উপ সম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার বাংলাদেশ : প্রেক্ষিত রামু, নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জ (৯)

বাংলাদেশের আকাঙ্খিত স্বাধীনতা

প্রেক্ষাপট নাসিরনগর ও রামু

 

 

1462163456-36

বাংলাদেশের স্বাধীনতার আকাঙ্খাটি কি ছিল? ১৯৭১ এ এতদঞ্চলের বাঙালীরা তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানকে একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে শামিল হয়েছিল কেন? এ বিষয়টি আজ দেশ স্বাধীন হবার ৪৫ বছর পর নতুন করে ভাববার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে বৈ কি! কেননা, ১৯৪৭ এ ভারত বিভক্তির মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন স্বতন্ত্র মুসলিম আবাসভূমি পাকিস্তান রাষ্ট্রটি উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুসলমানদের মনে আবেগগতভাবে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করলেও কার্যতঃ তা শাসকগোষ্ঠীর অপরিণামদর্শিতায় ও অবিমৃশ্যকারীতায় একটি শোষনবাদী কৃত্রিম রাষ্ট্রে পরিণত হয়। আর তাই পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান প্রদেশ পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙালীরা সেই কুশাসন ও শোষণ-বঞ্চনা মেনে নিতে একেবারেই গোড়া থেকে অস্বীকার করে।

মনে রাখা দরকার যে, ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে মুসলিম বাংলার অন্যতম পুরোধা পুরুষ শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক যে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিলেন যা লাহোর প্রস্তাব নামে পরিচিত। তাতে উত্তর পশ্চিম ভারত ও ভারতের পূর্বাংশে একাধিক স্বাধীন সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিধান ছিল। আর ১৯৪৬ সালে যখন এই প্রস্তাবের উপর মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল সমুহে ভোট গ্রহণ করা হয় তখন পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ বাংলার মুসলমানরা এর সমর্থনে শতকরা ৯৭.৮ ভাগ ভোট প্রদান করে। অন্যদিকে অন্য সকল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের মুসলমানরা এ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়নি। ফলে কেবল বাংলার মুসলমানদের নিরঙ্কুশ ভোটের ভিত্তিতেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের গোঁড়াপত্তন অবধারিত হয়ে উঠেছিল। কথা ছিল, বাংলা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল বিধায় সেটিও একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে আত্মপ্রকাশ করবে এবং সেখানকার অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষও সে রাষ্ট্রে পূর্ণ নাগরিক অধিকার ভোগ ও মর্যাদা লাভ করবে। অর্থাৎ ঐ রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের সকল প্রকার অধিকার সংরক্ষিত থাকবে শাষনতান্ত্রিক রক্ষাকবচের মাধ্যমে।

মোদ্দাকথা, বাংলা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা হলেও (৫২:৪৮) স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যেটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক হবে। মুসলিম বাংলার মনিষীরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অন্দোলনে সেদিন ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এই মনস্তাত্ত্বিক অভিপ্রায়ের আলোকে। কিন্তু পরবর্তীতে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগের অজুহাতকে খাড়া করে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর হিন্দু মহাসভা, কংগ্রেস হাইকমাণ্ডের নেহরু- প্যাটেল অংশ আর বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী-হাশিম বিরোধী কায়েমী স্বার্থবাধী নেতৃত্বের চক্রান্তের কারনে যুক্ত বাংলা বা বৃহত্তর বাংলা প্রতিষ্ঠার সকল প্রয়াস-প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ সেদিন মুখ থুবড়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে বঙ্গীয় কংগ্রেসের নেতা ব্যারিস্টার কিরন শংকর ও ফরোয়ার্ড ব্লক নেতা ব্যারিস্টার শরৎ বসু আর বঙ্গীয় মুসলিম লীগ নেতা ব্যারিস্টার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ইউনাইটেড বেঙ্গল বা গ্রেটার বেঙ্গল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ধূলিস্যাত হয়ে যায়। মাড়োয়ারী পুঁজি আর বিভিন্ন মুখী কায়েমী স্বার্থবাদী নেতৃত্বের চক্রান্তে বিপুল সম্ভাবনাময় বাংলা প্রদেশটি একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করতে ব্যর্থ হয়। বরং হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদের অনল প্রজ্জ্বলিত করে বাংলাকেও ‘৪৭ এ পুনরায় বিভক্ত করা হয় এবং ‘মুসলিম বাংলা’ ও ‘হিন্দু বাংলা’ এই নামে দুইটি কৃত্রিম প্রদেশ সৃষ্টি করে যথাক্রমে পাকিস্তান ও ভারত রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী, কিরণ শংকর, শরৎ বসুদের পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ায় আমরা দুই খন্ডিত বাংলার শোষিত-বঞ্চিত নাগরিকে পরিণত হলাম।

অথচ বাংলা ভাগ রোধকল্পে সেদিন অসাম্প্রদায়িক এবং বাংলার ঐতিহ্য সংস্কৃতির প্রতি সমর্পিত ঐ নেতৃত্রয় এবং আরও অনেকে সেদিন কি চেষ্টাই না করেছিলেন! বাংলা ভাগ হলে প্রকারান্তরে তা যে বাইরের পুঁজির শোষণের চারণক্ষেত্রে পরিণত হবে এ সত্যোপলব্ধি সেদিনের নেতৃত্বের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল। আর এ কারনেই অমরা শহীদ সাহেবকে এই বঙ্গভঙ্গ রোধকল্পে তথা বাংলার স্বাধীনতার স্বপক্ষে যুক্তি উত্থাপনকালে বলতে শুনি, “Bengal divided will mean Bengal prey to the people of other parts of lndia. A divided Bengal is waiting to be exploited for their benefit.”

যাইহোক, ১৯০৫ এ যে হিন্দুরা বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বৃটিশরাজকৃত বঙ্গভঙ্গের প্রবল  বিরোধিতার মাধ্যমে ১৯১১ তে বৃটিশকে তা রোধ করতে বাধ্য করে সেই একই হিন্দু নেতৃত্বের এক বৃহৎ অংশকেই আমরা ’৪৭ এ দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাকে বিভক্ত করার উদ্যোগে উঠে পড়ে লাগতে দেখি। এও ইতিহাসের এক যারপর নাই ভ্রান্তি বৈ নয় যার খেসারত পূর্ব বাংলার মানুষেরা পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়ে দীর্ঘ তেইশ বছর যাবৎ দিয়েছে।

স্বাধীন বাংলাদেশের আকাঙ্খা প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গেলে ইতিহাসের এই চল্লিশের (বিংশ শতাব্দীর) দশকের বাংলা বিষয়ক রাজনীতির গতি প্রকৃতির উপর খানিক আলোকপাত বা আলোচনার প্রয়োজন পড়ে নিশ্চয়ই! ঐ ঘটনা প্রবাহের সার সংক্ষেপ এই যে, সোহরাওয়ার্দী-হাশিমরা বাংলার সত্যিকারের ভবিষ্যত যে একটি স্বাধীন সার্বভৌম যুক্ত বাংলা প্রতিষ্ঠার মধ্যেই নিহিত সে বিষয়টি অনুধাবনে সক্ষম হয়েছিলেন এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টাও করেছিলেন। ১৯৪৬ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত লেজিসলেটরর্সদের সম্মেলনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী জিন্না প্রমুখ লাহোর প্রস্তাব সংশোধন করে একটি মাত্র পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিধান দিয়েছিলেন মর্মে যে মিথ্যাচার করা হয়ে থাকে তা যাচ্ছেতাই ধরনের অসৎ অসাধু রাজনীতির পরিচায়ক মাত্র। এই তথাকথিত সংশোধনী প্রস্তাবটি শহীদ সাহেব উত্থাপন করেছিলেন এই মর্মে মিথ্যা অভিযোগ খাড়া করে পরবর্তীকালে পাকিস্তানের রাজনীতিতে তাকে ঘায়েলের অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। কথাটি এই যে, ঐ কনফারেন্সে  পেশকৃত দিল্লি প্রস্তাবটি কোনক্রমেই লাহোর প্রস্তাবের সংশোধনী ছিলনা আর দ্বিতীয়তঃ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের কোন প্রস্তাব সংশোধনের কোন এক্তেয়ারও দিল্লি লেজিসলেটর্স কনভেনশনের ছিলনা। সুতারাং নিছক মতলবী স্বার্থে পরবর্তীকালে আমরা পাকিস্তানে এই বিষয়টিকে কুমতলব হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখি।

থাক, উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনা এখানে করা হল প্রকৃত প্রস্তাবে আজকের বাংলাদেশের মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটটি অনুধাবনের জন্য। পাকিস্তান রাষ্ট্রে উড়ে এসে জুড়ে বসা শাষকরা বরাবরই সংখ্যাগুরু পূর্ববাংলাকে দাবিয়ে রাখার অপকৌশলে লিপ্ত থেকেছে।

পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদেরকে ‘সত্যিকারের মুসলমান’ বানাবার উদ্ভট প্রয়াসে বাংলার হাজার বছরের ভাষা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যকে বদলে দেবার জঘন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছে। রবীন্দ্রনাথকে পরিত্যাজ্য ঘোষণা আর বাংলার মানুষদেরকে বিজাতীয় হিন্দু সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদেরকে আরব-পারস্যের লেবাস পরাতে চেয়েছে। এই কৃত্রিম ভাবধারা চালিয়ে দেবার দুরভিসন্ধি তেইশ বছর ধরে চলেছে নিরন্তর। আমাদের বাঙালী সত্ত্বা ভুলিয়ে দিয়ে তথাকথিত ইসলামী তাহজিব তমুদ্দুন চাপিয়ে দেবার হীন উদ্দেশ্য সফল হয়নি; কেননা, বাংলার মানুষের হাজার বছরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যিক চেতনায় মানবতাদের যে নিরবচ্ছিন্ন অনুশীলন চলে আসছে তাতে করে ধর্মান্ধতা বা কৃত্রিমতা মেনে নেবার কোন সঙ্গত কারণ এখানে সৃষ্টি হবার সুযোগ পায়নি। শ্রী চৈতন্যের ভক্তি রস ধারা, বৌদ্ধদের অহিংস নীতি আর গভীর মানবতার রসে সিঞ্চিত ইসলামী সুফিবাদী দর্শনের উচ্চকিত সাধনা বাংলার মানস ধর্মটিকে বর্মসম সহনশীল করে তুলেছে। তাই আমরা পাকিস্তান আমলে ধর্ম নিয়ে ব্যবসা ফাঁদা গোষ্ঠিগুলিকে বরাবরই পরাজিত হতে দেখছি। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা এই ধর্মান্ধদেরকে স্থায়ীভাবে পর্যুদস্ত করার পরিবেশটি সৃষ্টি করতে পেরেছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে, ভৌগলিক স্বাধীনতা অর্জনকেই আমরা আমাদের আবেগের প্রাবল্যের কারনে সব কিছু পেয়ে গেছি বলে সাব্যস্ত করলাম। ফলে স্বাধীনতার আকাঙ্খা বাস্তবায়নে যে সাংস্কৃতিক মননের অনুশীলনের প্রয়োজন ছিল, যে আদর্শিক ও দার্শনিক অনুভবের পরিচর্যা একান্তই আবশ্যক ছিল এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাঝে বাঙালী জাতি সত্তা ও এর যাবতীয় অর্জন বিষয়ে গভীর অনুরাগ সৃষ্টির আয়োজন করা উচিত ছিল তা আমরা করতে ব্যর্থ হয়েছিলাম। আমাদের উচ্চতর চেতনার পরিপুষ্টি বিধানের ব্যাপারে কোন সহজ ও সর্বজনগ্রাহ্য নীতি কৌশল গ্রহণ এবং চর্চার মধ্য দিয়ে একে বিকশিত করে তোলার কোন প্রয়াস না রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে দেখা গেল না সাংস্কৃতিক ও সামাজিক শক্তিসমূহের মধ্যে তা দৃশ্যমান হল! বরং এক শ্রেণীর লুটেরা ও আলু পটলের ব্যবসায়ী অবৈধ উপায়ে অর্জিত পয়সার জোরে ক্রমান্বয়ে আমাদের শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতি-অর্থনীতির মালিক মোখ্তার বনে যেতে থাকলো। মুক্তিযুদ্ধের যে আকাঙ্খা অর্থাৎ একটি অসাম্প্রদায়িক প্রগতিবাদী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার চেতনা, তা কিন্তু কালক্রমে বিকৃতি ও গোঁজামিলের বেড়াজালে আটকে যেতে থাকলো। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানী প্রতিক্রিয়াশীল, কৃত্রিম ও ধর্মান্ধ ধারাটিকে ফিরিয়ে আনার জন্য জেনারেল জিয়াউর রহমান ও জেনারেল এরশাদের দ্বারা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া শুরু করলো আবার। একাত্তরে মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান বাঙালীর অস্ত্র হাতে হানারদারদের মোকাবেলা ও তাদেরকে সম্পূর্ণভাবে পরাভূত করে যে স্বাধীন রাষ্ট্রটি অর্জন করেছিল বর্তমানে তা আমাদের দৃঢ় প্রত্যয়বোধ, গণতন্ত্র ও বাংলী সত্ত্বা-সংস্কৃতির অনুশীলনের অভাবের কারনে পুনরায় প্রতিক্রিয়াশীল কায়েমী স্বার্থবাদী পাকিস্তানপ্রেমীদের সদম্ভ বিচরনভূমিতে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী তথা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ কারীদের বিচারের কাজটি সম্পন্ন করা থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারায় বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্জয় সাহস ও আন্তরিক প্রচেষ্টা জাতির মনে এ ক্ষেত্রে নব আশার সঞ্চার করলেও শাসক দল বা শাসক গোষ্ঠির লুটেরা মানসিকতা ও বাঙালী জাতিসত্তা এবং বাঙ্গালী সংস্কৃতি বিষয়ে সীমাহীন অজ্ঞতা ও সর্বোপরি সমাজে ও দল অভ্যন্তরে আদর্শচর্চার প্রকট প্রাদুর্ভাব বারবার দেশে গণবিরোধী অপশক্তির পুনঃউত্থানকে ত্বরান্বিত করছে।

সেই পাকিস্তান আমলে ধর্মব্যবসায়ী জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, মুসলিম লীগ প্রভৃতি দল ধর্মপ্রাণ সাধারণ জনগনের মাঝে নানান বিভ্রান্তি ও মিথ্যাচার ছড়িয়ে সমাজে তাদের দোর্দন্ড প্রতাপ বজায় রাখতো, মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয় লাভের কারনে তারা এক সময়ে অনেকটা কোনঠাঁসা হয়ে পড়লেও আমাদেরই ভুল ও উদগ্র লোভ লালসার কারণে তারা আবার শক্তি সঞ্চয়ে সক্ষম হয়েছে। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রয়কারী বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের মাঝেই এই আদর্শহীনতা আজ প্রকট রূপ ধারন করেছে। এমনকি, বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাঝেও ইতরলোভের পরাকাষ্ঠা লক্ষ্যনীয় হয়ে উঠছে।

আর এ সবই এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে বৈ কি! অবশ্য এও মিথ্যা নয় যে, এই বন্ধ্যাত্ব ও মাৎসায়নের মধ্যেও সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রতিরোধের প্রবল প্রয়াস-প্রচেষ্টাও চলছে দেদার! বলাই বাহুল্য যে, পাকিস্তান আমলে সামাজিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের যে ধারাবাহিকতা ও এর সমন্বিত ঐক্যবদ্ধ রূপ দৃশ্যমান ছিল, সেটি বর্তমানের এই সুবিধাবাদী ও ভোগবাদী রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি অতিরিক্ত সেবাধর্মীতার কারনে অনেকাংশেই ম্রিয়মান হয়ে পড়েছে। তবে এ কথাও স্বীকার করতে হবে যে, হাজারো প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও এ দেশের দেশপ্রেমিক গণমানুষ কিন্ত তাদের নিজেদের জন্য রক্ষাব্যুহ তৈরি করতে সদা সচেষ্ট রয়েছে। দেশের সকল নাগরিকের সার্বিক মুক্তির যে আকাঙ্খা থেকে বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছে তা আজও অনেকাংশে অধরা রয়ে গেছে আমাদের রাজনীতিক, সমাজ পরিচালক, বুদ্ধিজীবি, ছাত্র, শিক্ষক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, সংস্কৃতিসেবীদের বৃহৎ অংশের সুবিধাবাদী ও লালসাগ্রস্ত বিকার মানসিকতার কারনে! স্বাধীন বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষকে সর্বক্ষন ভীতির মধ্যে কাটাতে হবে এতো ছিল কল্পনারও অতীত! বিশেষত ২০০১ সালে বিএনপির নির্বাচনী বিজয়ের উপর ভর করে সাঁথিয়ায় পূর্নিমারানীসহ সংখ্যালঘু নারীদের সম্ভ্রম কেড়ে নেয়া আর সীমাহীন অত্যাচারের মাধ্যমে যে নতুন যাত্রার সূচনা তারই ধারাবাহিকতা আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ও লক্ষ্য করছি অত্যন্ত বেদনাহত চিত্তে!

স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য সাঁথিয়া, রামু, নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জ এক একটি কলংক তিলক! আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, নেতা, উপনেতা, পাতি নেতারা সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত তাদের বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর বর্বরোচিত অত্যাচারে শামিল হচ্ছে নিছক ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে একি ভাবা যায়! হ্যাঁ যায়; যায় এই কারনে যে, দল অভ্যন্তরে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চেতনার চর্চার বিপরীতে আত্মস্বার্থ চরিতার্থের বিষয়টিকেই যখন রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রাধান্য দেয়া হয় তখন এমন অভাবিত ঘটনা সমূহ ঘটতে বাধ্য।

প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দরিদ্র অসহায় মানুষদেরকে মিথ্যাভাবে দায়ী করে (ফেসবুকে ইসলাম ধর্মের প্রতি অবমাননার পোষ্ট দেয়ার নামে) রামু, নাসিরনগরসহ বিগত কয়েক বছর যাবৎ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু-বৌদ্ধদের উপাসনালয় ও ঐ সম্প্রদায়ভুক্ত নিরীহ অসহায়ের উপর যে নির্মম ও অবিশ্বাস্য অত্যাচার চালানো হয়েছে বা হচ্ছে তা প্রকারান্তরে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের স্বাধীনতার মৌলিক আকাঙ্খাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে বৈ কি! সবচেয়ে বড় কথা, সংখ্যালঘু নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ব্যাক্তিরা যখন সাজা পায় না, বরঞ্চ আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বেড়িয়ে যায় তখন মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খা বিদ্রুপের হাসি হাসে! জামাত বিএনপির সংখ্যালঘু নির্যাতন বোধগম্য কিন্তু আওয়ামী লীগের লোকেরা যখন এই একই অপকর্মে লিপ্ত হয় তখন বলতেই হবে যে,

 

‘Something is rotten in the state of  Bangladesh!’

নাসিরনগর, রামু, গোবিন্দগঞ্জ, উখিয়ায় যে দুস্কর্ম দৃস্কৃতি চলেছে তার বীজ কিন্তু উপ্ত ছিল আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের এবং সামগ্রিকভাবে আমাদের মননহীন সাংস্কৃতিক বিকারের মধ্যে। ভুললে চলবে না যে, এ জন্য কিন্তু আমরাই কম-বেশী দায়ী।

কক্সবাজার, রামু, উখিয়ায় বৌদ্ধ পল্লীতে হামলা ও বৌদ্ধদের উপর নিপীড়ন, সাঁথিয়া-নাসিরনগর প্রভৃতি স্থানে মন্দির উপসনালয় ভাংচুর ও হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন আর সম্প্রতি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের উপর অকথ্য হামলা এসবই আমাদের স্বাধীনতার আকাঙ্খাকে ভুলুণ্ঠিত করেছে। একটি দুস্কৃতকারী মহল অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে দেশী-বিদেশী ইন্ধনে আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধ্বংস করতে তৎপর। একাজে যখন মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির লোকেরাও শামিল হয় তখন প্রমাদ না গুণে উপায় থাকে কী?

রামু, নাসিরনগর, গোবিন্ধগঞ্জের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানোর জন্য সমাজ অভ্যন্তরে ধর্মের লেবাসধারী ও মুখোশের আড়ালে ঢাকা কিছু বাংলাদেশবিরোধী কায়েমী স্বার্থবাদী মহল প্রনোদনা ও উৎসাহ পাচ্ছে হেজাবী আমলা, রাজনীতিক ও সমাজপতিদের ভন্ডামী, প্রতারণা ও লোভী মানসিকতার কারনে। মোদ্দাকথা স্বাধীনতার আকাঙ্খা বিনাশী এই অপতৎপরতা আমাদেরই নীতিহীনতা, উদগ্র লালসা আর আত্ম স্বার্থমগ্নতার মাঝে লুকিয়ে আছে। আর তাই সুযোগ পেলেই এই অপশক্তি উদ্ধত ফণা মেলে ধরে, ছোবলে ছোবলে জর্জরিত করে দেয় আমাদের হাজার বছরের লালিত অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে। প্রগতির  রথটিকে এই উপায়ে ওরা থমকে দিতে চায়!

শাহীন রেজা নূর : সাংবাদিক, শহীদ সন্তান

Views All Time
Views All Time
208
Views Today
Views Today
2
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top