ঢাকা ,  শনিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  ১ আশ্বিন ১৪২৪

আমি এবং আমরা

শামীম আখতার : সাক্ষাৎকার

সাঈদা সানী
চলচ্চিত্র নির্মাতা শামীম আখতার। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তী সেই নতুন আবাহনের প্রজন্ম। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্রীর মনে এ সময়ই স্ফুরণ ঘটে আধুনিক এবং যুগ সচেতন মানসিকতার। তাঁর পরিচয় ঘটে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি নারীবাদী লেখিকার রচনার সাথে। নারীর অধিকার বিষয়ক লেখালেখি শুরু করেন ছাত্রীবস্থাতেই সচিত্র সন্ধানী পত্রিকায়। তীব্র জীবনীশক্তির এই মানুষটি একই সাথে চলচ্চিত্র সমালোচনাও পাশাপাশি লিখতে শুরু করেন। পেশা হিসেবে এই শখটিকেই পরবর্তীতে বেছে নেন। ৬২ বছরের একজন নারী হিসেবে তার সামাজিক দায়বদ্ধতা তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রে এবং অজস্র লেখার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে।
একজন দেশ প্রেমিক হিসেবে তাঁর পরিচয় আমরা পাই তাঁর নির্মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বেশ কয়েকটি প্রামান্য চিত্র, একটি পূন্যদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং নাটকের মধ্যে দিয়ে। তাঁর সদ্য সমাপ্ত পূর্নদৈঘ্য চলচ্চিত্র ‘রিনা ব্রাউন’ একটি কৃষ্ণাঙ্গ নারীর জীবনী নিয়ে নির্মিত যা অচিরেই মুক্তি পেতে যাচ্ছে।
আমি এবং আমরার পক্ষ থেকে এই সমাজ সচেতন নির্মাতার মুখোমুখি হই আমরা-
জীবন থেকে নেয়া : নারী নির্যাতন তো রয়েছেই, এরইমধ্যে গত কিছুদিনে শিশু নির্যাতনের হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের করনীয় কী বলে মনে করেন?
শামীম আখতার : আমরা আসলে একটা ডমিনো এফেক্ট এর মধ্যে আছি। আমরা মনে করি মন্ত্রনালয়ই সব করবে। এটা ঠিক নয়। সুষ্ঠু সমন্বয় দরকার সবকিছুতে। মন্ত্রণালয়, সুশীল সমাজ সাধারণ মানুষ সবার মধ্যে একটা ইন্টারলিংক দরকার। এটা স্বীকার না করা পর্যন্ত মুক্তির পথ নেই। মন্ত্রনালয়তো খুবই সংকীর্ণ পরিসরে কাজ করে। অথচ বিষয়টাকে বড় একটা প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। লক্ষ্য করবেন নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের অধিকাংশই সমাজের নীচুতলার বাসিন্দা। অর্থাৎ ক্ষমতাহীন জনগোষ্ঠির প্রতিনিধি। আবার যারা এই নির্যাতনটা চালাচ্ছে, তাদেরও প্রায় সবাই ঐ শ্রেণীরই প্রতিনিধিত্ব করছে।
এটা কেন? কারণ, একাত্তরে একটা শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়েই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজও বাস্তব ভিত্তি পায় নি। ফলে সাধারণ মানুষের ভেতর যে হতাশা, যে কষ্ট তা অনেকটা বোতলে পুরে রাখার মত অবস্থা। কোন না কোন সময়ে সেই পুঞ্জীভূত কষ্ট, হতাশা, ক্ষোভের উদ্গীরন তো হবেই। আসলে একটি ব্যর্থতা ডেকে আনছে আরো অনেক ব্যর্থতা। সব মিলিয়ে একটা সাপ্রেসড সোসাইটিতে বাস করছি আমরা। এখানে নারীকে সেক্স অবজেক্ট হিসাবেই দেখা হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রানের জন্য মুক্তচিন্তা ও মুক্ত বুদ্ধির চর্চা করতে হবে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সমাজ সচেতনতামূলক প্রকল্প হাতে নেয়া দরকার। আর এজন্য সুশীল সমাজ এবং সরকারকে একযোগে কাজ করতে হবে।
জীবন থেকে নেয়া : আপনিতো নিজেও একজন মিডিয়া কর্মী। তো বিজ্ঞাপন, সিনেমা, নাটক তথা মিডিয়াতে প্রায়শই নারীকে পণ্য হিসাবে উপস্থাপন করা হয়। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?
শামীম আখতার : সেই ষাটের দশকে আমাদের শক্তিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হান তাঁর বিখ্যাত সিনেমা ‘কাঁচের দেয়াল’-এ দেখিয়েছেন একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত নারী তাঁর পারিবারিক, সামাজিক শৃংখল ভেঙ্গে বেড়িয়ে আসছেন। এই চরিত্রটিতে সুমিতা দেবী অনবদ্য অভিনয় করেন। তো এই ছবিটি নিয়েও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সুশীল সমাজে সমাদৃত হলেও প্রতিক্রিয়াশীলেরা সমালোচনা করে। সেই অবস্থার যে খুব একটা ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে তা নয়। ক্ষেত্রবিশেষে বরং উল্টোটা হয়েছে। আমি স্কার্ট পড়ে স্কুলে যেতাম। অথচ এতকাল পরে এসে এখন ঢাকার রাস্তায় বোরকা পড়া নারীর আধিক্য চোখে পড়ে। তো এই বোরকা সংস্কৃতি তো আমাদের না। এটা আরবের। এসব বলতে গেলেও বিপদ। ‘বাঁশের কেল্লা’ বা ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী নাস্তিক অভিধা দিয়ে দেবে। নৈতিকতার মানদে কোন কিছুর বিচার করা অনুচিত।
অন্যদিকে অনেক নারীর নিজের চেতনার জায়গাটাও অসচ্ছ। ফলে সে নিজের অজান্তেই পাপেট হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে পণ্যকরন কথাটা কিন্তু আপেক্ষিক। শুধুমাত্র উপস্থাপনার কারনে একটি দৃশ্য যেমন শৈল্পিক হয়ে উঠতে পারে তেমনি আবার কুরুচিপূর্ণও হতে পারে। এখানে প্রয়োজন সেল্ফ সেন্সরশিল্প। মিডিয়ায় এই সেল্ফ সেন্সরশিপটা খুব জরুরী।
জীবন থেকে নেয়া : আপনার বৈচিত্র্যময় পেশাজীবন সম্পর্কে কিছু বলুন।
শামীম আখতার : বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েট শেষ করেই সাবলম্বী হওয়ার তাগিদ থেকে মাষ্টার্স না শেষ করেই ইউনিসেফ-এ একটা প্রজেক্টে কাজ শুরু করি। তারপর মিডিয়ার জগতে প্রবেশ। বিটিভিতে একটি অনুষ্ঠানের উপস্থাপিকা হিসেবে। ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত “দৈনিক সংবাদ” পত্রিকায় মেয়েদের পাতার সম্পাদনা করেছি। এরপর বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানে পরামর্শকের দায়িত্ব পালন করেছি। আরও নানা রকম কাজে যুক্ত হয়েছি যা বলে শেষ করা যাবে না।
জীবন থেকে নেয়া : চলচ্চিত্র নির্মাণের শুরুটা কিভাবে?
শামীম আখতার : বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চলা কালেই বিভিন্ন ফিল্ম এ্যাপ্রেসিয়েশন কোর্স-এ অংশ নেই। তারপর ১৯৯১ সালে তারেক মাসুদের সাথে যৌথ উদ্যোগে ‘সে’ নামের নারীমুক্তি বিষয়ক একটি শর্ট ফিল্ম তৈরি করি। এরপর ‘গ্রহণকাল’, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রামান্য চিত্র ‘ইতিহাস কন্যা’ এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক পূর্ণ দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘শিলা লিপি’ নির্মাণ করি। এছাড়াও রয়েছে ৩০ টিরও বেশি বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্মিত প্রামাণ্য চিত্র।
জীবন থেকে নেয়া : নারী বিষয়ক পাক্ষিক পত্রিকা ‘অনন্যায়’ আপনি কত দিন কাজ করেছেন?
শামীম আখতার : ২০০৩ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত। এই পত্রিকায় লেখাগুলোতে আমার নারী বিষয়ক চিন্তা চেতনার পরিপক্ক রূপের প্রকাশ ঘটে। এই দীর্ঘ সময়ে নারী বিষয়ক আমার কিছু মৌলিক এবং অনূদিত রচনা পত্রিকাগুলোতে বেরোয়। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া নারীর স্বধিকার আন্দোলনের ব্যক্তিত্ব এবং ইতিহাস নিয়ে রচনা।
জীবন থেকে নেয়া : সচেতনভাবে নারীবাদী আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন কবে থেকে?
শামীম আখতার : বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্ধ্যয়নের শুরু থেকেই। আমরা বেশ কয়েকজন মিলে একটা পাঠচক্র এবং একটা পত্রিকাও বেশ কষ্টে-সৃষ্টে, পকেটের পয়সা খরচ করে বের করতাম। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তির দাবী।
জীবন থেকে নেয়া : আপনার লেখালেখি সম্পর্কে কিছু বলুন?
শামীম আখতার : লেখালেখি জীবনের সূচনা সম্পর্কে প্রথমে কিছু বলি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময় ‘সচিত্র সন্ধানী’ পত্রিকায় খন্ডকালীন কাজ শুরু করি। সেখানে চলচ্চিত্র সমালোচনা লিখে হাত পাকা করি। তারপর সংবাদ পত্রিকায় সুদীর্ঘ ১৪ বছর অনেক লেখা লিখতে হয়েছে। এ পর্যন্ত আমার দুইটি বই প্রকাশিত হয়েছে। একটি অনুবাদ সাহিত্য, এ্যাগনেস মেডলির ‘ডটার অব আর্থ’ গ্রন্থের ‘মৃত্তিকা কন্যা’ শিরোনামে এবং অন্যটি আমার নারী বিষয়ক ভাবনার উপর একটি মৌলিক রচনা ‘আমাদের সনাক্তকরন।
জীবন থেকে নেয়া : আপনি বর্তমানে কোথায় কর্মরত?
শামীম আখতার : বাংলাদেশ সিনেমা এবং টিভি ইন্সটটিউটে নিয়মিত লেকচারার হিসেবে কাজ করছি।
জীবন থেকে নেয়া : আপনার পারিবারিক জীবন সম্পর্কে কিছু জানতে আমরা আগ্রহী।
শামীম আখতার : ১৯৮৮ সালে আমি বিয়ে করি। দুঃখজনক কারনে সেই বিয়েটি একবছর স্থায়ী হয়। তখন আমার দুইটি যমজ সন্তান হয়। একটি মেয়ে এবং অন্যটি ছেলে। তারা এখন আটাশ বছরের যুবক-যুবতী। ওদেরকে নিয়েই কেটে যাচ্ছে।
জীবন থেকে নেয়া : আপনার ভবিষৎ পরিকল্পনা কি?
শামীম আখতার : লেখালেখি এবং চলচ্চিত্র নির্মাণ চালিয়ে যাওয়া। বর্তমানে আমার একটি অর্ধ সমাপ্ত উপন্যাস পড়ে রয়েছে। সময় পেলে প্রথমে ওটা শেষ করার ইচ্ছা আছে।

Views All Time
Views All Time
329
Views Today
Views Today
2
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top