উপ সম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার বাংলাদেশ : প্রেক্ষিত রামু, নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জ (৪)

             মনুষ্যত্ব

 

1797365

লেখার অবতারণাতেই আত্মপক্ষ সমর্থন। নিজেরই কয়েক বছর আগের একটি লেখা থেকে কিছু কিছু ধার নিয়েছি – প্রাসঙ্গিক বলেই। ধর্মের নামে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে যে খণ্ডিত বঞ্চিত পূর্ব পাকিস্তানী হিসেবে আমাদের একসময় পরিচিত হতে হয়েছিল, তা আমাদের সত্যিকার পরিচয় নয়। পূর্ব বঙ্গের দেশপ্রেমী ও রাজনীতি সচেতন বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, রাজনীতিবিদ বাঙালিরা সেই ১৯৪৭-এর পর থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সোনার বাংলার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে, বাংলা ভাষাকে ও কৃষ্টিকে সু প্রতিষ্ঠা এবং অনেক সময় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে আপ্রাণ ও নিরলস চেষ্টা করে গেছেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এক ধরনের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক আপাতঃ মুক্তি পাই বটে আমরা।

কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ আসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ সৃষ্টির স্বপ্ন মুনীর চৌধুরীরা দেখতেন, যার জন্য লড়তেন, লিখতেন, এই ২০০০-এর দশক ও তার পরে এই ২০১৬তে দাঁড়িয়ে যখন বারবার ধর্মের নামে পবিত্র উপাসনালয় অপবিত্র করে লণ্ডভণ্ড করা হয়, তখন বাঙালি হিসেবে আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি না। দাঁড়াতে ইচ্ছে হয় না। বিশেষ করে যখন দেখি বাঙালির বিরুদ্ধে এই শয়তানির প্রচ্ছন্ন সমর্থন দেয় প্রশাসন, তা যে সরকারের আমলেই হোক। সকল শহীদের রক্তে ভেজা বাংলার মাটিতে যারা ধর্মের নামে রক্ত ঝড়ায়, মন্দির আক্রমণ করে, পূজামণ্ডপ ভেঙে দেয় – ধিক সেই মানুষগুলোকে। আমি আমার শহীদ বাবার নামে তাদের অভিশাপ দিলাম।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি দেশের যুগ যুগের আচার, রীতি, রিচুয়ালই তাঁর জাতিগত সত্ত্বাকে, পরিচয়কে স্পষ্ট করে তোলে বল মনে করি, ধর্মীয় পরিচয়কে নয়। দেশে বা বিদেশে আমার পরিচয় প্রথমে বাঙালি, তারপর বাংলাদেশী, তারপর অন্য কোন দেশের নাগরিক হলে সেই দেশী, তারপর আমার ধর্মীয় পরিচয়। অন্য পরিচয়গুলো নিয়ে সংশয় থাকলেই ধর্মীয় পরিচয়কে মূখ্য করে এর মাঝে আত্ম পরিচয় খুঁজতে চেষ্টা করে অনেকেই। সেই ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে সংশয় বা অতি ভক্তি থেকে আবার কেউ কেউ ঝুঁকে পড়ি ধর্মীয় উন্মাদনা, গোঁড়ামি, মৌলবাদ বা চরমপন্থি ধারণার দিকে। বাংলার একটি আদি বচন অতি ভক্তি চোরের লক্ষণএই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। পরিচিত বা সমাজে প্রতিষ্ঠিত কেউ কেউ আছে যারা প্রকাশ্যে ধর্মপ্রাণ হলেও আড়ালে অনেক অপকর্ম করে বেড়ান যা কোন ধর্মেই সমর্থনযোগ্য নয়। প্রকাশ্যে ধর্মপ্রাণ মানুষ সকলেই সন্দেহভাজন যেমন নন, তেমনি এরকম দ্বিচারী মানুষ একেবারেই নেই তাও নিশ্চয়ই ঠিক নয়।

এই ধর্মীয় দ্বিচারিতা, সৎ-অসৎ, ন্যায়-অন্যায়, ভাল-মন্দের স্ববিরোধী সহাবস্থান বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ও মহাদেশের বহু বছরের ইতিহাসের অংশ। ধর্ম প্রতিষ্ঠা বা রক্ষার নামে মানুষকে নিপীড়ন, হত্যা, সম্পদলুট, যৌনাচার-এর মত সামাজিকভাবে স্বীকৃত অন্যায়গুলো কোন একটি দেশ, অঞ্চল, সময় বা ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ কখনও ছিলোনা, আজও নেই।

বাংলাদেশে সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ধর্মশব্দটির ব্যাবহার আরও ব্যাপক। বিলেতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স পড়ার সময়ে বাংলাদেশে সামাজিক ও পারিবারিক জীবনযাত্রায় ধর্মের প্রভাব নিয়ে কিছু গবেষণাপত্র পড়ছিলাম, পাঠ্যক্রমে একটি পেপার লেখার জন্য। দেশী-বিদেশী বেশ কিছু সমাজ বিজ্ঞানী ও গবেষক উদাহরন দিয়ে দেখিয়েছেন, গ্রাম অধ্যুষিত বাংলায় ধর্ম বলতে বোঝায় ব্যক্তি বা সামাজিক দৈনন্দিন জীবনে নৈতিক সুশৃঙ্খলতা। ধর্ম শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত শব্দ ধর থেকে, যার অর্থ কোন কিছু রক্ষা বা সমর্থন করা। বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে যে অর্থে ধর্ম কথাটি ব্যবহৃত হয়, তার ইংরেজি প্রতিশব্দ রিলিজন নয়। প্রচলিত অর্থে বাংলায় ধর্ম কথাটি যেমন আন্তঃধর্মীয়, তেমনি আন্তঃসাংস্কৃতিক। অর্থাৎ বিভিন্ন ধর্মের মূলনীতি, আচারাদি/রিচুয়াল মিলেমিশে আছে ধর্ম কথাটির অর্থ আর চর্চার মধ্যে। এর মধ্যে নিহিত আছে সমাজে মানবতাবোধ, কল্যাণ, যত্ন নেওয়া আর নৈতিক সুশৃঙ্খলতা।

তাঁদের ব্যাখ্যার একটি অর্থ করছি আমি এইভাবে যে অনেক সময় এক ধর্মের প্রচার ও প্রাধান্য দিতে গিয়ে অন্য ধর্মকে অবজ্ঞা-অসম্মান করা হয়েছে যুগে-যুগে। কিন্তু বাংলার মানুষ প্রচারিত সকল ধর্মের মূলমন্ত্র – মানবিকতা, সহনশীলতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চর্চার মাধ্যমে সবার ওপরে মানব ধর্ম’-কে প্রাধান্য দিয়েছে তার পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে। তাই সামাজিক অনেক রীতি-নীতি, আচার-অনুষ্ঠানের মাঝে কোন একটি বিশেষ ধর্ম নয়, বরং একাধিক ধর্মের মিলন ঘটেছে।

যখন হিন্দু নারীরা কপালে সিঁদুর পড়েন, টিপ দেন, তখন মুসলমান নারী শাড়ি, টিপ পড়লেই তা হিন্দুয়ানা নয়। টিপ দেয়া হিন্দু বা মুসলমানের ব্যাপার নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির অংশ। ঠিক তেমনি ঈদ এবং পূজাতে হিন্দু-মুসলিম সবাই ছেলেরা পাঞ্জাবী পড়ি, মেয়েরা শাড়ি পড়ে। আবার পহেলা বৈশাখে হিন্দু-মুসলিম, ছেলে-মেয়ে অনেকেই ধুতি পড়ছে। ঠিক তেমনি ঐতিহ্যবাহী বাঙালি বিয়ের অনেক অনুষ্ঠান, আচারাদি নানা ধর্মের থেকেই আহরণ করে বাঙালি বিয়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তৈরি করেছে। গায়ে হলুদ দেয়া, ফুলের গহনা দিয়ে কনে সাজানো, থরে থরে বাটি সাজিয়ে হবু কনে বা বরকে মিষ্টিমুখ করানো, বিয়ের পর কনের গৃহ প্রবেশের সময় বরণ করে নেয়া থেকে শুরু করে আরও অনেক আচারাদি আমাদের বাঙালিত্ব, আমাদের মনুষ্যত্ব।

এই সার্বজনীন ধর্মীয় অনুভূতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। আমরা বাংলাদেশে যে অসাম্প্রদায়িকতা নিয়ে সাংবিধানিক খেলা খেলি, বিতর্ক করি, তার শেকড় ১৯৭২-এর সংবিধানে নয়, বরং বাংলাঅঞ্চলের আদি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মধ্যে নিহিত। আদি এবং মধ্য যুগে বঙ্গ বা বাংলা অঞ্চল শাসন করেছে হিন্দু এবং বৌদ্ধ রাজাবৃন্দ। যেমন অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বাংলা শাসন করেছে পাল বংশের বৌদ্ধ রাজারা। আবার দশম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে যে পাল, চন্দ্র, বর্মণ, সেন রাজারা শাসন করেছেন, তাঁদের মধ্যে বৌদ্ধ এবং হিন্দু, উভয় ধর্মের প্রভাব ছিল। তাঁদের শাসনামলে ও প্রভাবে বাংলায় শুধু হিন্দু আর বৌদ্ধ ধর্মের চর্চাই ছিল।

বাঙালিদের মাঝে ইসলাম ও সুফীবাদের প্রচার ও প্রসার শুরু হয় দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বিভিন্ন সময়, যখন তুর্কী ও আফগান সেনারা বাংলা অঞ্চল জয় করে। ইসলামের খলিফা ধারণার আদলে স্বাধীন বাংলায় প্রথম মুসলিম নবাব শাসন করেন চতুর্দশ শতাব্দীতে। তারও পরে আসে মুসলিম মুঘল সাম্রাজ্য, যখন ইসলামের প্রসার আরও বাড়তে থাকে।

কিন্তু তারপরেও, অষ্টাদশ থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রজ্যের শাসনামলেও অবিভক্ত বাংলায় হিন্দুত্ম বা ইসলাম, কোনটারই একচ্ছত্র প্রাধান্য ছিলনা। ইতিহাস এবং রাজনীতির পাতায় খোদ ব্রিটিশ শাসক এবং সে সময়গুলোর বাঙ্গালি-অবাঙালি রাজনৈতিক নেতারা বিশেষ করে এই দুই ধর্মের বিভাজন ও ভৌগলিক-রাজনৈতিক সীমারেখাগুলো নির্ধারণ করে বাঙলার ঐতিহ্যগত চর্চাগুলো আজীবনের জন্য পাল্টে দিয়েছেন (তবে শেষ করেননি বা করতে পারেন নি)। একটি হল বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বঙ্গভঙ্গ, আরেকটি হল বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ভারত বিভাগ। এর মধ্য দিয়ে পূর্ব এবং পশ্চিম বাংলায় যথাক্রমে হিন্দু এবং মুসলমান জনগনের প্রাধান্য সৃষ্টি হল কৃত্রিমভাবে। অবিভক্ত বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ মানুষগুলো এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে চলে গেল আর সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘুর ধারনাটি প্রকট হল। তারও পরে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ইসলাম ধর্মের প্রাধান্য বিস্তার ও বিশুদ্ধতা রক্ষার চেষ্টায় বীভৎস আয়োজনে লিপ্ত হল তৎকালীন শাসক পশ্চিম পাকিস্তান এবং তাদের অনুসারী মুসলিম মৌলবাদী বাঙালিরা।

স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ তার পূর্বসূরিদের মতই মুলতঃ শান্তিকামী, মঙ্গলকামী, সকল ধরনের মানুষের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী। তাঁরা মানবিকতায়, তাঁরা মনুষ্যত্ববোধের আদর্শে লালিত। কিন্তু সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে যেভাবে ধাপে ধাপে বাংলা এমনকি পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশেও নানা ধর্মের এবং নানা ধরণের সংখ্যালঘুদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রভাব ও চাপের সংস্কৃতি বাঙালির রক্তে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে, তা থেকে কখনোই বাংলাদেশ অতীতের সার্বজনীন অসাম্প্রদায়িক বাংলায় হয়তো পুরোপুরি ফিরে যেতে পারবে না। থেকে থেকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প বাংলাদেশকে দংশন করবে। সেজন্যই ফিরে ফিরে আসে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ, বৌদ্ধমন্দির ভাংচুর, আহমদীয়া সম্প্রদায়কে একঘরে করার চেষ্টা, আদিবাসীদের অধিকার লঙ্ঘন। সাংবিধানিক রক্ষাকবচ দিয়ে অসাম্প্রদায়িকতা পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়, কারণ সেখানে সবসময়েই জনগনের কল্যানের ওপরে প্রাধান্য পায় ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থ।

মানবিক মূল্যবোধ ফিরে পেতে বা সুদৃঢ় করতে সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রচার, সচেতন করার, অতীত ঐতিহ্য স্মরণ করানোর উদ্যোগ প্রয়োজন। শহর ও গ্রামে, বাংলাদেশে ও প্রবাসে, সকল বাংলাদেশীদের মাঝে আমাদের বাঙালি ঐতিহ্যের চর্চা বাড়াতে বিশাল কোন সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন হল নিজেদের বাঙালি স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য ব্যক্তির গর্ববোধ, পরিবারের সকলের মধ্যে সেই গর্ববোধ চর্চা করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও কর্মক্ষেত্রে সেই বাঙালিয়ানার গর্বকে ধারণ করেই বিশ্ব সংস্কৃতিকে বরণ করা, বাঙালিয়ানা বিসর্জন দিয়ে নয়। মনুষ্যত্বকে বিসর্জন দিয়ে নয়।

আসিফ মুনীর : সাংস্কৃতিক কর্মী, উন্নয়ন কর্মী, শহীদ সন্তান

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top