জাতীয়

সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাহিত্যের অন্বেষণকে মানবিক মূল্যবোধের উন্নয়ন এবং যৌক্তিকতাবোধকে শাণিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আখ্যায়িত করে সাহিত্য চর্চায় নিয়োজিত থেকে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন বিশ্বজুড়ে আজ এক অস্থিরতা বিরাজ করছে। সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য গ্রাস করে নিতে চাচ্ছে সকল শুভবোধকে। এই অশুভ তৎপরতার বিরুদ্ধে লড়তে হলে আমাদের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হতে হবে। আর এজন্য সাহিত্য চর্চার কোন বিকল্প নেই।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সাহিত্য মানুষকে যুক্তিবাদী ও সংবেদনশীল করে তোলে। বহুমাত্রিক সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে সহায়তা করে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর ওসামানী স্মৃতি মিলনায়তনে তিন দিনব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন-১৪২৪’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, সভ্যতা বিকশিত হয়েছে মানুষের সৃজনশক্তিতে। আর এই সৃজনশীলতার বাহন হচ্ছে ভাষা। আর তাই সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশে সাহিত্যের ভূমিকা অপরিসীম।

সাহিত্যচর্চা মানুষের মধ্যে শুভবোধের বিকাশ ঘটায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের অমিত সম্ভাবনার দ্বারকে উন্মোচিত করে। ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। অন্যায়-অসত্যের বিরুদ্ধে লড়তে শেখায়। যে সমাজের সাহিত্য যত ঋদ্ধ, সেই সমাজ তত বেশি সভ্য। আমাদের বাংলা সাহিত্যের ভিত্তিও অনেক সুদৃঢ়। আর সে কারণেই বাংলা ভাষা আজ বিশ্বের অন্যতম মর্যাদার আসনে অধিষ্টিত।

সম্মেলন আয়োজক কমিটির আহবায়ক এমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বর্ষীয়ান সাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন, নিখিল ভারত বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনের সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত ঘোষ, সহ সভাপতি প্রদীপ ভট্টাচার্য, ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশের সহ সভাপতি সত্যম রায় চৌধুরী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর কবি শামসুর রাহমানের একটি কবিতা অনুষ্ঠানে আবৃতি করেন এবং আয়োজক কমিটির প্রধান সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু স্বাগত বক্তৃতা করেন।

বাংলা একাডেমীতে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে ভারত, জাপান এবং জার্মানী থেকে আগত প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করছেন।

বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত এই সাহিত্য সম্মেলনের যৌথ আয়োজত বাংলা একাডেমী, নিখলি ভারত বঙ্গ সাহিত্য কেন্দ্র এবং ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ।

‘বিশ্বমানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ’ গুরুসদয় দত্তের এই অমিয় বাণীকে ধারণ করে আয়োজিত হচ্ছে এবারের আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন।

শেখ হাসিনা সম্মেলনের এই মূল প্রতিপাদ্যের উল্লেখ করে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত সব বাঙালির মনে রাখতে হবে যে, আমাদের শেকড় হচ্ছে বাংলা। এই বাংলাভাষাকে ভিত্তি করেই আমাদের স্বাধীনতা ও আত্মপরিচয়।
তিনি বলেন, বাঙালিরা কারো কাছে কখনো মাথা নত করে না, মাথানত করতে জানে না। কাজেই বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করেই আমাদের চলতে হবে। আমরা বাঙালি এটি ভুলে গেলে চলবে না। আজকে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাঙালির অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির আদান-প্রদানের মাধ্যমে আমাদের জানার পরিধি আরও বিস্তৃত হবে। আমাদের সাহিত্য আরও ঋদ্ধ হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই আয়োজন একদিকে নতুন সম্ভাবনাকে উন্মোচিত করবে, অন্যদিকে নিজেদের সামর্থ্যকে তুলে ধরবে ।

আজকে এই সম্মেলনে আসার সুযোগ করে দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, আমাদের এই ঋদ্ধ ভাষায় যাঁরা সাহিত্যচর্চা করছেন, তাঁদের একত্রিত করার এই যুগোপযোগী উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আমি সাধুবাদ জানাই।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমির সাহিত্য সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণের উদ্বৃতি দেন।

‘আমি বিশ্বাস করি জনগণই সব সাহিত্য ও শিল্পের উৎস। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনদিন কোন মহৎ সাহিত্য বা উন্নত শিল্পকর্ম সৃষ্টি হতে পারে না। আমি সারাজীবন জনগণকে সাথে নিয়ে সংগ্রাম করেছি, এখনও করছি। ভবিষ্যতে যা কিছু করব জনগণকে নিয়েই করব।’

প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আন্দোলন-সংগ্রামের উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরে বলেন, মায়ের মুখের ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য জীবন বিসর্জন দিয়ে বিশ্বে বাঙালি জাতি উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রস্তাবে ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ, তমদ্দুন মজলিশ ও অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ১১ মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সংগ্রাম পরিষদ ধর্মঘট ডাকে। এদিন সচিবালয়ের সামনে থেকে বঙ্গবন্ধুসহ অনেক ছাত্রনেতা গ্রেফতার হন। ১৫ মার্চ তাঁরা মুক্তি পান। ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় অনুষ্ঠিত জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জাতির পিতা। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি তিনি মুক্তি পান। ১৯ এপ্রিল আবারও তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। জুলাই মাসের শেষে তিনি মুক্তি পান। ১৪ অক্টোবর ঢাকায় বঙ্গবন্ধুকে আবার গ্রেফতার করা হয়। কারাগার থেকেই তাঁর দিকনির্দেশনায় আন্দোলন বেগবান হয়। সেই দুর্বার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শাসকগোষ্ঠীর জারি করা ১৪৪ ধারা ভাঙতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন ভাষা শহীদরা।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় আরবী এবং রোমান হরফে বাংলা লেখা চাপিয়ে দেয়ায় পাকিস্তানি শাসকশ্রেণীর চক্রান্তেরও উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ২১-এর রক্তরাঙা পথ বেয়েই বাঙালি জাতীয়তাবাদ আন্দোলন এবং স্বাধীকারের চেতনা ধীরে ধীরে এক দুর্বার গতি লাভ করে। বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় ইউনেস্কো কতৃর্ক ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণায় তাঁর সরকার এবং কানাডা প্রবাসী সালাম, রফিকদের মহৎ অবদানের কথা তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য কানাডা প্রবাসী সালাম ও রফিকসহ কয়েকজন বাঙালি উদ্যোগ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার জাতিসংঘে প্রস্তাব উত্থাপন করে। ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আজ সারাবিশ্বের সকল নাগরিকের সত্য ও ন্যায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রেরণার উৎস আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

সরকার প্রধান বলেন, আসলে মাতৃভাষা ছাড়া মানুষ কখনো নিজেকে গড়ে তুলতে পারে না। জাতির পিতা ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় ভাষণ দিয়েছিলেন।

তারই পদাংক অনুসরণ করে প্রধানমন্ত্রী নিজেও জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে আসছেন বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, কারণ আমি গর্ববোধ করি মাতৃভাষায় ভাষণ দিতে পেরে। তবে, এটা ঠিক যে, যুগের পরিবর্তন হচ্ছে। বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন হচ্ছে।

সভ্যতা অগ্রসরমান হলেও তার চাপে মাতৃভাষা কখনো হারিয়ে যাক তা আমরা চাই না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাজেই আজকে বাংলা ভাষার ওপর এই সাহিত্য সম্মেলন আমি মনে করি আমাদের দেশের মানুষকে ভাষা সম্পর্কে আরো সচেতন করবে। এটি মাতৃভাষার জন্য আরো সহায়ক হবে।

প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যের শুরুতে অমর একুশের ভাষা শহীদ রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেতৃত্বদানকারী সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ, ২ লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, জসীম উদ্দীনসহ অন্যান্য সৃষ্টিশীল কবি-সাহিত্যিকদের; যাঁদের হাত ধরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য আজ পত্রপল্লব মেলে মহীরূহে পরিণত হয়েছে, তাঁদেরও স্মরণ করেন।
পরে প্রধানরমন্ত্রী মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। বাসস

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

সম্পাদক:

বিপুল রায়হান

১৩/২ তাজমহল রোড, ব্লক-সি, মোহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭, ফোন : 01794725018, 01847000444 ই-মেইল : info@jibonthekenea.com অথবা submissions@jibonthekenea.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত জীবন থেকে নেয়া ২০১৬ | © Copyright Jibon Theke Nea 2016

To Top
Left Menu Icon
Right Menu Icon