উপ সম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার বাংলাদেশ : প্রেক্ষিত রামু, নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জ (২)

আকাশে থাকুক দৃষ্টি, হৃদয়ে কোটি মৃত্যু

 

_mg_7810

আমাদের অভাগা সময় আরকি! গোটা মানব জাতি যেখানে অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি তখন আমরা বাংলা নামের দেশের মানুষেরা ইতিহাসের কিছু অতি জরুরী বিষয়ের ফয়সালা নিয়ে ব্যস্ত আছি। এবং এই ফয়সালা না করে এগোনোর উপায়ও নেই। সুতরাং কাল যদি বঙ্গোপসাগরের উচ্চতা বেড়ে গিয়ে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী সব ডুবে যায় তখনও আমাকে এই পরিবেশ শরনার্থীদের ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ঢাকার রাস্তায় সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মিছিলও করতে হবে। কারন রাজ্যের ধর্মান্ধ বদ খত লোকগুলো সেদিনও নোয়াখালী আর চট্টগ্রামের ভূমিহারা মানুষদের কানে কানে মন্ত্র চিবকাবে, এই যে সাগরে সব ডুবে গেলো, এর কারন হলো ধর্ম নিরপেক্ষতা আর তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ, স্টিফেন হকিন্স থেকে শুরু করে পৃথিবীর বড়-মাঝারি সব বিজ্ঞানীরাই চোখা চোখা বাক্যে বলে দিচ্ছেন, সময় নেই…সময় নেই। মানব সভ্যতার ভবিষ্যত আর পাঁচ-সাতশো-এক হাজার বছর। সমাজতন্ত্র-ধণতন্ত্র-ধর্মতন্ত্র সব তখন পৃথিবীর পাথুরে মাটিতে ফসিল হয়ে পড়ে থাকবে ভিন গ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীর আবিষ্কারের অপেক্ষায়। যারা নানা তন্ত্রের ফসিল টসিল ঘেঁটে বেটে সিদ্ধান্ত নেবে, এই গ্রহে একদা এক আদিম ধরনের প্রাণের বিকাশ ঘটিয়াছিল।

খুব দ্রত মানব সভ্যতার পরিমাপ সূচকগুলো বদলে গেছে। বোধ হয় গত পঞ্চাশ বছরই এ ব্যাপারে আইডিয়াল। যা কিছু খারাপ, এ সময়েই ঘটেছে। ভালো আর আলোর দিকটাও এ সময়েরই ফসল। এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরন বিজ্ঞানী হকিন্সের অনুধাবন থেকে দেয়া যায়। হকিন্সের কথায়, কম্পিউটার ভাইরাসকে অবশ্যই একটি প্রাণী হিসেবে দেখা উচিত এবং যে প্রাণের জন্ম হয়েছে মানুষের হাতে এবং সেই প্রাণ মোটেই ভালো প্রাণ নয়। বাহ্! এক কথায শেষ পঞ্চাশ বছরের মানব সভ্যতার খিচুড়ির আস্বাদ পাওয়া হয়ে গেল। আলো কালো দুটোই আছে। আলোর দিকটি হচ্ছে, রোবট আর যান্ত্রিক ভাইরাসের যুগে সাম্প্রদায়িকতার বিষ নি:শ্বাস পাত্তা পাওয়ার কথা নয়। কালো দিকটি হচ্ছে, যেহেতু রোবট-বায়ো রোবট-কম্পিউটর ভাইরাস এসবই মনুষ্য সৃষ্ট জীব সুতরাং সাম্প্রদায়িকতা-উগ্র জাতীয়তাবাদ-অতি আদর্শবাদ ইত্যাদির বিশেষায়িত চিপ বানিয়ে রোবট-ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এবং সেটা হবে ভয়াবহ ব্যাপার। আজকের আইএস মার্কা একটি জঙ্গি রোবটের কথা ভাবুন! কিংবা সেই ধরনের এক কম্পিউটর ভাইরাস যেটা আপনার কম্পিউটরে ঢুকে মুহূর্তের মধ্যে সাম্প্রদায়িক কম্পিউটর বানিয়ে দেবে! নির্দিষ্ট কোনো ধর্ম বা জাতীয়তাবাদের আদর্শে পরিচালিত হবে আপনার কম্পিউটর মেমোরি। ডাটা সেভিংসে আপনি এমন কিছুই রাখতে পারবেন না যা সেই নির্দিষ্ট মতবাদের বিরুদ্ধে যায়। ইন্টারনেট ব্যবহারেও তাই ঘটবে। আপনি দেখতে-শুনতে-বুঝতে না চাইলেও সেই বিশেষ মতাদর্শের বাণী আপনার কম্পিউটর স্ক্রিনে আর সাউন্ড সিস্টেমে ভেসে ভেসে উঠতে থাকবে। আর আপনার উপর গোয়েন্দাগিরি তো করবেই। এভাবে চলতে হবে কয়েকশো বছর। তার পর আসবে চুড়ান্ত মুক্তি। উগ্র জাতীয়তাবাদ-সাম্প্রদায়িকতা-ধর্মান্ধতা-অমানবতা থেকে শেষ পর্যন্ত প্রকৃতিই আপনাকে পরিত্রান দেবে নিজে মরে গিয়ে।

সুতরাং একজন সত্যিকারের বুঝদার মানুষকে এখন লড়াই চালাতে হচ্ছে, পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষায় এবং মানবজাতি যেন অসুস্থ মতাদর্শে আক্রান্ত না হয় তার বিরুদ্ধে। দুটো সম্পর্কযুক্ত। বাজারমুখী, পণ্যকেন্দ্রীক অর্থনীতি মানব সভ্যতার বড় ধরনের ক্ষতি করেছে। এর ফলে বৈষম্য আর অসহিষ্ণুতার পাশাপাশি শহর কেন্দ্রীক যে জীবন ব্যবস্থা দাঁড়িয়েছে তা প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করার পাশাপাশি এক বেয়াড়া সংস্কৃতির লালন করে গেছে। তা হলো ভোগবাদ। এই ভোগবাদ আর বৈষম্যের মাঝখান দিয়ে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারতো প্রগতিশীল মতাদর্শ। ঘটেছে  উল্টোটা। জগৎ জুড়ে ধর্মীয় মৌলবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ ইত্যাদির আস্ফালন দেখা গেছে। দেখা গেছে ব্যক্তি নির্লিপ্ততা আর সমাজ বিচ্ছিন্নতা। এসবের প্রত্যক্ষ ফলাফল, বিভিন্ন জায়গায় নিয়মিত চলতে থাকা ঠাঠা যুদ্ধ যার ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ অপচয় হয়েছে। অন্যদিকে, উদাসমার্কা নির্লিপ্ত জীবন ব্যবস্থায় মানুষ আশ্রয় নিয়েছে পণ্য সেবায়। তাই বিলাস সামগ্রীর হালনাগাদ করতে করতে লক্ষ লক্ষ মানুষ লক্ষ লক্ষ টন কার্বন উদগীরন করে যাচ্ছে পৃথিবীর আকাশে।

এই যখন আমার বোঝাপড়া, তখন নিজেকে কোনো ইতিহাসেরই অংশ ভাবতে আর ভালো লাগেনা। মনে হয়, কি হতো যদি আমার কোনো ইতিহাস না থাকতো? আমার ইতিহাস এই মাত্র শুরু হলো। আমিই আমার ইতিহাস। সেই ইতিহাস বলছে, আমি বাংলায় কথা বলি। বাংলা মার্কা ইমোশন নিয়ে বাঁচি। শারীরিক গঠনে দূর্বল টাইপ। স্বাভাবিক মেধার প্রশ্নে খুবই উন্নত ধরনের মস্তিষ্কের অধিকারী। প্রতিবাদী এবং কাপুরুষ দুটোই। কোনো ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-জাত-পাত-বাদ এর ধার ধারি না। বিশ্বাস করি, গোটা পৃথিবীটাই আমার আবাসস্থল। দেশ বলে কিছু নেই। এ এক আদিম কনসেপ্ট। বাঙালি আর আমেরিকান বলে কিছু নেই। সবাই পৃথিবীবাসী।

আমার প্রিয় বন্ধুর তালিকায় আছে আফ্রিকার গন্ডার আর হাতিরপাল। আল্পসের কোনো এক গুহার ভেতরে আমি আর আমার পেরুভিয়ান বান্ধবী দুসপ্তাহ কাটিয়ে এসেছি। ইলেকট্রিসিটি বর্জিত রাতের আকাশের ছায়াপথের দিকে তাকিয়ে থেকে ভেবেছি, ঠিক কোন ধরনের গ্রহে আমাদের উত্তর পুরুষেরা আবার আবাস আর আবাদ গড়বে।

কিন্তু এ কি আর হওয়ার আছে! যে ভূমিতে হামাগুড়ি দিয়ে বড় হয়েছি, সেই মাটি যে কয়েক কোটি মানুষের বেকার মৃত্যুর ভার বহন করে চলেছে। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে এক কোটি অসহায় মানুষ  স্রেফ না খেতে পেয়ে মরে গেছে। কয়েক লক্ষ নিরপরাধ মানুষ মরেছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আর দুর্ভিক্ষে মাত্র সত্তর আশি বছর আগে এই বাংলাতেই। তারপর ১৯৭১। আরও তিরিশ লক্ষ মানুষ মরলো মুক্তির জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে। এত মানুষের আত্মদান যে আমার ডিএনএ সিকোয়েন্সে লেখা হয়ে আছে! এ অস্বীকার করে সামনে তাকানো যায় কি?

তাই আজকের মেয়েটিকে আর ছেলেটিকে বলি, হে বন্ধু, তোমার চক্ষু তোলো আকাশের দিকে। দৃষ্টি ছড়াও মেরুজ্যোতি অবধি। কিন্তু মনের গহীনে বেদনার সুরটাকে হেলা করো না কারন ওটাই তোমার ইতিহাসের শক্তি। সেখানে কয়েক কোটি মানুষের আশির্বাদ পাবে তুমি।

অনল রায়হান : লেখক, সাংবাদিক, শহীদ সন্তান

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top