উপ সম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার বাংলাদেশ : প্রেক্ষিত রামু, নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জ (৩)

              মুক্তিযুদ্ধের পরিচয়

_mg_7866

আমরা ছিলাম ভাঙ্গা রেকর্ড। একই কথা বলে চলছি। সেই ৭১-এর কথা, সেই বাবার কথা, সেই বিচার না পাবার কথা, সেই রাজাকারদের অপরাধের কথা- চার দশক ধরে। আমাদের ব্যঙ্গ করা হতো বার বার মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি দেখে। আজ যে সবাই সেই মুক্তিযুদ্ধের কথাই বার বার শুনতে চায়, ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে, তরুণ প্রজন্ম যে জানতে চায় আমাদের বাবাদের কথা – মাঝে মাঝে অবাক লাগে। অথচ, আমি যখন স্কুল- কলেজে পড়েছি, সেই আশির দশকে, তখন মুক্তিযুদ্ধ কোন আলোচ্য বিষয়ই ছিল না। বন্ধুবান্ধবদের দেশ নিয়ে ভাবতে কখনো দেখি নাই। জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধ ছিল বিকৃতভাবে উপস্থাপিত, স্কুল-কলেজে ছিল নিষিদ্ধ। আজ এই গণজাগরণ পরবর্তী বাংলাদেশে তরুণেরা হয়ত কল্পনাই করতে পারবে না সেই দিনের পরিবেশ। আজকের তরুণেরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তারা কতটা উদ্দীপ্ত, সেটা জানাতে তরুণেরা গর্ব বোধ করে। অথচ, আমাদের কৈশোরে ঠোঁট উল্টে মুক্তিযুদ্ধকে অবমাননা করে কথা বলা, মুক্তিযোদ্ধাদের ছোট করা, আর রাজনীতি ঘৃণা করিজাতীয় কথা বলতেই সবাইকে বেশি দেখেছি। যারা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতো সেই দেশপ্রেমিক মানুষগুলোর দিকে ভ্রুকুটি নিয়ে তাকিয়ে বলা হতো রুশ-ভারতের দালাল৭৫-এর পর থেকে রাষ্ট্র ছিল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠী দিয়ে পরিচালিত, রাজাকাররা ছিল ক্ষমতার শীর্ষে- সেই অবস্থায় আমরা আর কি আশা করতে পারি? তখন সত্যিই বড় একা লাগতো।

আজ অবশ্য ঠিক বিপরীত পরিস্থিতি। আজ দেখি সবাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ঝাণ্ডাবাহী। অবাক বিস্ময়ে ভাবি, এরা এতদিন কোথায় ছিল? ভাবি, হয়ত ভয়ে এতো দিন বলে নি, এখন সাহস পেয়ে বলছে। ভালই লাগে দেখতে যে আজ সবাই নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলতে গর্ব বোধ করছে। যেই দেশে একদিন মুক্তিযুদ্ধ ছিল নিষিদ্ধ শব্দ, আজ আবার আপন গৌরবে তা ফিরে এসেছে স্বমহিমায়। কিন্তু একটু বিচলিতও লাগে। মুক্তিযুদ্ধকে অসৎভাবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে যদি কেউ নিজের পরিচয়ে মিথ্যা আবরণ দেয় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক হিসেবে, যদি কোন বিরুদ্ধ পরিস্থিতি আবার আসে, তারা কি তখন আবারও রং পাল্টে ফেলবে না? নিশ্চয়ই ফেলবে। এতো কি সহজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজীবন ধারণ করা? মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ রক্ত দিয়ে অর্জিত, একে হৃদয়ে-মননে পরিপূর্ণভাবে ধারণ করতে হয়, অনেক ত্যাগের মাধ্যমে তার যোগ্য হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে হয়। তাই আজ চার ধারে অনেক কিছুই শঙ্কা জাগায় শত্রু ঘরে ঢুকে যাচ্ছে না তো? নকল থেকে আসলের পার্থক্য করি কিভাবে?

সবচেয়ে বেশি আশংকা লাগে আমার আওয়ামী লীগকে নিয়ে। সুশীলরা যাই বলেন না কেন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে বাস্তব ভিত্তি দিতে হলে অন্যতম প্রধান হাতিয়ার আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহনের সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম এই দলটি। একটি বৃহৎ দলের লাখো মানুষের কর্মকান্ডের আলোচনা-সমালোচনা থাকবেই – তবু ইতিহাস এই যে, এই দলটিই মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে সোচ্চার থেকে চার দশক যারা রাস্তায় আন্দোলন করেছেন, তাঁরা জানেন এই বিচার বাস্তবে রূপ নেবার জন্য আওয়ামী লীগের ইস্তেহারে এর অন্তর্ভুক্তি কতটা জরুরী ছিল। তাই বার বার তাদের কাছে ফিরে ফিরে যাই – মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সোনার বাংলা পাবার আশায়।

কিন্তু আজ এই সুদিনেই যেন দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরছে বেশী করে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দাবীদার কিছু মানুষের বিভিন্ন কর্মকা- দেখে আঘাতে আঘাতে হৃদয়টা জর্জরিত হয়, প্রশ্ন জাগে মনে এরা কি সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ কি তা জানে? আমাদের চার মূল নীতি চারটি ছোট শব্দ খুব স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করছে আমাদের মূল পরিচয়। কিন্তু এই চারটি শব্দকে হৃদয়াঙ্গম করা যেমন কঠিন তার চেয়েও কঠিন জীবনের চলার পথে সেই আদর্শে অবিচল থাকা। যখন দেখি আওয়ামী লীগের কোন নেতা কোন হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে বলছে মালাউনতখন তার সাথে একজন বিএনপির বা জামাতের সমর্থকের পার্থক্য কোথায় থাকে? শুনতে পাই সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখলের ক্ষেত্রে অসাম্প্রদায়িক আওয়ামী লীগের সমর্থকদের দৌরাত্ম নাকি অন্য কারো চেয়ে কম নয়। তাহলে আর অসাম্প্রদায়িকতার শ্লোগান দেয়ার মানেটা কি? শুধু ভোটের রাজনীতির জন্য? যখন দেখি মুক্তিযোদ্ধার গায়ে আঘাত করছে আওয়ামী লীগের এমপির লোকজন- তখন হতবিহবল হয়ে পড়ি। এরা কি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া সেই আওয়ামী লীগের লোক? এদের কি মনে আছে আওয়ামী লীগে তাদের পূর্বসূরীদের নাম ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম? এই উত্তরাধিকারের যোগ্য হবার জন্য কি পরিমাণ আদর্শিক উচ্চতা দরকার এরা কি তা বোঝে?

ফুলের মালা দিয়ে দলে ঢোকানো হচ্ছে চিহ্নিত জামাত শিবিরের সদস্যদের। বলা হচ্ছে এটা সরকারের সফলতা যে এরা দল বদল করছে। এই যুক্তি যারা দেখাচ্ছেন তারা কি এতই বোকা? সত্যি কি এরা ভাবছে যে, একবার যে ব্যক্তি জামাতের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে দীক্ষিত হয়েছে, সে কখনও অসাম্প্রদায়িকতার উদারতা শিখতে পারবে? নাকি উল্টো এরা আওয়ামী লীগের ভিতরই সাম্প্রদায়িকতার বিষ ঢুকিয়ে দিবে? মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করার জন্য রক্তের ভিতর সেই শিক্ষার উত্তরাধিকার থাকতে হয়, বুকের ভিতর দেশপ্রেমের মাদকতা থাকতে হয়, সেই মার্গের মেধা ও মনন থাকতে হয়, ইতিহাসের পাঠ থাকতে হয়। নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বলে পরিচয় দেবার জন্য অনেক ত্যাগ করার মত সাহস ও মন থাকতে হয়। মুক্তিযুদ্ধের পবিত্র পরিচয়ের অংশীদার হওয়ার জন্য আদর্শিক সেই দৃঢ়তা ও স্বচ্ছতা থাকতে হয়। এই দলবদল করা সুবিধাবাদীরা কি কখনও অনুভব করতে পারবে কি বিরুদ্ধ পরিস্থিতিতে, কত ত্যাগের মধ্য দিয়ে, কত লোভকে পায়ে ঠেলে, কত আঘাত সহ্য করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষগুলো তাদের আদর্শিক পবিত্রতা রক্ষা করেছেন?  

আপোষ করে কোন দিন কোন লাভ হয় না। একটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এ দেশের জন্ম। রাজনৈতিক যুদ্ধের জয়ের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে এই স্বাধীন দেশ। কিন্তু ৭৫ আমাদের এক নিষ্ঠুর ঝাঁকি দিয়ে শিখিয়ে দিয়ে গেছে এই স্বাধীন দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে, কখনই তা বন্ধ হয়নি। আমাদের আদর্শিক যুদ্ধ চলছে এখনও। আজকের যে মুক্তবুদ্ধির লোকগুলোর স্কন্ধে চাপাতির আঘাত নেমে আসছে তা কি ৭১-এর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা নয়? আজকের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী কার্যক্রম আমাদের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য সংগ্রামেরই অংশ। এ লড়াইয়ে জিততেই হবে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ পাবার জন্য। আর যেখানে যুদ্ধ হচ্ছে বাস্তবতা, সেখানে যে কোন ধরণের আপোষ হবে আত্মঘাতী। এই কথাটা স্পষ্টভাবে সকলকে অনুধাবন করতে হবে। নেতৃত্বের পর্যায়ে ছোট ছোট আপোষের ঢেউ তৃণমূলের মানুষের কাছে সুনামীর মত আদর্শিক বিপর্যয় নিয়ে আসে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নেতৃত্বের সেটা অনুধাবন করতে হবে। মন্ত্রী- এমপিরা স্বজনপ্রীতির জন্যই হোক, দুর্নীতির কারনেই হোক বা তৃণমূলের রাজনীতিতে টিকে থাকার বাস্তবতার জন্যই হোক – যে কারণেই আপোষ করেন না কেন, তা আমাদের মূল ভিত্তিতে আঘাত করছে। একদিন যদি এই নড়বড়ে ভিত্তিতে গড়া ইমারত ভেঙে পরে আপনারা নিজেরাও বাঁচতে পারবেন না। এটা বুঝতে হবে।

আমার মনে আশা জাগায় শুধু তরুণ প্রজন্মের যোদ্ধারা। এরা বিকৃত ইতিহাসের কলুষিত সেই অন্ধকার যুগ দেখেনি। না দেখা মুক্তিযুদ্ধকে এরা প্রাণ দিয়ে ভালবেসেছে। তারুণ্যের সততা আর আবেগ নিয়েই মুক্তিযুদ্ধকে জানতে চায়। তাই আজ তাঁরা আমাদের মত শহীদ পরিবারকে খুঁজে নেয়। বার বার জানতে চায় রক্তের অক্ষরে লেখা ইতিহাস। তাই আজ তাদের কাছে বার বার বলি আমাদের পিতার কথা, মায়ের কথা, দেশের কথা, বঙ্গবন্ধুর কথা। এরা আমাদের ভাঙ্গা রেকর্ড‘-কেই শ্রদ্ধা আর কান্না মিশিয়ে বার বার শোনে। ওদের আবেগ আমাদের অতীতের সব লাঞ্ছনার বেদনা মুছে দেয়। আজ তরুণদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভাবনার স্বচ্ছতা ও আগ্রহ আমাকে উদ্দীপ্ত করে আরও বেশী করে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে। ওরা ডাকে বার বার, আমি বুকের শোক চোখের পানিতে ব্যক্ত করে বার বার তাই বলে যাই এই দেশের জন্মের করুণ গাঁথা। এভাবেই সারাজীবন বলে যেতে চাই। এটাই এখন আমার আশা, এটাই এখন আমার স্বপ্ন। ওদের জানিয়ে যাবো দেশের কথা, মুক্তিযুদ্ধের কথা, শহীদের কথা, বীরাঙ্গনার কথা। বলে যাবো বঙ্গবন্ধুর কথা, জয় বাংলার কথা। শুধু পরিসংখ্যান নয়, ইতিহাসের ঘটনাপঞ্জির পিছনের কান্নার কথা। সেটাই জানাতে চাই তরুণ প্রজন্মকে। ওরা জানুক ওদের আজকের গর্বিত আনন্দে উদ্বেলিত, স্বপ্নময় জীবনের জন্য একজন ডাঃ আলীম চৌধুরী তার জীবন হাসিমুখে দান করেছেন, একজন শ্যামলী চৌধুরী তার সারা জীবনের রঙ মুছে ফেলেছেন আর আমার মত এক বাবাহারা মেয়ে দেশের প্রতিটি মানুষের মুখে বাবাকে খুঁজে ফিরেছে আকুল হয়ে। ওরা জানুক এই দেশ অনেক কষ্টে পাওয়া, অনেক রক্তের দামে অর্জন করা। ওরা গর্বিত হোক, ওরা অহঙ্কারী হোক, মুক্তিযুদ্ধের যথার্থ পরিচয়ে ওরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াক বিশ্বের দরবারে – ওদের প্রাপ্তিতেই নিহিত রয়েছে আমাদের সব হারানোর স্বার্থকতা।

ডাঃ নুজহাত চৌধুরী, চিকিৎসক, শহীদ সন্তান

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top