ঢাকা ,  বৃহস্পতিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  ৬ আশ্বিন ১৪২৪

এশিয়া

সাজানো লোক দিয়ে আগুন লাগিয়ে রোহিঙ্গাদের দায়ী করছে মিয়ানমার

সাজানো লোক দিয়ে ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়ার ছবি তুলে সেই দায় রোহিঙ্গাদের ঘাড়ে চাপাচ্ছে মিয়ানমার।

মিয়ানমার সরকারের দাবি, রোহিঙ্গারা নিজেরাই তাদের বসতবাড়িতে আগুন  দিয়ে সহিংসতা ছড়াচ্ছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে তার উল্টো কথা। বৌদ্ধ রাখাইন, এমন কি হিন্দুদের রাখাইন মুসলিমদের মতো পোশাক পরিয়ে তাদের দিয়ে ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া হচ্ছে এবং সেইসব ঘটনার ছবি তুলে এর জন্য রোহিঙ্গাদের দায়ী করা হচ্ছে।

মিয়ানমার সরকারের ব্যবস্থাপনায় সাংবাদিকদের একটি দল রাখাইনে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নিয়ে যাওয়া হয়। দেশি-বিদেশি ১৮ জন সাংবাদিকের  এই দলে ছিলেন বিবিসির জোনাথন হেড।  রাখাইন ঘুরে তিনি নিজের চোখে দেখা অবস্থা নিয়ে একটি প্রতিবেদন লিখেছেন। আর এতে ফুটে উঠেছে কীভাবে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন চালাচ্ছে মিয়ানমার ও তার সেনাবাহিনী।

বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, গত দুই সপ্তাহে যেসব রোহিঙ্গা মুসলিম রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে, তারা এসেছে মূলত তিনটি জেলা থেকে। জেলা তিনটি হলো- মংডু, বুথিডং ও রাথেডং।

এ তিনটিই হচ্ছে মিয়ানমারের শেষ তিনটি এলাকা যেখানে বড় সংখ্যায় ‘মুক্ত পরিবেশে’ রোহিঙ্গা বসতি আছে। এ ছাড়া বড় সংখ্যায় রোহিঙ্গারা আছে শুধু বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয়শিবিরে।

এসব জেলায় যাওয়া খুব কঠিন, রাস্তা খারাপ – তা ছাড়া সেখানে যেতে সরকারি অনুমতিপত্র লাগে। কিন্তু সাংবাদিকদের এমন অনুমতি দেওয়া হয় না বললেই চলে।


উপরের ছবিতে (ডানে) যে নারী আগুন দিচ্ছেন, ইনিই সেই নারী, যিনি একজন হিন্দু

প্রতিবেদনে জোনাথন হেড লিখছেন, সম্প্রতি তারা ১৮ জন দেশি-বিদেশি সাংবাদিকের একটি দলের অংশ হিসেবে মংডু জেলায় যাওয়ার এক বিরল সুযোগ পেয়েছিলেন। এ সফরের একটা সমস্যা হলো, আপনি শুধু সেসব জায়গা দেখতে পারবেন, যেগুলোতে কর্তৃপক্ষ তাদের যেতে দেবে। কিন্তু কখনো কখনো এমন হয় যে, এসব বিধিনিষেধের মধ্যেও আপনি অনেক কিছু বুঝে নিতে পারবেন।

তা ছাড়া সরকারের কিছু যুক্তি আছে যা শোনা দরকার। মিয়ানমার সরকার এখন একটা বিদ্রোহ পরিস্থিতির মুখোমুখি, তবে অনেকে বলতে পারেন যে, তারা নিজেরাই এ সমস্যা তৈরি করেছে। রাখাইন প্রদেশের এই জাতিগত সংঘাতের এক বিরাট ইতিহাস আছে এবং যেকোনো সরকারের পক্ষেই এটা মোকাবিলা করা কঠিন।

রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিত্তেতে পৌঁছানোর পর সাংবাদিকদের বলে দেওয়া হলো, কেউ দল ছেড়ে গিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন না। সন্ধ্যা ৬টা থেকে কারফিউ, তাই এর পর ঘুরে বেড়ানো যাবে না। সাংবাদিকরা যেখানে যেখানে যাওয়ার অনুরোধ জানালেন, নিরাপত্তার কারণে তা প্রত্যাখ্যান করা হলো। হয়তো তারা সত্যি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল।

সিত্তে থেকে নদী পথে বুথিডং যেতে লাগে ৬ ঘণ্টা। সেখান থেকে এক ঘণ্টা পাহাড়ি পথ ধরে গেলে পৌঁছাবেন মংডু। যাওয়ার পথে পড়লো মাইও থু গি গ্রাম। সেখানে প্রথমবারের মতো পুড়িয়ে দেওয়া গ্রাম দেখলাম- দেখলাম পুড়ে গেছে তালগাছগুলোও।

মিয়ানমার সরকার চাইছে, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশে যাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে যে পরিকল্পিত আক্রমণ ও ধবংসযজ্ঞ চালানোর বর্ণনা দিচ্ছে, সেই নেতিবাচক প্রচারের একটা জবাব দেওয়া।  এ কারণে সাংবাদিকদের জন্য সরকারি সফরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু সরকারের এই চেষ্টা ঠিকঠাক কাজ করছে না।

সাংবাদিক জোনাথন হেড লিখেছেন, ‘আমাদের প্রথম নেওয়া হলো মংডুর একটি ছোট স্কুলে, এখানে আশ্রয় নিয়েছে ঘরবাড়ি হারানো হিন্দু পরিবার। সবাই বলছে একই গল্প – তাদের ওপর মুসলিমরা আক্রমণ চালিয়েছে এবং তারা ভয়ে পালিয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছে- এসব গল্পকাহিনি।

সেখান থেকে তোলা ছবিগুলো দেখিয়ে বলা হয়- মুসলিমরা আগুন লাগাচ্ছে। কিন্তু জোনাথন হেড পরে চিনতে পারেন, এই ছবির নারী একটি হিন্দু গ্রাম থেকে আসা। তিনি আরো বলেন, ‘বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যে হিন্দুরা বাংলাদেশে পালিয়েছে তারা সবাই বলছে, তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে রাখাইন বৌদ্ধরা, কারণ তারা দেখতে রোহিঙ্গাদেরই মতো।’

তিনি বলনে, ‘এই স্কুলে আমাদের সঙ্গে ছিল সশস্ত্র পুলিশ ও কর্মকর্তারা। ফলে তারা কি মুক্তভাবে কথা বলতে পারছিল? একজন লোক বলতে শুরু করলেন, কীভাবে সেনাবাহিনী তাদের গ্রামের ওপর গুলি করেছে। কিন্তু খুব দ্রুত একজন প্রতিবেশী তার কথা সংশোধন করে দিলেন।’

জোনাথন হেড বর্ণনা দিয়েছেন, কমলা রঙের ব্লাউজ ও ধূসর-বেগুনি লুঙ্গি পরা এক নারী উত্তেজিতভাবে মুসলিমদের আক্রমণের কথা বলতে লাগলেন। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এক কর্নেল, যার নাম ফোনে টিন্ট তিনিও দাবি করলেন, সব গ্রামেই আগুন দিয়েছে মুসলিমরা।


রাখাইনে জ্বালিয়ে দেওয়া এক গ্রাম​

এর পর আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো একটি বৌদ্ধ মন্দিরে। সেখানে একজন ভিক্ষু বর্ণনা করলেন, কীভাবে মুসলিমরা তাদের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। অগ্নিসংযোগের ছবিও আমাদের দেখানো হলো। ছবিগুলো অদ্ভুত।

হাজিদের সাদা টুপি পরা কিছু লোক একটি ঘরের পাতার তৈরি চালায় আগুন দিচ্ছে। নারীদের দেখা যাচ্ছে- তারা নাটকীয় ভঙ্গিতে তলোয়ার এবং দা ঘোরাচ্ছে, তাদের মাথায় টেবিলক্লথের মতো লেসের কাজ করা কাপড়। এর পর আমি দেখলাম, সেখানকার একজন ওই স্কুলের সেই হিন্দু নারী, যিনি উত্তেজিতভাবে নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। আর এই ঘর পোড়ানো পুরুষদের মধ্যে একজনকে আমি সেই বাস্তুচ্যুত হিন্দুদের মধ্যে দেখেছি। তার মানে, তারা এমনভাবে কিছু ভুয়া ছবি তুলেছে, যাতে মনে হয় মুসলিমরা বসতবাড়িতে আগুন লাগাচ্ছে।

কর্নেল ফোনে টিন্টের সঙ্গে সাংবাদিকদের আলোচনা হয়। স্থানীয় সীমান্ত নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন তিনি। তিনি বর্ণনা করলেন, কীভাবে বাঙালি সন্ত্রাসীরা (আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির জঙ্গিদের তারা এভাবেই বর্ণনা করে) রোহিঙ্গা গ্রামগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে এবং সেখানকার লোকদের চাপ দিয়েছে- যেন প্রতি বাড়ি থেকে যোদ্ধা হিসেবে একজন লোক দেওয়া হয়। যারা একথা মানছে না তাদের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

কর্নেল ফোনে টিন্ট আরো অভিযোগ করেন, রোহিঙ্গা জঙ্গিরা মাইন বসাচ্ছে এবং এরই মধ্যে উড়িয়ে দিয়েছে তিনটি সেতু। জোনাথন হেড তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তার মানে তিনি কি এটাই বলতে চাচ্ছেন যে – এই যে এতসব গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে- এগুলো জঙ্গিরাই করছে? তিনি নিশ্চিত করলেন যে, এটাই সরকারের বক্তব্য। সেনাবাহিনীর নৃশংসতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি তা উড়িয়ে দিলেন। পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, এর প্রমাণ কোথায়? যেসব নারীরা এ দাবি করছে, আপনি তাদের দিকে তাকিয়ে দেখুন। এদেরকে কি কেউ ধর্ষণ করতে চাইবে?

মংডুতে যে মুসলিমদের সঙ্ড়ে আমরা কথা বলতে পেরেছি, তারা ক্যামেরার সামনে কথা বলার সাহস করতে পারেনি। আমাদের পাহারাদারদের নজর এড়িয়ে এদের দু-একজনের সঙ্গে কথা বললাম। তারা বললেন, নিরাপত্তা বাহিনী তাদেরকে গ্রাম ছাড়তে দিচ্ছে না। তারা খাদ্যাভাব এবং তীব্র আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। একজন যুবক বলছিল, তারা বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে চায় কিন্তু তাদের নেতারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এক চুক্তি করেছে যাতে তারা চলে যেতে না পারে। এখানকার বাঙালি বাজার এখন নীরব। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, তারা কীসের ভয় করছেন। জবাবে এল- সরকার।

আমাদের প্রধান গন্তব্য ছিল মংডুর বাইরে আলেল থান কিয়াও। এটি একটি সমুদ্র তীরবর্তী শহর। ২৫ আগস্ট ভোরে এখানে আরসা জঙ্গিরা হামলা চালায়। যাওয়ার পথে আমরা দেখলাম একের পর এক গ্রাম – সবগুলোই একেবারেই জনশূন্য। দেখলাম- নৌকা, গরু-ছাগল ফেলে লোকে চলে গেছে। কোথায় কোনো মানুষ চোখে পড়ল না। শহরটিকে একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটা ক্লিনিক দেখলাম, মেদসাঁ সঁ ফঁতিয়ের সাইনবোর্ড লাগানো, সেটাও পুরো ধ্বংস হয়ে গেছে।

দূরে আমরা দেখলাম চারটি জায়গা থেকে ধোঁয়ার কুন্ডলি আকাশে উঠছে। থেকে থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। আমরা অনুমান করলাম , আরো কিছু গ্রামে আগুন লাগানো হচ্ছে। পুলিশ লেফটেন্যান্ট আউং কিয়াং মো বর্ণনা করলেন কীভাবে তাকে হামলার আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল। তিনি অমুসলিম জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার জন্য ব্যারাকে নিয়ে যাওয়ার বর্ণনা দিলেন এবং ‘বন্দুক, তলোয়ার ও ঘরে-তৈরি বিস্ফোরক নিয়ে আসা’ হামলাকারীদের বিরুদ্ধে তার লোকেরা কীভাবে লড়াই করেছে এবং তাড়িয়ে দিয়েছে- তাও বললেন। সব মিলিয়ে সাজানো বক্তব্য ও ছবি দিয়ে মিয়ানমার সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোঝাতে চাইছে, রোহিঙ্গারাই নিজেদের ঘরবাড়িতে আগুন দিয়ে সংকট প্রকট করার চেষ্টা করছে।

Views All Time
Views All Time
27
Views Today
Views Today
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top