উপ সম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার বাংলাদেশ : প্রেক্ষিত রামু, নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জ (১৩)

মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ

 

14520579_1313429158667446_5743339500598288575_n

বিজয় দিবস আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল কিন্তু রক্তচিহ্নিত একটি দিন। ১৯৭১ সালের পঁচিশে মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানের পৈশাচিক আক্রমণের বিরুদ্ধে বাঙালী যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, নয় মাসেরও কম সময়ে বহু ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে তার সফল পরিসমাপ্তি ঘটেছিল এই দিনে। জন্ম হয়েছিল নতুন এক রাষ্ট্রের- বাংলাদেশ।
একদিকে আমাদের এই যুদ্ধ যেমন ছিল মাটি ও মানুষের মুক্তির জন্য, অন্যদিকে তেমনি ছিল কতগুলো মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য। মুক্তিযুদ্ধের কালে আমাদের নেতারা স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন, বাংলাদেশের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। দেশ স্বাধীন হবার পরে তার সঙ্গে জাতীয়তাবাদ যোগ করে রচিত হয়েছিল রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি।
কিন্তু হায়! আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমরা সেসব ধরে রাখতে পারি নি। অচিরেই শুরু হয়েছিল উল্টো পথে যাত্রা। যদিও সাম্প্রতিককালে সেসব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু তার সঙ্গে রেখে দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রধর্মের বিধান। এ এক অদ্ভুত গোঁজামিল। যা কোনভাবেই কাম্য নয়।
একটা সময় সংবিধানের মূলনীতির ওপর আঘাত এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের প্রতিষ্ঠা সমান্তরালে চলতে থাকে। যার ফল আজ ভোগ করছে দেশ। আজ বাংলাদেশের সর্বত্র সাম্প্রদায়িকতার ছোবল ভয়ংকার রূপ নিয়েছে। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানের ওপর নির্যাতনের সঙ্গে দেখা দিয়েছে মুসলমানদের কোনও কোনও অংশের ওপর আক্রমণ। আহমদিয়া ও শিয়ারা তার শিকার। এখানেই শেষ নয়। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের পাশাপাশি যোগ হয়েছে মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারী ব্যক্তিবর্গের ওপর হামলা। ব্লগার, লেখক, প্রকাশক থেকে শুরু করে যাঁরাই মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চায় নিয়োজিত, তাঁদের প্রাণনাশের ঘটনাও ঘটছে অহরহ।
সাম্প্রদায়িকতার হাত ধরে এসেছে জঙ্গিবাদ। এই জঙ্গিবাদ এখন বৈশ্বিক ইস্যু। শুধুমাত্র সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণীর মানুষই নয়, বরং সমাজের সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী শ্রেণীর তরুনেরাও আকৃষ্ট হচ্ছে জঙ্গিবাদী মতাদর্শে। রাতারাতি সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে দিয়ে তারা শামিল হচ্ছে সুইসাইড স্কোয়াডে। শুধুমাত্র আইনশৃংখলা বাহিনী দিয়ে বা সামরিক কায়দায় এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এটা শুধুমাত্র আইনশৃংখলাজনিত সমস্যা নয়।

এ সমস্যা রাজনৈতিক।
এ সমস্যা সাংস্কৃতিক।
এ সমস্যা রাজনৈতিক সংস্কৃতির।

আমরা বলি, আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস। ঠিক। বলি, হাজার বছরের সংস্কৃতি আমাদের। তা-ও ঠিক। কিন্তু যে কথাটি অনুচ্চারিত থেকে যায়, তা হল, আমাদের সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাসও অনেক পুরনো। আইয়ুব-ইয়াহিয়া-জিয়া-এরশাদ-খালেদা-নিজামীর এক ফুঁৎকারেই যেমন আমাদের হাজার বছরের সামাজিক- সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিলীন হয়ে যাবে না, ঠিক তেমনি চিহ্নিত কিছু মানবতাবিরোধীকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো বা কতিপয় বিপথগামী জঙ্গিকে ক্রশফায়ার করলেই বহু বছরের পুরনো সাম্প্রদায়িকতার বীজও উপড়ে ফেলা যাবে না।
আসলে এক্ষেত্রে শর্টকাট কোন পথ নেই। এটা একটা দীর্ঘমেয়াদী লড়াই। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সাম্প্রদায়িকতার যে বীজ সমাজের গভীরে প্রোথিত, তাকে মূলোৎপাটনের জন্য লাগাতার লড়াই করে যেতে হবে। রাজধানী বা নগরে বসে নয়, এ লড়াই চালাতে হবে তৃণমূল পর্যায়ে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভেতরে নিরন্তর সাংস্কৃতিক লড়াই পরিচালনা করা ছাড়া এক্ষেত্রে মুক্তি অর্জনের পথ নেই।
আর তাই মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটি যখন ক্ষমতায়, তখন রামু, নাসির নগর বা গোবিন্দগঞ্জের মত ঘটনাগুলো ঘটে যায়।
এবারের বিজয় দিবস পালিত হচ্ছে এমন একটি সময়ে, যখন বাংলাদেশের অর্জনের কথাও আমরা না ভেবে পারি না। এককালে বাংলাদেশকে যাঁরা তলাবিহীন ঝুড়ি বলতেন, তাঁদের উত্তরসূরীরা এখন স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন যে, নানা ক্ষেত্রে এ দেশ সাফল্য অর্জন করে চলেছে।
তবে এখনও আমাদের অনেক পথ চলতে হবে সামনে। দেশের প্রতিটি মানুষ যাতে স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারে, তার মৌলিক অধিকার যাতে সুরক্ষিত হয় এবং সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য দূর হয়, সে ব্যাপারে সচেষ্ট হতে হবে।

বিপুল রায়হান : সম্পাদক, জীবন থেকে নেয়া

Views All Time
Views All Time
211
Views Today
Views Today
1
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top