  উপায় নেই যে, এই দেশটি একটি যুদ্ধের  মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয়েছে। সেই যুদ্ধ ছিলো মুক্তিযুদ্ধ, জনযুদ্ধও। সেই যুদ্ধে হিসাব মতে ৩০ লাখ বাঙালি প্রাণ রীতিমত বিসর্জন দিয়েছেন।  কয়েক লাখ নারীর সম্ভ্রম লুট করেছে হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। এক কোটি মানুষ ঘর-বাড়ি ছেড়ে দীর্ঘ নয় মাস ‘রিফিউজি’ হয়ে আশ্রয় নিয়েছে ভারতে। মার্চে শুরু হয়ে ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হওয়া এই যুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে।

সেই বাংলাদেশ, আজ ২০১৬ সালে দাঁড়িয়ে কেমন আছে? প্রশ্নটা মোটা দাগে! উত্তরটাও যদি মোটা-সোটা করে দেয়া যায় তাহলে বলতে হবে, নানা ঘাত-প্রতিঘাত উজিয়ে বাংলাদেশ অনেক সফলতার ভূমি ছুঁয়েছে। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশ আজকে নিজের টাকায় পদ্মা নদীর ওপর সেতু গড়ার সাহস দেখিয়েছে। খাদ্যের জন্য আর কারো কাছে হাত পাততে হয় না। না খেয়ে মানুষ মরার ঘটনা এখন ইতিহাস কেবল। উত্তর বঙ্গে ‘মঙ্গা’ বলে যে উপহাসমাখা কথাটা ছিলো তা মুছে গেছে মানুষের মানচিত্র থেকে। রেকর্ড ভেঙে ভেঙে এগিয়ে চলেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। যোগাযোগ ব্যবস্থায় নজরে পড়ার মতো গতি এসেছে। বিশ্ব পরিসরে বাংলাদেশ একটু একটু করে গুরুত্ববহ হয়ে উঠছে।  দরিদ্র থেকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর হচ্ছে বাংলাদেশের।

কিন্তু কোথাও কোথাও চরম ব্যর্থও হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ। শামসুর রাহমানে কবিতা সাক্ষ্য দিচ্ছে যুদ্ধের সময় দাউ দাউ পুড়ে গেছে মানুষের বসতভিটা। নয়াবাজার। পুড়েছে মানুষের মন।  মানুষ বার বার বলেছে- ‘আমাকে বাঁচাও’। মানুষের এই আর্তি স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও আমরা শুনতে পেলাম, দেখতে পেলাম ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার নাসির নগরের দরিদ্র হিন্দুদের মধ্যে। আমরা দেখলাম গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল পাড়ায়। ‘মিথ্যা’ দিয়ে ধর্মীয় উস্কানি সৃষ্টি করে ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হলো গরীব মানুষগুলোর। কতগুলো ধর্মান্ধ মানুষ ভেঙে ফেললো প্রতিমা। দেশ দেখলো, গোটা দুনিয়া দেখলো, এই উন্মাদনায় স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, রাজনীতিবিদরা কী নির্লজ্জভাবে পক্ষ নিলো মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের। একই সময়ে আরো একটি বাজে ঘটনা ঘটানো হলো গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল পল্লীতে। প্রশাসন, পুলিশ মিলে গরীব-খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষ সাঁওতালদের ভিটেছাড়া করা হলো। তাদের কুটিরে আগুন দেয়া হলো। পুলিশ গুলি করে মারলো দু/তিনজন সাঁওতালকে। এই সংখ্যাটা আরো বেশি বলে দাবি করছেন সাঁওতালরা।  নাসিরনগর আর গোবিন্দগঞ্জের ঘটনায় অনেক জল ঘোলা হয়েছে, এখনো থিতু হয়নি পরিস্থিতি। এখনো পত্রিকায় খরব বেরোয় দেশের কোথাও না কোথাও প্রায় প্রতিদিনই ভেঙে ফেলা হচ্ছে হিন্দুদের মন্দিরের প্রতিমা। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও অসহায় হয়ে পড়ছে অন্য ধর্মে বিশ্বাসী মানুষগুলো!

এমনতো হওয়ার কথা ছিলো না। তাহলে এটা স্বীকার করতেই হচ্ছে এসব জায়গায় চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ! এই সহজ দেখা এবং স্বীকারের মধ্যে কিছু ঘটনার দায়ও আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে আগে-ভাগে।

ঘটনা এক

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। আর রাজধানীর ভেতরে মিরপুর স্বাধীন হয় ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি। তার আগের দিন সেখানে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করতে হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের। তখন ঢাকায় উপস্থিত স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ঢাকায় অবস্থান করছে মিত্রবাহিনীও। তারপরও মিরপুর স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ করতে হয়। এই যুদ্ধের বলি হন খ্যাতিমান লেখক-সাংবাদিক-চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হান।  তো সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য মিরপুর একটি বড় ক্ষত হয়ে রয়ে গেলো।

ঘটনা দুই

স্বাধীন বাংলাদেশ, যুদ্ধে পুড়ে যাওয়া, ক্ষয়ে যাওয়া দেশটাকে যখন গড়ে তুলছেন কেবল দেশটার স্থপতি ঠিক তখন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁকে হত্যা করা হলো। কারা করলো, মুক্তিযুদ্ধে যারা পরাজিত সেই শক্তি। একই বছর নভেম্বরের ৪ তারিখ জেলের ভেতর হত্যা করা হলো জাতীয় চার নেতাকে, যাঁরা বঙ্গবন্ধুর বন্দিদশায় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। তারপর ক্যু-পাল্টা ক্যু, নানা ঘটনার পর  ক্ষমতায় এলেন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান, তারপর জেনালের এরশাদ। একাত্তরের ঘাতক দালালরা  পুনর্বাসিত হলো রাজনীতিতে। জিয়াউর রহমান, এরশাদ যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী করলেন। একই ধারায় জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সালাউদ্দিন কাদের(সাকা) চৌধুরীর মতো যুদ্ধাপরাধীদের সরকারের অংশ বানালেন। মুক্তিযোদ্ধার রক্তে রঞ্জিত বাংলাদেশ দেখলো এই ঘটনা। এই অন্যায়, দুঃশাসনের বাইরে বাংলাদেশকে আরেক দফায় অনির্বাচিত ‘আর্মিব্যাকড’ সরকার সহ্য করতে হয়েছে দুবছর। এসব ধকল কাটিয়ে  ঘুরে দাঁড়াতে বাংলাদেশকে অনেক ক্ষতি মেনে নিতে হয়েছে। অনেক হিসাব না মেলা ঘটনা, অনেক ব্যর্থতা, অনেক অনিয়মের মধ্যে অনেক বড় অর্জনও আছে আমাদের।

আচ্ছা, কেউ কি ভেবেছিলো এই দেশে, গোলাম আজম, নিজামী, সাকা চৌধুরী, মীর কাসেমদের মতো যুদ্ধাপরাধীর বিচার হবে, ফাঁসি হবে, জেলেই মরতে হবে তাদের? সেটা হয়েছে, এবং হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার অনেক অর্জনের মধ্যে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ গঠন একটি সাহসী কাজ। যুদ্ধাপরাধীদের ধরে ধরে বিচারের মুখোমুখি করে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করার ঘটনা বাংলাদেশকে নতুন মর্যাদার জায়গা দিয়েছে। অপরাধ করলে শাস্তি পেতে হয়, বাংলাদেশে নতুন করে সে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার করে শাস্তি দেয়ার ঘটনাও শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনে বড় ঘটনা।

তারপরও যখন ক্যান্টনমেন্টের মতো সুরক্ষিত এলাকায় নাট্যকর্মী তনুকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয় আর খুনি শনাক্ত হয় না, ধরা পড়ে না, যখন সিলেটে কলেজ ছাত্রী খাদিজাকে নির্মমভাবে কোপানো হয় হত্যার উদ্দেশ্যে, যখন নাসির নগরে অসহায় মানুষের ঘর-বাড়িতে আগুন দেয়া হয়, ভাঙা হয়  প্রতিমা, যখন দরিদ্র সাঁওতালদের বুকে গুলি চালানো হয়, তারও আগে গুলশানের রেস্টুরেন্টে চলে জঙ্গি হামলা, যখন বাংলাদেশ হয়ে পড়ে অনিরাপদ তখন সত্যি সত্যি প্রশ্ন জাগে তাহলে কতটা এগুতে পারলাম আমরা?

ফজলুর রহমান : সাংবাদিক

Views All Time
Views All Time
258
Views Today
Views Today
1
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top