উপ সম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার বাংলাদেশ : প্রেক্ষিত রামু, নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জ (৮)

মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার বাংলাদেশ

প্রেক্ষিত রামু, নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জ

 

 

13615204_634498916704798_6154940134168893260_nগণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। কথাটির মধ্যে কোথাও লেখা নেই এটি মুসলিম কাওয়ামি বাংলাদেশ’, ‘নিখিল হিন্দু বাংলাদেশ’, ‘তথাগত বৌদ্ধ বাংলাদেশকিম্বা সদাপ্রভুর খ্রিস্ট বাংলাদেশ। আমাদের টাকার মধ্যে কোথাও আমরা ধর্মবিশ্বাস নিয়ে টানাটানি করিনি। আমাদের জাতীয় প্রতীকের মধ্যে কোথাও কোনো বিশেষ ধর্মের ইঙ্গিত নেই। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের গর্ভভার ও প্রসব যন্ত্রণার পর বাংলাদেশ নামে যে নতুন শিশু রাষ্ট্রের জন্ম হয় তার ধর্মীয় পরিচয় কী তা আমরা কেউ জানতে চাইনি। জানতে চাইনি কারণ আমরা ছিলাম ভুক্তভোগী। একটি রাষ্ট্রের বিশেষ ধর্মীয় পরিচয় থাকার যন্ত্রণা, বেদনা ও শোষণের সঙ্গে আমরা পরিচিত হয়েছিলাম বা বলা ভালো হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম ২৫ বছরের পাকিস্তানি যাঁতাকলের ভিতর পিষ্ট হয়ে। সে সময় আমাদের শেখানোর চেষ্টা হয়েছিল কিভাবে ভাষাগত ও জাতিগত পরিচয় ভুলে পাকিস্তানি মুসলমান হয়ে উঠতে হয়। শুধু তাই নয়, যতই আমি পাকিস্তানি মুসলমান হই আমি চিরদিনই পাঞ্জাবি ও পাঠানদের তুলনায় কম মুসলমানহয়ে থাকবো। কারণ আমার নৃতাত্বিক বৈশিষ্ট্য। আমার গায়ের কালো রং, কম উচ্চতা, আমার ভাত-মাছ, আমার শাড়ির কারণে আমি চিরদিনই দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে থাকবো। তবে বাঙালি নারীরা যেদিন গণহারে পাঞ্জাবি, পাঠান, বেলুচ ও সিন্ধি পুরুষদের সাথে সম্পর্কের জেরে সন্তান উৎপাদন করবে সে সন্তান আরও কিছুটা খাঁটি পাকিস্তানি মুসলমান হবে। এইভাবে দুতিন প্রজন্ম পর বাঙালি জাতির নাম নিশানা মুছে গিয়ে নতুন কওম খাঁটি পাকিস্তানির সৃষ্টি হবে।

যে উর্দুভাষা আমি বুঝিনা, জানি না, সে ভাষাতেই কথাবার্তা বললে যে আমি খাঁটি পাকিস্তানি হবো সেটাও আমাকে শেখানো হয়েছিল। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানরা যে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক এবং তারা যে কাফের’, ‘মালাউন’ ‘নাসারাইত্যাদিও শেখানো হয়েছিল তখনই। আমাকে শেখানো হয়েছিল যে, খাঁটি পাকিস্তানি হতে হলে ভুলতে হবে রবীন্দ্রনাথ। নজরুলেরও শুধু ইসলামি গান মনে রেখে ভুলে যেতে হবে শ্যামাসংগীত ও অন্যান্য লেখা। আমাকে ভুলতে হবে চণ্ডীদাস, কীর্তন, ময়মনসিংহ গীতিকা এবং যাবতীয় লোকজ আচার অনুষ্ঠান।

দ্বিজাতি তত্ত্বের মতো একটি ভ্রান্ত, বিষাক্ত ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভিত্তির উপর গঠিত হয়েছিল পাকিস্তান নামক জোড়াতালি দেওয়া রাষ্ট্রটি। ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দু ও মুসলমান দুটি পৃথক জাতি একথা জানিয়ে বুঝিয়ে পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই তত্ত্বের ভিতর পরিষ্কার করা হয়নি ভারতীয় উপমহাদেশের খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পারসিক, অসংখ্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা কী এবং কোন জাতির মানুষ। আবার মুসলিমদের ভিতর শিয়া, সুন্নি, হানাফি, কাদেরিয়া, বাহাই, আহলে হাদিস, আহম্মদিয়া, আগাখানিসহ চার তরিকা, বাহাত্তর মাহজাব- এক জাতি না ভিন্ন ভিন্ন জাতি তাও পরিষ্কার করে বলা হয়নি। একজন পারসিকের সঙ্গে একজন শিখের বা জৈনের ততোটাই অমিল যা একজন সুন্নি হানাফি চিশতিয়া মুসলমানের সঙ্গে বৌদ্ধ বা বাহাই ও আগাখানির।

আমি যখন ক্ষুধার্ত অবস্থায় খাবার চাইবো পশতুভাষী এক মুসলমানের কাছে তখন সে কী বুঝবে জানি না কিন্তু একজন বাঙালি হিন্দু আমাকে ঠিকঠাক ভাত-মাছ এনে দিতে পারবে সেটা জানি।

মুক্তিযুদ্ধ আমাকে সেই উপলব্ধিতেই পৌঁছে দিয়েছিল যে, আমার ভাষা, আমার সংস্কৃতি যে ধারণ করে সেই বাঙালিই আমার আপন। সেই বাঙালি হিন্দু না মুসলিম না বৌদ্ধ না খ্রিস্টান তা জানার আগে আমার জানা দরকার ছিল সে আমার একদেশবাসী কিনা। শুধু বাঙালি নয়, এদেশের পাহাড়ি ও সমতলবাসী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষও মুক্তিযুদ্ধে একই সঙ্গে অংশ নিয়েছেন । কারণ একই ভূখণ্ডের ভিতর বসবাসকারী আমাদের মধ্যে অমিলের চেয়ে মিলই বেশি। পাহাড়ের বৈসাবি আর আমার বৈশাখির মধ্যে যথেষ্ট মিল রয়েছে। যা ছিল না আমার সঙ্গে করাচি, ফ্রন্টিয়ার বা বেলুচিস্তানের অধিবাসীর।

মুক্তিযুদ্ধের পর আমাদের সংস্কৃতি বিকশিত হচ্ছিল এই ভূখণ্ডের ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে চেতনায় ধারণ করে। অসাম্প্রদায়িক লোকজ ঐতিহ্যের ধারণ ও বিকাশই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছি যে দেশে ধর্ম সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল নাগরিক সম সুযোগ ও অধিকার নিয়ে বিকশিত হবে।

কিন্তু আমরা একটা বিষয় ভুলে গিয়েছিলাম। দ্বিজাতি তত্ত্বের বিষাক্ত গাছটির ডালপালা যতই ছাঁটা হোক তার শিকড় যে রয়ে গেছে কিছু কিছু মানুষের মনের কালো গহ্বরে। সেখান থেকে অনুকূল সময়ে তা আবার মাথা চাড়া দেবে এবং সেই আগাছা খেয়ে ফেলবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সোনালি ফসল।

রামু, নাসির নগর, গোবিন্দগঞ্জের ঘটনা সেই অতীত-ভুলেরই বহিঃপ্রকাশ। ৭৫এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আমাদের সংবিধানকে বার বার সাম্প্রদায়িক চিন্তার আঘাতে ক্ষত বিক্ষত করা হয়েছে। সমাজতন্ত্রকে মুছে ফেলা, বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেহারাকে বদলে তার গায়ে ধর্মীয় লেবাস পরানো এসবই এক পা এক পা করে এগিয়েছে। আমরা ক্রমশ শুনেছি শাড়িতে নাকি পর্দা হয় না’, ‘মাথায় ঘোমটা দিলে ধর্ম রক্ষা হয় না, বরং হিজাব ও বোরখা পরতে হয়। আমরা ক্রমশ আরও শুনেছি ইংলিশ মিডিয়াম মাদ্রাসার কথা। আমরা শুনেছি গায়ে হলুদ নাকি হিন্দুয়ানি। এভাবেই আমাদের মধ্যেই এক অংশ মূলধারার সংস্কৃতি থেকে বিচ্যূত হয়েছি। আমরা প্রতিমা ভাঙতে উৎসাহী হয়েছি, মঠ, মন্দির ভাঙতে উৎসাহী হয়েছি, সাঁওতালদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে সেই ভূমি গ্রাস করতে শিখেছি। আর ততোই আমরা মুক্তিযুদ্ধের মূল সুর ভুলে বেসুরো ধ্বনির জিগির তুলেছি। আমরা আমাদের আকাঙ্খার বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি দূরে সরে গেছি।

ভারতের বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার কুৎসিত প্রেতমূর্তি দেখা যায়। আমরা হঠাৎ করে চমকে উঠে দেখলাম আমাদেরই এক অংশের মনের ভিতরে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে ছিল অশুভ দানব। একই ঘটনা দেখা যায় রামুতে, নাসির নগরে, মাধবপুরে। প্রতিবছর দুর্গাপূজার সময় প্রতিমা ভাঙচুরের টুকরো খবরে সেই দানবেরই উপস্থিতির সংকেত মেলে। রামুর ঘটনার মতো নাসির নগরে সেই ফেসবুকের পোস্টকে কেন্দ্র করে দাবানল জ্বলে ওঠে। অনেকটা যেন চিলে কান নিয়ে গেছে এই গুজবে মাতোয়ারা হয়ে চিলের বাসভূমি পুরো অরণ্যকে ধ্বংস করে দেয়ার মতো তাণ্ডব।

রামুর মতো নাসিরনগরের ঘটনাও যে পুরোপুরি সাজানো ও উড়ো খবর থেকে তাণ্ডব চালানোর প্রয়াস সেটা তো বোঝাই যায়। এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে বাংলাদেশের সমাজকে অস্থিতিশীল করার জন্য একটা গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। সেই ষড়যন্ত্র সেই দ্বিজাতি তত্ত্বেরই নতুন রূপ, নতুন প্রশাখা। ভিতরে ভিতরে অনেক বছর ধরেই সাধারণ মানুষকে সাম্প্রদায়িক ও পরধর্ম বিদ্বেষী করে তোলা হয়েছে এবং হচ্ছে। যেজন্য সামান্য উসকানিতে আগুন জ্বলে উঠতে দেরি হয় না।ঘরে ঘরে ধর্মীয় আসর, গরীবের মাদ্রাসা, বড়লোকের ইংলিশ মিডিয়াম মাদ্রাসা, এখানে ওখানে ওয়াজের ক্যাসেট(আজকাল সিডি), লিফলেটের মাধ্যমে ভিতরে ভিতরে বাংলাদেশের মানুষকে সাম্প্রদায়িক করে তোলা হয়েছে।

এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান। তা সে তো বরাবরই ছিল। কিন্তু তখন তো সহনশীলতার অভাব হয়নি। সুলতানি ও মোগল আমলে রথের মেলায়, চড়কের মেলায়, মহরমের মেলায় সব সম্প্রদায়ের মানুষই তো অংশ নিয়েছে। মসজিদের সামনে দিয়ে প্রতিমা নিয়ে যাবার সময় বন্ধ রাখা হয়েছে ঢাকের বাদ্য। গরুর বদলে কোরবানি দেয়া হয়েছে ছাগল।

আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অসাম্প্রদায়িক। জারি, সারি, কীর্তন, গাজীগানের আসরে শ্রোতার অভাব হয়নি কখনও। প্রবারণা পূর্ণিমায় ফানুস ওড়ানো দেখতে সব সম্প্রদায়ের মানুষই ভিড় করেছে। বাউল, বৈষ্ণব, সুফি, দরবেশ, ভিক্ষু, সন্ন্যাসীদের কেউ প্রশ্ন করেনি তারা হিন্দু না মুসলিম না বৌদ্ধ।  ইংরেজ আমলে শহরে সাম্প্রদায়িক বিভেদ উদ্দেশ্যমূলকভাবে শুরু হলেও গ্রামে ছিল না। বরং খ্রীস্টান পাদ্রীরাও তাদের সেবা ও আন্তরিকতায় ধীরে ধীরে জনজীবনে বিশেষ শ্রদ্ধার আসন পেয়ে গেছেন।

সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’, ‘লোকে বলে লালন কি জাত সংসারেআমাদের দেশেই ধ্বনিত হয়েছে। রামু, নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আমাদের হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আবার জাগিয়ে তুলতে হবে। সাংস্কৃতিক আন্দোলন এখন আমাদের দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে আমরা যে বাংলাদেশ চেয়েছিলাম তা যদি গড়ে তুলতে হয় তাহলে পাড়ায়, মহল্লায় সাংস্কৃতিক সংগঠন নতুন করে গড়ে তুলতে হবে এবং পুরনোগুলোকে পুনর্জীবন দান করতে হবে। নাটক, গান, কবিতা, ছবি আঁকার চর্চা ছড়িয়ে দিতে হবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে।

বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির অব্যাহত চর্চার মাধ্যমেই সাম্প্রদায়িকতার দানবকে দমন করা সম্ভব। এ দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। এ দায়িত্ব সকল সচেতন সংস্কৃতিবান নাগরিকের। গ্রাম থিয়েটার পারে গণমানুষের কাছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের আবেদন পৌঁছে দিতে। এক সময় উদীচীর মতো সংগঠন শক্তিশালী ছিল। ভারতে আইপিটিএ বা ভারতীয় গণনাট্য সংস্থার শিল্পী, কবি ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা এ দায়িত্ব পালন করেছেন। আজ বাংলাদেশে প্রগতিশীল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে একাত্তরের মতো। গ্রামে গ্রামে, শহরে, বন্দরে, পাড়ায়, মহল্লায়, অভিজাত ক্লাবে ও সাধারণ মিলনায়তনে এবং পথে ঘাটে যদি আমরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের, পথ নাটকের, আয়োজন করতে পারি তাহলে জনসাধারণকে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত করতে পারব। আর সেভাবেই সম্ভব হবে আমাদের স্বপ্নেরআকাঙ্খার বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

শান্তা মারিয়া : সাংবাদিক

Views All Time
Views All Time
631
Views Today
Views Today
2
1 Comment

1 Comment

  1. Ajit kumar debnath.

    December 22, 2016 at 12:35 pm

    এরকম ভালো একটি লেখা বহুদিন পড়িনি। লেখাটি সবার পড়া উচিৎ।
    লেখিকাকে অনেক ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top